আতঙ্কে ঢাকা এখন ফাঁকা: সবাই ঝুকছে নগরীর বাইরে

আতঙ্কে ঢাকা এখন ফাঁকা: সবাই ঝুকছে নগরীর বাইরে
ফাইল ছবি

এস কে হায়দার ও মেহেদী হাসান: মহামারী করোনা ভাইরাস, নাম শুনলেই এখন যেন সবার হা শিহরে ওঠে। অনেক পরিবারই এখন এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে স্বজনহারা। আবার আক্রান্ত এখন লাখ ছাড়িয়েছে। অদৃশ্য এই শত্রু কখন যে কার উপর আক্রমণ করবে তা সবারই এখন অজানা। 
বৈশ্বিক এ মহামারীতে রেকর্ড গড়েছে দেশের রাজধানী ঢাকায়। সব বেশি সংক্রমনণ রাজধানিতেই আর এই নগরীতেই সব চেয়ে বেশি মানুষের বসবাস। এক জন থেকে আরেকজন ছড়ায় এই সংক্রমন তাই নিজেদের কাছের মানুষও যেন এখন বিপদজনক মনে হচ্ছে। একেইতো দেশে টানা দুই মাসের মত সাধারণ ছুটিতে পড়েছিল সকলে, এরপর ছুটি উঠিয়ে নিলে যেন কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছিল সবার প্রানে। তবে এতে লাগামহীনভাবেই বেড়েছে করোনা সংক্রমের সংখ্যা। লাফিয়ে লাফিয়ে যেন কয়েকদিনের ব্যবধানেই লাখ ছাড়িয়েছে এই মহামারী। 

বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জোনিং পদ্ধতি চালু করে লকডাউনের সিদ্ধান্তও প্রায়ই পাকাপোক্ত তাই অনেক এলাকাই আবার পড়তে পারে লকডাউনের ফোকরে। এদিকে করোনার তেমন কোন নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকায় এবং মেডিকেলগুলোতেও সু চিকিৎসা না পাওয়ায় নানাবিধ আতঙ্কেই এখন ঢাকা ছাড়ছে নগরবাসী। যার জন্য মহামারী করোনার বিভিন্ন আতঙ্কে ঢাকা এখন প্রায়ই ফাঁকা। 

সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবারে তালিকা) করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৪০ জন। আর নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৩৮৬৮ জন। ফলে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার ৪৭৪ জন, মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৬৬১ জনের। 

মাত্র সারে ৩ মাসের ব্যবধানে করোনার এই তালিকায় এখন সবাই বেশ আতঙ্কিত। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনা ভাইরাস পাল্টে দিয়েছে ব্যস্ততম এই নগরী ঢাকার চিরচেনা দৃশ্য। হুটহাট গাড়ির শব্দ, যানজট, রাস্তাঘাটে মানুষের উপচেপড়া ভিড় চোখে পড়ছে না আর। 

রাজধানীর রাস্তাজুড়ে নেই যানজট। ফাঁকা যাচ্ছে বাস। কোথাও কোথাও ড্রাইভাররা বাস থামিয়ে বসে আছেন। যাত্রীর জন্য দীর্ঘক্ষণ হাঁকডাক করছেন হেলপাররা। যে কজন যাত্রী উঠছেন তাদের অধিকাংশের মুখে মাস্ক। মাস্কের ভেতর থেকেই মুখ দিয়ে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত নানা কথা বলে যাচ্ছেন। সরকার ঠিকঠাকভাবে করোনা ঠেকাতে কাজ করছে কি না তাও তাদের আলোচনায় উঠে আসতে শোনা যায়। করোনা নিয়ে যেন এখন সমালোচনার শেষ নেই। পাসাপাসি স্বাস্থ্যবিধিরো নেই তেমন কোন বালাই।

