ক্ষোভ বাড়ছে শিক্ষা ক্যাডারে

ক্ষোভ বাড়ছে শিক্ষা ক্যাডারে


উৎপল দাশগুপ্তঃ
সরকারের বেতন কাঠামো অনুযায়ী উপরের গ্রেডে পদোন্নতির সুযোগ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে পদমর্যাদার অবনমন ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) এর শিক্ষা ক্যাডারের শীর্ষ কর্মকর্তা পদের অধ্যাপকরা। প্রায় ১০টি ব্যাচের অধ্যাপক/কর্মকর্তারা বর্তমানে এই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে এই সমস্যার সমাধান না হলে সরকারের সবচেয়ে বড় এই ক্যাডারের ১৫ হাজার শিক্ষককেই আগামীতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে শিক্ষা ক্যাডারের সকল স্তরের শিক্ষক/কর্মকর্তাদের মধ্যে।
সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী প্রশাসনসহ অন্য সকল ক্যাডারের কর্মকর্তারা ধারাবাহিকভাবে উপরের ধাপ বা গ্রেডে পদোন্নতি পেলেও শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের চতুর্থ গ্রেডের অধ্যাপক পদ নিয়েই শেষ করতে হচ্ছে চাকরিজীবন। 


বর্তমানে শিক্ষা ক্যাডারের ৭ম থেকে ১৫তম ব্যাচের অধ্যাপকদের প্রায় সবাই চতুর্থ গ্রেডের সর্বশেষ ধাপে পৌঁছে গেছেন। সর্বশেষ ধাপের কাছাকাছি আছেন ১৬তম ব্যাচের শিক্ষকরাও। আগামী এক থেকে ছয় বছরের মধ্যে অবসরে যাচ্ছেন এসব শিক্ষক-কর্মকর্তা। এরা নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেলেও উপরের গ্রেডে পদোন্নতি না পাওয়ায় সাত-আট বছরে বেতন বাড়েনি। অনেক শিক্ষককে আগামী বছরের জুলাই থেকে একই বেতনে জীবনের শেষ কর্মদিবস পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে। 


২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ফরাসউদ্দিন পে-কমিশনের দেওয়া পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর থেকেই চতুর্থের উপরের গ্রেডে পদোন্নতি নিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে জটিলতার শুরু। ওই পে-স্কেলে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বিলোপ করে শিক্ষকদের গ্রেডভিত্তিক বেতন নির্ধারণ করা হয়। সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বিলোপ করা হলেও চতুর্থের উপরের গ্রেড কিভাবে দেওয়া হবে সে সম্পর্কে কোনো নির্দেশনা না থাকায় পদমর্যাদা ও আর্থিক দিক থেকে বৈষম্যের সম্মুখীন হন শিক্ষকরা। যা এখনো চলছে। অথচ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বরাবরের মতই শিক্ষকদের জন্য উচ্চস্তরের বেতন নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।    


চাকরিতে পদমর্যাদা ও আর্থিক বৈষম্যের অভিযোগ তুলে পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে সেসময় আন্দোলনে নামেন শিক্ষকরা। সমস্যা সমাধানের জন্য শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত তিন সিনিয়র সচিবের কোর কমিটি। আলোচনার পর বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয় কোর কমিটি। বিগত পাঁচ বছরেও কোর কমিটির সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। 
বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছেন। এতে শিক্ষকরাও আশাবাদী হলেও পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন তারা। 


এদিকে ঝুলে থাকা এই সমস্যার জন্য পেশাগত জীবন নিয়ে চিন্তিত ও হতাশ শিক্ষক-কর্মকর্তারা। হতাশা নিয়ে ইতিমধ্যে জীবনের শেষ কর্মদিবসে প্রিয় শিক্ষাঙ্গন ছেড়েছেন প্রায় দুই হাজার শিক্ষক। শিক্ষকরা বলছেন, ৯ম গ্রেডে প্রভাষক পদে নিয়োগের পর দীর্ঘসময় শিক্ষার আলো বিলিয়েও সঠিক মর্যাদা না পাওয়ার শংকা শিক্ষকতা পেশার প্রতি মেধাবীদের আগ্রহ তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করবে। ভালো শিক্ষকের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আগামী প্রজন্ম। 


