আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এর একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এর একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন
ছবি: সংগৃহীত


সময়টা ছিল ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাস। আমি তখন আল-রাজি ইসলামী ব্যাংক, জেদ্দায় গ্লোবাল ট্রেড সেন্টারে কর্মরত। ছুটি কাটানোর জন্য ঢাকাতে এসেছি। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আমার পূর্ব পরিচয় ছিল, কারণ আমি ২০০৬ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত তাঁদের জেদ্দা প্রতিনিধি হিসাবে কর্মরত ছিলাম (অনারারি সার্ভিস)।

একদিন সকালে ব্যাংক থেকে ইন্টারভিউর জন্য মোবাইলে কল পেলাম। যথাযথভাবে ইন্টারভিউ এর পর আমাকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত করে নিয়োগপত্র প্রদান করেন। ২০১০ সালে  ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে যোগদানের পর আমাকে মতিঝিলের প্রধান শাখায় প্রেরণ করা হয়। শাখা ব্যবস্থাপক আমাকে সেকেন্ড অফিসার এবং বৈদেশিক বানিজ্য সেকশনের প্রধান হিসাবে দায়ীত্ব প্রদান করেন। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে যোগদানের পূর্বে আমি অগ্রণী ব্যাংক, দি সিটি ব্যাংক লিঃ এবং আল-রাজি ব্যাংকে কাজ করার সুযোগে বেশকিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হয়েছিল, যা বিভিন্ন ব্যাংকের বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগের কর্মরতদের জন্য বেশ উপকারী হবে বলে আমার ধারণা, বিধায় এই লেখার উদ্দেশ্য।

পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশের ব্যাংকগুলি আমাদেরকে বিভিন্নভাবে ঠকিয়ে যাচ্ছে তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ আমি এই লেখার মাধ্যমে বাংলাদেশে কর্মরত ব্যাংকারদের জানাতে চাই।
আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এর মতিঝিল শাখা ২০০৯ সালের অক্টেবর মাসে একটি এক্সপোর্ট এলসি গ্রহণ করে যার নাম্বার- ডিসিএলসি/০০০৫৮৭৫, এপলিক্যান্ট নাইকট এ্যাপারেল স্ধসঢ়; (এনওয়াই) এবং বেনিফিসিয়ারী ইপকট এ্যাপারেল স্ধসঢ়; লিঃ ঢাকা। মূল এলসি কমার্স ব্যাংক কর্তৃক খোলা হয়েছে যা এমটি-৭২০ এর মাধ্যমে ব্যাংক অব নিউইয়র্ক সান ফ্রান্সিকো ট্রান্সফার করেছে। এলসি মূল্য- ২,৬৪,৬১৫.৭০ মার্কিন ডলার, সাইট এলসি, এ্যভেইলেবল বাই প্রেজেন্টটেশন অব সাইট ড্রাফট, অথচ এলসিটিতে একটি রিয়েলাইজেশন ক্লজ ছিল,অর্থ্যাৎ কমার্স ব্যাংক থেকে মূল্য আদায়ের পর ব্যাংক অব নিউইয়র্ক মূল্য পরিশোধ করবে।

এই ধরনের এলসির বিপরীতে যদিও ব্যাক -টু- ব্যাক এলসি খোলা যুক্তিসংগত নয় তথাপিও আমার আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এ যোগদানের পূর্বেই কয়েকটি ব্যাক -টু- ব্যাক এলসি খুলে ইপকট এ্যাপারেল স্ধসঢ়; মাল গ্রহণ পূর্বক গার্মেন্টস  তৈরি করে ব্যাংকে ২৯,২৮৪.২০ মার্কিন ডলারের ডকুমেন্টস প্রদান করেন, যাহা এফবিসি/এমবি/২০১০/০৮১, তারিখ- ২৫/০৩/২০১০ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক এর নিকট প্রেরণ করা হয়। ব্যাংক অব নিউইয়র্ক ০২/০৪/২০১০ ডকুমেন্টি পাওয়ার পর ১৩/০৪/২০১০ তারিখে রিফিউজাল নোটিস প্রদান করে এবং ৫০% ডিসকাউন্টে আমদানী কারক মাল গ্রহনে আগ্রহী বলে জানায়। ৫০% ডিসকাউন্ট প্রদান অসম্ভব বিধায় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক তা প্রত্যাখান পূর্বক রপ্তানী মূল্য পরিশোধের দাবি করে যেহেতু ক্রেতার নির্বাচিত কোম্পানী কর্তৃক মালামাল রপ্তানীর পূর্বে ইন্সপেকশন করে ক্রেতার মৌখিক অনুমতি সাপেক্ষে মাল রপ্তানি করা হয়েছে। কিন্তু ক্রেতা
৫০% ডিসকাউন্ট ব্যতিত মাল গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে ব্যাংক অব নিউইয়র্ক ডকুমেন্ট ফেরত প্রদান করে এবং এক পর্যায়ে পোর্ট কর্তৃপক্ষ মালামাল অকশনে বিক্রি করে ডেমারেজ ও পরিবহন ভাড়া বাবদ সমস্ত অর্থ কেটে নেয়।