বিপাকে দূরপাল্লার পরিবহন চালকরা

করোনার প্রাদুর্ভাবে বেশ বিপাকে পড়েছেন দেশের দূরপাল্লার গনপরিবহন সংশ্লিষ্টরা। পরিবহনে যাত্রী সঙ্কট থাকায় পরিবহন খরচও উঠছে না তাদের। গতকাল (শুক্রবার) সাপ্তাহিক ছুটির দিন পুরো রাজধানী ছিল ফাঁকা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে গলা ফাটিয়ে কোন যাত্রী পাননি পরিবহন চালকরা। তাই অনেক গনপরিবহনকেই দেখা গেছে খালি গাড়ি নিয়ে রাস্তার এমাথা থেকে ওমাথায় ছুটাছুটি করতে। এর আগেরদিন বৃহস্পতিবারও রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা উত্তরা, বনানী, কারওরানবাজার, কলাবাগান, শাহবাগ, ফার্মগেট, বাংলামোটর, নিউ মার্কেট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কোথাও আগের মতো যানজট নেই, নেই মানুষের উপচেপড়া ভিড়। যারা জরুরি কাজে রাস্তায় বের হয়েছেন করোনা আতঙ্ক বিরাজ করছে তাদের মাঝেও। অনেকেই পরিবার নিয়ে ঘরবন্ধি আবার অনেকের ঢাকা ছেড়েছেন আগ থেকেই। ঢাকায় এখন লোক সংখ্যা কম থাকায় দূরের পথের যাত্রীতো দূরের কথা এলাকা ভিত্তিক যাত্রীও জুটছেনা পরিবহনে। এমন দৃশ্যপট এখন পুরো নগরী জুড়ে।

সায়দাবাদ বাস টার্মিনালের হেলপার মনির বাংলাদেশের আলোকে জানান, দেশে সাধারণ ছুটি বন্ধের পর বেশ ভালই যাচ্ছিল তাদের সময়। গাড়িতে (বাসে) পুরোপুরি (সবকটি সিট) যাত্রী না থাকলেও ৪ভাগের ৩ভাগ যাত্রী ছিল, তবে বর্তমানে ৫-১০জন যাত্রী নিয়েও তাদের গাড়ি ছাড়তে হচ্ছে। এতে করে তাদের পরিবহনের রোড খরচও উঠছেনা বলেও জানান তিনি। তিনি আরও বলেন এভাবে চলতে থাকলে লস গুনতে হবে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের। এতে করে দূরপাল্লার পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এভাবে চলতে থাকলে দেশের কয়েক হাজার পরিবহন চালক ও শ্রমিক অসহায় হয়ে বেকার হয়ে পরবে।

পরিবহন মালিকরা বলছেন, খুবই কম যাত্রী নিয়ে এখন চলছে বাস। এনা পরিবহনের জেনারেল ম্যানেজার সৈয়দ আতিক জানান, এই সময় সাধারণত তাদের বাসে শতভাগ যাত্রী থাকে। কিন্তু করোনা আতঙ্ক ও সতর্কতার কারণে যাত্রী ৮০ শতাংশ কমে গেছে। শ্যামলী পরিবহন থেকে বলা হয়েছে, যাত্রীর অভাবে ঢাকা থেকে তাদের বিভিন্ন রুটের বাস চলাচল সীমিত হয়ে যাচ্ছে। যাত্রী মিলছে না। অনেকেই অগ্রিম টিকেট কেটেছিলেন তারা ফেরত দিয়ে যাচ্ছেন।

পথচারীরা বলেছেন, রাজধানীতে মানুষের কারণে যেখানে ফুটপাতে হাঁটা যেত না। এখন ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যেতে বেগ পেতে হচ্ছে না। আর ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনা আতঙ্কে বেচাকেনা প্রায় নেই।

বিআইডব্লিউটিএ বলছে, যাত্রীদের যাতায়াতের ব্যাপারে তাদের কিছু করার নেই। তবে সদরঘাটে যারা প্রবেশ করছে তাদের সবার হাত স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে, মাপা হচ্ছে তাপমাত্রা। এরই মধ্যে তাপমাত্রা বেশি থাকায় দুই যাত্রীকে আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে।  তবে আগের তুলনায় যাত্রী দিনদিন অনেকটাই কমে যাচ্ছে।

ভাড়া সংকটে বাড়িওয়ালারা-নিরুপায় ভাড়াটিয়ারা

রাজধানীতে ইনচার্জ বাসা ভাড়া নিয়ে ব্যাপক সঙ্কটে পড়ছেন বাড়িওয়ালারা। একদিকে বাসা ভাড়া বকেয়া রেখে গ্রামে চলে যেতে শুরু করেছেন ভাড়াটিয়ারা অন্যদিকে বাসা ছেড়ে একেবারেই চলে যাচ্ছে অনেকেই। এতে করে বাড়িওয়ালারা পড়েছেন বাসা ভাড়া সঙ্কটে। রাজধানীর প্রতিটি এলাকাতাতেই অসংখ্য টু-লেট ঝুলে থাকলেও কেউ নিচ্ছেন না নতুন বাসা বরং অনেকেই বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অন্যত্র। 