প্রায় ৩৩ বছরের শিক্ষকতার জীবন শেষে রাজধানীর ইডেন কলেজে কর্মরত ৭ম ব্যাচের প্রফেসর মাসুমে রাব্বানী খান অবসরে যাচ্ছেন আগামী বছর। ২০১৩ সালে তিনি চতুর্থ গ্রেড পান। এরপর বিগত সাত বছর বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেলেও উপরের ধাপে গ্রেড পাওয়ার সুযোগ না থাকায় বেতন বাড়েনি। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির একাধিকবার মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করলেও অসন্তোষ ও হতাশা নিয়েই অবসরে যেতে হচ্ছে প্রবীণ এই অধ্যাপককে।    


দৈনিক বাংলাদেশের আলোকে তিনি বলেন, ৩৩ বছর চাকরি করার পর অবসরে যেতে হচ্ছে চতুর্থ গ্রেড নিয়ে, এটা দুঃখজনক। এ সমস্যা সমাধানের জন্য সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। 
রাজধানীর কবি নজরুল সরকারি কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন ৮ম ব্যাচের অধ্যাপক আই  কে সেলিম উল্লাহ খন্দকার। তিনি অবসরে যাবেন দেড় বছর পর। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সদ্য সাবেক সভাপতি তিনি। তিনিও ৪র্থ গ্রেড পেয়েছেন ২০১৩ সালে। উপরের গ্রেডে পদোন্নতির সুযোগ না থাকায়  পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক অবস্থার দিক  থেকে দীর্ঘ সাত বছরেও কোনো উন্নতি  হয়নি এই অধ্যাপকের।  


এই অধ্যাপক বলেন, পে-স্কেলের এই জটিলতা নিরসনে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে ১০০ দিনের মধ্যে সংকট সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কোর কমিটির দেওয়া সিদ্ধান্ত বিগত পাঁচ বছরেও বাস্তবায়ন করা যায়নি। 
তিনি জানান, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন সচিবের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। আলোচনা অনুযায়ী অধ্যক্ষের ৯৮টি পদকে তৃতীয় গ্রেড ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (নবসৃষ্ট) ৩টি পদকে দ্বিতীয় গ্রেড মর্যাদা দিয়ে জনপ্রশাসনে প্রস্তাব পাঠানো হয়। সম্প্রতি জনপ্রশাসন এই প্রস্তাব অনুমোন করেছে। তবে মাউশির এই প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি রয়েছে এই শিক্ষক নেতার। 


এ বিষয়ে তিনি বলেন, মাউশির প্রস্তাবে তৃতীয় গ্রেডে উন্নীতের ক্ষেত্রে ‘বিষয়’কে ভিত্তি ধরা হয়েছে, যা সঠিক নয়। এটি হতে হবে ‘জ্যেষ্ঠতা’র ভিত্তিতে। গ্রেড উন্নীতের বিষয়ে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে তাতে অবসরে যাওয়ার আগে আর গ্রেড পাবেন কিনা তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন এই অধ্যাপক।      
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ ১৪তম ব্যাচের অধ্যাপক মোহসিন কবির বলেন, দ্রুত এই সমস্যার সমাধান জরুরি। শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে বিষয়টির সমাধান হবে বলে আমি আশাবাদী।


রাজধানীর তিতুমীর কলেজের ১৪তম ব্যাচের অধ্যাপক মোশতাক আহমেদ ভুঁইয়া বলেন, আরও প্রায় ৮ বছর দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই সময়ে এক টাকাও বেতন বাড়বে না, এটি দুঃখজনক। সমাধান জরুরি।২৪তম সাধারণ বিসিএস শিক্ষা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক বিজয় ঘোষ বলেন, সমস্যা সমাধানে শিক্ষামন্ত্রী ও উপমন্ত্রী আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। মন্ত্রীদ্বয়ের নেতৃত্বেই সম্প্রতি ৬০৯ প্রফেসর পদোন্নতি পেয়েছেন।


শিক্ষা ক্যাডারের নবীন সদস্য মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজের ৩৫তম ব্যাচের প্রভাষক মাহমুদ বিন আমিন বলেন, দ্রুত সমাধান না হলে আরও অনেক শিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আশা করি শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টির সমাধান করবেন।কাউকে বা কোনো কিছুকে দোষারোপ না করে সমস্যা সমাধানে মাউশিকে আরও তৎপর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, সুপার নিউমারির মাধ্যমে পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি সরকারের পলিসিতে নেই। এখন এটা কিভাবে, কোন রূপে করা যায় সে বিষয়ে মাউশিকেই চিন্তভাবনা করে জনপ্রশাসনে প্রস্তাব পাঠাতে হবে।


বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ মাউশির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক নোমান-উর-রশীদ বলেন, যেহেতু সবাই আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা, তাই সমতা দরকার। ক্যাডারে ক্যাডারে বিভাজন হলে মানসিক স্বস্তি, কাজের মূল্যায়ন থাকবে না।
সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে জানিয়ে মাউশির বর্তমান মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ গোলাম ফারুক বলেন, ৯৮ অধ্যক্ষকে তৃতীয় গ্রেড ও মাউশির ৩ অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদটি দ্বিতীয় গ্রেড করার জন্য জনপ্রশাসনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। চতুর্থ গ্রেডের অধ্যাপকদের বিদ্যমান পদের ৫০ শতাংশ হিসেবে মাত্র ৯৮টি পদকে তৃতীয় গ্রেড দেওয়া কী কম নয়, এমন প্রশ্নের উত্তরে মহাপরিচালক বলেন, ধীরে ধীরে সব হবে।


২০১৫ সালে গঠিত কোর কমিটি পে-স্কেল দেওয়ার আগের সিলেকশন গ্রেডের আদলে অধ্যাপকদের বিদ্যমান পদের ৫০ শতাংশ হিসেবে ৪২৯টি পদকে তৃতীয় গ্রেডে উন্নীতের সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তা আমলে না নিয়ে নিজেদের বিবেচনা অনুযায়ী ৯৮টি পদকে তৃতীয় গ্রেডে উন্নীতের সিদ্ধান্ত দিয়েছে বলে জানিয়েছেন মাউশির প্রশাসন ও কলেজ শাখার পরিচালক অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরী। তিনি বলেন, তবে ৪২৯টির একটিও কমে রাজি হবেন না বলে শিক্ষামন্ত্রী আমাদের কাছে মতপ্রকাশ করেছেন। বিষয়কে ভিত্তি ধরে ৯৮টি পদকে তৃতীয় গ্রেডে উন্নীতের জন্য মাউশির প্রস্তাব নিয়ে আপত্তির বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, এসএসবিতে বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচিত হবে। জ্যেষ্ঠতার বিষয়টিও থাকবে।

   
২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর ফরাসউদ্দিন পে-কমিশন সরকারের কাছে পে-স্কেলের প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে সচিব কমিটি এ নিয়ে কাজ করে ২০১৫ সালের ১৪ মে সরকারের কাছে জমা দেয়। প্রতিবেদনের নানা অসঙ্গতি নিয়ে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। অসন্তোষ আমলে না নিয়ে ৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভায় পে-স্কেল অনুমোদন করা হয়। প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ১৫ ডিসেম্বর। অধ্যাপকদের পদমর্যাদা ও বেতনক্রম অবনমন, পদ আপগ্রেড, সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বহাল, বৈষম্য নিরসনে সুপার নিউমারির মাধ্যমে পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি নিশ্চিত করার দাবি জানান শিক্ষকরা।


দাবি আদায়ে আন্দোলনে নামেন শিক্ষকরা। সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি সিনিয়র সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কোর কমিটি গঠন করা হয়। কোর কমিটির সঙ্গে আলোচনায় শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বিদ্যমান প্রফেসর পদের ৫০ শতাংশকে তৃতীয় গ্রেড  ও ১৪টি পদকে দ্বিতীয় গ্রেডে উন্নীতের পাশাপাশি শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান ও বড় কলেজের অধ্যক্ষের পদগুলোকে প্রথম গ্রেডে উন্নীতের প্রস্তাব করা হয়। শিক্ষকদের প্রস্তাবের ওপর আলোচনার পর বিদ্যমান প্রফেসর পদের ৫০ শতাংশ তৃতীয় গ্রেড ও ১৪টি পদকে দ্বিতীয় গ্রেডের মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

কিন্তু বিগত পাঁচ বছরেও এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে দুঃখ ঘোচেনী শিক্ষকদের।মাউশি ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালকের দুটি পদ শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম গ্রেডের ছিলো। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালকের পদটি শিক্ষকদের ভাষায় বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডার ‘বেদখল’ করায় ১৫ হাজার শিক্ষক-কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় ক্যাডারে প্রথম গ্রেডের পদ মাত্র একটি। এই বৈষম্য নিয়েও দুঃখ রয়েছে শিক্ষকদের মনে।


বৈষম্য নিরসনে ক্যাডার সদস্যের সংখ্যানুপাতে উপরে তৃতীয়, দ্বিতীয় ও প্রথম গ্রেডের পদসৃষ্টি করলেই কেবল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হতে পারে বলে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা। এ বিষয়ে তারা শিক্ষা পরিবারের সর্বোচ্চ অভিভাবক শিক্ষামন্ত্রীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। 

ইমরান