করোনায় ব্যাংকিং সেক্টরঃ টিকিয়া থাকাই হইবে চরম স্বার্থকতা (পর্ব-৩)

করোনায় ব্যাংকিং সেক্টরঃ টিকিয়া থাকাই হইবে চরম স্বার্থকতা (পর্ব-৩)

শেখ মোহাম্মদ সাব্বির হোসেন:  পৃথিবীর কোন মানুষ তাদের জীবদ্দশায় জ্ঞানতঃ এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। এ বিপদ থেকে নিষ্কৃতি পেতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে চলছে নির্ঘুম প্রচেষ্টা। কিন্তু নিষ্কৃতি কবে মিলবে- সেটা অনিশ্চিত। এ বিপদ থেকে নিষ্কৃতির প্রচেষ্টার পাশাপাশি সম্পূরক অন্যান্য বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্যও চলছে মানুষের অবিরাম প্রচেষ্টা। সেই সম্পূরক বিপদগুলোর মধ্যে অন্যতম- বিপর্যস্ত অর্থনীতি। আর বিপর্যস্ত অর্থনীতির অন্যতম অংশীদার- বিপর্যস্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বিভিন্ন সময়ে বৈশ্বিক মন্দায় পশ্চিমা বিশ্বের অনেক ব্যাংক রাতারাতি দেউলিয়া হয়ে গেলেও, বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তার আঁচ লাগেনি। এবার কি পারবে বাংলাদেশ- সেটাই এখন মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন।

একটা বিষয় খুব স্পষ্ট- সরকার থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বিভিন্ন ব্যাংকের নীতিগত কোন সিদ্ধান্তই খুব বেশী সময় স্থিতিশীল থাকছে না। অস্তিত্ব সংকটের এই ক্রান্তিকালে বাংলাদেশের সরকার তথা ব্যাংকিং সেক্টর বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করছে বটে, তবে তা সবই স্বল্পকালীন। অর্থনীতির ভাষায়-"অন্যান্য অনুঘটকসমূহকে স্থিতিশীল ধরিয়া" ব্যাংকসমূহ তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক "টিকিয়া থাকার নিমিত্তে" বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন করছে, যা আবার পরিস্থিতি ও সরকারী নীতির সাথে পরিবর্তিতও হচ্ছে। আর এই পদক্ষেপসমূহ গৃহীত হচ্ছে "করোনা মহামারী স্বল্পতম সময়ে বিদায় নিবে" বিবেচনা করে। করোনা বিদায় নিচ্ছে না এবং এখন পর্যন্ত বিদায় নেয়ার কোন লক্ষন ও দেখাচ্ছে না। কাজেই পূর্বের সিদ্ধান্ত পূণর্বিবেচনা ও নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহন।

করোনা পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং সেক্টরের উপর প্রথম আদেশকৃত বিষয় গার্মেন্টস এর প্রণোদনার ঋণ বিতরণ। করোনা পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষনে ঘোষিত পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার সিদ্ধান্তে গার্মেন্টস মালিকরা যারপরনাই খুশি হয়েছিলেন- শ্রমিকদের তিন মাসের বেতনের টাকা মুফতে পাবেন ভেবে। কিন্তু পরমুহুর্তে জানা গেল- মুফতে নয়, ২% সুদে ঋণ নিতে হবে। তারপরও গার্মেন্টস মালিকরা হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। সরকার তহবিল দিল ঠিকই, কিন্তু ব্যাংক কি নিরাপদ রইলো? জামানত বিহীন একটা ঋণ ব্যাংকের মাথায় চেপে বসলো-যা ব্যাংকগুলোকেই আদায় করে বাংলাদেশ ব্যাংককে ফেরত দিতে হবে, অথচ এ থেকে কোন মুনাফার সুযোগ নেই।

বানিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উপর হুট করে চাপিয়ে দেয়া দ্বিতীয় বোঝা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ডিউটিকালীন প্রণোদনা এবং স্বাস্থ্য ও মৃত্যু বীমা। ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার জন্য প্রণোদনার প্রয়োজন ছিল বৈকি। কিন্তু তড়িঘড়ি করে নেয়া এই নীতি ব্যাংকগুলোর গলার ফাঁস হয়ে দাড়িয়েছে। করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর পরিবার ২৫ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা পাবে-এটা ঠিক আছে কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হলেই সংশ্লিষ্ট কর্মীকে চিকিৎসা ব্যয় বাবদ ৫ থেকে ১০ লক্ষ টাকা দেয়ার নির্দেশনা হয়তো আরেকটু সুচিন্তিতভাবে নেয়া যেত। কারণ আইসিইউর প্রয়োজন না হলে করোনার আসলে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন চিকিৎসা ব্যয় নেই। এক্ষেত্রে একটা থোক অনুদান রাখা যেতে পারতো। আর ডিউটিকালীন প্রণোদনা যে যথাযথ সিদ্ধান্ত হয় নাই, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর পেছনে ফিরে আসা থেকে স্পষ্ট। এক্ষেত্রে একটি দৈনিক সম্মানী চাকরিদাতা ও চাকরীরত উভয়ের "উইন-উইন" সিচুয়েশনই হতো।

তৃতীয় পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাংকগুলোকে দুই মাসের ঋণের সুদ আয়খাতে না নেয়ার নির্দেশনা মাথায় বাড়ি দেয়ার মত। যদিও পরবর্তীতে সরকার এবিষয়ে ভর্তুকি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সুদআয় স্থগিত হিসাবে যাওয়ায় ব্যাংকিং সেক্টর কার্যতঃ এখন লোকসানে চলছে।

ব্যাংকিং সেক্টর এই মুহুর্তে প্রকৃতপক্ষে নন-প্রফিট অর্গানাইজেশনে রূপ নিয়েছে। ব্যক্তিগত লোন থেকে বৃহৎ লোন- কোন ধরণের বিনিয়োগেই ব্যাংকগুলোর এখন যাওয়ার সুযোগ নেই। অধিকন্তু বিদ্যমান ঋণগ্রহীতারাও কিস্তি দিচ্ছে না, করোনার দোহাই দিয়ে। করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হোক বা না হোক - এই ঋণগ্রহীতাদের একটা বড়ই অংশ খেলাপি ও শ্রেনীকৃত হয়ে যাবে-এটা নিশ্চিত। ক্ষুদ্র, মাঝারি কিংবা বৃহৎ খাতে ঋণপ্রণোদনা ও হয়তো তড়িঘড়ি করেই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। করোনা শেষ হলোনা, প্রভাব বোঝা গেল না- অথচ আপনি ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দিয়ে দিলেন-পরিপূর্ণরূপে ওয়ার্ক শুরু হওয়ার আগেই- আপনার এই সিদ্ধান্ত ও বিরূপ ওয়ার্ক করবে বলেই মনে হয়। এসবের বাইরেও আসছে বাজেটে অনেক সিদ্ধান্তই আসবে যা ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করতে হবে- তাতে ব্যাংকের লাভ থাকুক বা না থাকুক। আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে লাভজনক কোন সিদ্ধান্ত ব্যাংকগুলোকে দিয়ে বাস্তবায়ন করা- এটা চিন্তা করাও বাহুল্য। তবে বাহুল্যই হোক কিংবা যৌক্তিক- ব্যাংকিং সেক্টর টিকে থাকবে নাকি থাকবে না, ব্যাংকিং সেক্টরকে টিকিয়ে রাখা হবে কি হবে না- তা সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর তা আসছে বাজেটেই প্রতিফলিত হতে হবে, বাস্তবায়ন যখনই হোক। ব্যাংক টিকে থাকলে অর্থনীতি টিকে থাকবে, আর অর্থনীতি টিকে থাকলে সরকার টিকে থাকবে। করোনা পরবর্তীতে- টিকিয়া থাকাই হইবে চরম স্বার্থকতা।