রাজধানীর ওয়ারীর এক বাড়িওয়ালা বিশ্বজিত বাংলাদেশের আলোকে বলেন, তার দুইতলা বিশিষ্ট বাড়িতে ৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে। একটিতে তারা নিজেরা থাকেন অন্য ৩টি ভাড়া দিতেন। বর্তমানে সেই ৩টি ফ্ল্যাটের ২টি বাসা খালি রয়েছে। ৩টি ফ্ল্যাটের ভাড়ার টাকা দিয়েই চলতো তার সংসার। পাশাপাশি সন্তানদেরও লেখাপরার খরচ চলতো সেই টাকাতেই। বর্তমানে বাসাভাড়া সঙ্কটে আর্থিক সঙ্কটে ভুগছেন তিনি। এক মাস হয়ে গেছে টু-লেট ঝুলিয়েছে কিন্তু কেউই বাসা নিতে আসছেন না।

রাজধানীর মুগদা মানিকনগরের বাড়িওয়ালা ইয়াসিন মিয়া নামে আরেক বাড়িওয়ালা বাংলাদেশের আলোকে বলেন, প্রায় দুই মাস ধরে ভাড়া পাচ্ছি না। যে যার মতো করে যতটুকুই ভাড়া দিচ্ছেন তাই-ই নিচ্ছি। যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে কাকে কি বলবো? সব কর্মসংস্থান বন্ধ। অফিসে তারা বেতন পাচ্ছেন না। দুই মাস আগে দুজন ভাড়াটিয়া চলে গেছেন। টু-লেট দিয়ে রেখেছি কিন্তু নতুন করে কোন ভাড়াটিয়া পাচ্ছি না। আবার অনেকের কাজ নেই।

এদিকে উপার্জন না থাকায় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা বেশ চিন্তিত। ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্বল্প আয়ের যারা ঘরভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। এই অবস্থায় বাসাভাড়া দেওয়া তাদের পক্ষে শুধু কষ্টসাধ্যই নয় অসম্ভবও বটে। কিন্তু অনেক বাড়িওয়ালারা সেটা বুঝতেই চাইছেন না। তাই ভাড়াটেদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়াসহ, বিভিন্নভাবে হয়রানির ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা রীতিমতো উদ্বেগজনক। এতে করে অনেক ভাড়াটিয়ারাই পারি জমাচ্ছেন যারযার গ্রামের বাড়িতে। ভাড়ার প্রশ্নে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটে একটা সমঝোতা হতে পারে বর্তমান বাস্তবতায় এমনটাই মনে করছেন নগর উন্নয়ন বিশ্লেষকরা।

সবাই ঝুকছে নগরীর বাইরে

মহামারী করোনায় রাজধানীর ঢাকায় মারাত্মক ঝুকি আছে জেনে সবাই এখন ঝুকছেন নগরীর বাইরে। ইতোমধ্যে প্রায় লাখের মত মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। আর এখনো অনেকেই ঢাকা ছাড়ছেন প্রতিদিনই। রাজধানীতে কর্মসংস্থানের সংকটেই বেশির ভাগ মানুষ ঢাকার বাইরে নিজ নিজ এলাকায় পারি জমাচ্ছেন। এতে করে অন্তত অনেকেই বাসা ভাড়ার চাপ থেকে মুক্তি পাবেন ভেবেই অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ১লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়ে গেছেন। চাকরি হারিয়ে বাঁধ্য হয়ে তারা ঢাকা ছেড়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন। অনেকের জমানো টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় অনন্যোপায় হয়ে গ্রামে ফিরেছেন।

ঢাকা ছেড়ে যাওয়া সাবিনার স্বামীর রাজধানীর শনির আখড়ায় মুদি দোকান ছিল। কিন্তু বিক্রি না হওয়ায় তা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। সাবিনা বাংলাদেশের আলোকে বলেন, "ঢাকায় আইছিলাম ভালোমত খাইয়া পইরা থাহার জন্য। কিন্তু করোনার কারণে আমাদের ব্যবসা ধ্বসে পড়েছে। সংসার চালাতে পারছি না বলে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছি। যদি পরিস্থিতি ভাল হয় তাইলে আবার ঢাকা আইমু।

বিআলো/ইসরাত