আমি সবে একমাস হলো শাখায় যোগদান করেছি। গভিরভাবে চিন্তা করতে লাগলাম কি উপায় করা যায়। ফাইলটি মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ পূর্বক দেখা গেল যে, ব্যাংক অব নিউইয়র্ক ইউসিপি-৬০০ এর ১৪বি ধারা অনুযায়ী ৫ কর্মদিবসের মধ্যে রিফিউজাল নোটিস প্রদান করে নাই। যার ফলে তাদের রিফিউজাল নোটিস অকার্যকর বলে বিবেচিত হবে। ৫ কর্মদিবসের মধ্যে রিফিউজাল নোটিশ প্রদানে ব্যর্থতার কথা ব্যাংক অব নিউইয়র্ক কে জানানো হলে তারা দাবি করলো যে রিফিউজাল নোটিশ ৫ কর্মদিবসের মধ্যেই প্রদান করেছেন এবং তারা এ কথাও জানায় যে, ফাইলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমি স্থানীয় ডি এইচ এল কোম্পানীর নিকট থেকে পিওডি (প্রোফ অফ ডেলিভারি) সংগ্রহ করে জানালাম যে ০২/০৪/১০ তারিখে জনাব মার্সা আলী সকাল ০৯.৪০ ঘটিকায় ব্যাংক অব নিউইয়র্ক এর কাউন্টারে ডকুমেন্ট গ্রহণ পূর্বক ১৩/০৪/১০ তারিখ রিফিউজাল নোটিশ প্রদান করেন। বিধায় ইহা স্পষ্ট যে ৫ কার্জদিবশের মধ্যে রিফিউজাল নোটিশ প্রদান করে নাই, ইহা অতি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।

আমি পি, ও, ডি এর হার্ড কপি সংগ্রহ পূর্বক বিষয়টি ব্যাংক অব নিউইয়র্ক এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এর বরাবর পত্র মারফত রপ্তানী মূল্য পরিশোধের জন্য দাািব জানালে তারা তাদের শাখার মিথ্যা দাবিকে প্রশ্রয় প্রদান পূর্বক রপ্তানী মূল্য প্রদানে অস্বিকৃতি জ্ঞাপন করে। এমতাবস্থায় বেশির ভাগ ব্যাংক কর্মকর্তা হতাশাগ্রস্ত হয়ে রপ্তানি মূল্য আদায়ের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে যায়, ফলে বিক্রেতা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু আমি আমার দীর্ঘ দিনের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিষয়টি কন্ট্রোলার অফ আমেরিকান ব্যাংক স ্ ধসঢ়; আর্থাৎ ফেডালের রিজার্ভ সিস্টেম এর নিকট প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেই। অতপর ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম এর বোর্ড অব গভর্নর এর সম্মানিত চেয়ারম্যান জনাব বেন সালম বারনানকী এর নিকট ঘটনার বিষদ বিবরণ উল্লেখ্য পূর্বক সংশ্লিষ্ট সমস্ত দলিলাদী সংযোজন পূর্বক ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষে পত্র প্রেরণ করি। এদিকে প্রায় ৬ মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেছে।

আলহামদুল্লিাহ ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম বিষয়টি অত্যান্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা পূর্বক এলসি ইস্যুইং ব্যাংক এর বিস্তারিত তথ্য আহবান করেন এবং রপ্তানী মূল্য সম্পূর্ণ পরিশোধের জন্য ব্যাংক অব নিউইয়র্ক কে নির্দেশনা প্রদান করলে তারা কোন প্রকার কর্তন ব্যাতিরেকে সম্পূর্ণ রপ্তানী মূল্য অর্থ্যাৎ ২৯,২৮৪.২০ মার্কিন ডলার প্রদান করেন। প্রায় এক বৎসর নিরলস প্রচেষ্টার ফলে রপ্তানী মূল্য আদায় করা সম্ভব হয়।
এখন কথা হলো এলসিতে রিয়েলাইজেশন ক্লজ থাকা স্বত্ত্বেও কেন ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম ব্যাংক অব নিউইয়র্ক কে রপ্তানী মূল্য পরিশোধে বাধ্য করলেন। কারণ আমি ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম কে এই মর্মে সন্তোষ্ট করতে সমর্থ হই যে, এলসিটি ত্রুটিপূর্ণভাবে ইস্যু করা হয়েছিল। কারণ ,সাইট এলসিতে রিয়েলাইজেশন ক্লজ অকার্যকর। রিয়েলাইজেশন ক্লজ কার্যকর করতে হলে ব্যাংক অব নিউইয়ক ডেফার্ড পেমেন্ট এলসি ইস্যু করতে হত সাইট এলসির পরিবর্তে। ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম আমার এই যুক্তিকে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নেয়।
লেখক: মো:  আবুল কাসেম, ব্যাংকার।