খুঁড়িয়ে চলছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন

খুঁড়িয়ে চলছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন

মেহেদী হাসান, গাজীপুর থেকে ফিরে

এক সময়ের ভাওয়াল রাজার গাজীপুর এখন সর্ববৃহৎ মহানগরীতে পরিণত হয়েছে। আয়তনের দিক থেকে দেশের সর্ববৃহৎ সিটি কর্পোরেশন হিসেবে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন জায়গা করে নিয়েছে। প্রতিষ্ঠাকালের দিক থেকে কনিষ্ঠতম থাকলেও আয়তনের দিক থেকে দেশের সর্ববৃহৎ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন (গাসিক)। যার আয়তন ৩২৯ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার। ৫৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন গঠিত। ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠিত হলেও নাগরিক সেবা নিশ্চিতে ৮ বছরেও মাঠপর্যায়ে দেখা যায়নি তেমন কোনো কার্যক্রম। বিশেষ শ্রেণির জেলা হিসেবে ২০১০ সালে গাজীপুর জেলার নাম ঘোষিত হয়। ২০১৮ সালে গাজীপুর মহানগরকে ৮টি থানায় বিভক্ত করে মেট্রোপলিটন পুলিশিং কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে গাজীপুর মহানগরের প্রতিটি ওয়ার্ডেই ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। মহানগর এলাকায় সব মিলিয়ে ছোট-বড় প্রায় বিশটি বস্তি এলাকা রয়েছে। সেখানে বসবাস করছে নিম্ন শ্রেণির হতদরিদ্র পরিবারগুলো। গাসিকের পূর্বে গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়ন, কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরি ইউনিয়ন ও শ্রীপুর উপজেলার প্রহল্লাদপুর ইউনিয়ন এবং পশ্চিমে কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক ও মধ্যপাড়া ইউনিয়ন এবং সাভার উপজেলার শিমুলিয়া ও দামসোনা ইউনিয়ন, উত্তরে গাজীপুর সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়ন, দক্ষিণে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও সাভার উপজেলার ইয়ারপুর ইউনিয়ন অবস্থিত।

বর্তমানে এই মহানগরীতে জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ। টঙ্গি ও কোনাবাড়িতে রয়েছে দুইটি শিল্প নগরী। দেশের অর্ধেকের বেশি গার্মেন্টস্ এই অঞ্চলেই অবস্থিত। তাই শিল্পনগরী হিসেবেও গাজীপুর বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে এই মহানগরীতেই নেই তেমন উন্নয়নের ছোঁয়া। মহানগরীর প্রতিটি এলাকাতেই রয়েছে দলীয় লোকজনের নানা কোন্দল, আছে জনপ্রতিনিধিদের নানাবিধ অনিয়ম ও দুর্নীতি। পাশাপাশি কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও নির্বাচনী ইশতেহারই বাস্তবে রূপ নেওয়াতে পারেননি গাজীপুরের নগর পিতা মেয়র জাহাঙ্গীর আলম। যেখানে নগর পিতারই রয়েছে বিভিন্ন দায়িত্বে অবহেলা, সেই নগরীতে বাকিরা কতটুকু উন্নয়নের কাজ করবেন সেটা নিয়েও রয়েছে নানা গুঞ্জন।

সরেজমিনে বেশকিছু এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পুরো নগরীতে খানাখন্দে ভরা সড়ক, সড়কের পাশেই ড্রেনেজ ব্যবস্থায় রয়েছে জলাবদ্ধতা, আছে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়, বিভিন্ন শিল্প-কলকারখানার দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিম্নমানের সরঞ্জাম এবং সঞ্চালন লাইন দিয়ে চলমান অবৈধ গ্যাস সংযোগ এবং মারাত্মক বায়ু-পরিবেশ দূষণে গাজীপুর মহানগরের প্রাকৃতিক পরিবেশ এখন বিপর্যস্ত। মহানগরীকে এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে সিটি কর্পোরেশন মাঠপর্যায়ে তেমন কোন ভূমিকাতেই দেখা যায়নি। এলাকাবাসীর অভিযোগ জাহাঙ্গীর আলম মেয়র হওয়ার পূর্বে মিষ্টি কথায় মানুষের মন ভুলিয়েছেন। আর মেয়র হওয়ার পর এলাকার উন্নয়নে তার ভূমিকা তেমন নেই বললেই চলে। জাহাঙ্গীর আলম নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিলেন, যাতায়াত ও ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, হোল্ডিং ট্যাস্ক না বাড়িয়ে সেবার মান বৃদ্ধি, মাদকমুক্ত নগর গড়ে তোলা, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত করা, সিটি সেন্টার গড়ে তোলা এবং বিনামূল্যে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করবেন তিনি। মেয়র হিসেবে কয়েকবছর দায়িত্ব পালন করলেও তার নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নেই ব্যর্থতার ভার কাঁধে বহন করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে পুরো এলাকা। সরেজমিনে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকা পরিদর্শনকালে দেখা যায়, দেশের সর্ববৃহৎ সিটি কর্পোরেশন গাজীপুর হলেও এই মহানগরীই রয়েছে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত অবস্থায়। উন্নয়নের বদলে এলাকাগুলোতে বাড়ছে বিভিন্ন দুর্ভোগ।

সড়ক থেকে শুরু করে মহাসড়ক, অলিগলি থেকে শুরু করে এলাকার আনাচে-কানাচে নেই তেমন উন্নয়ন। একদিকে ধুলোবালিতে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম অন্যদিকে আবর্জনার দুর্গন্ধ, আবার অনেক এলাকাতেই নেই পয়ঃনিষ্কাশনের যথাযথ ব্যবস্থা। সড়ক থেকে মহাসড়কে লেগে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট। আবার পর্যাপ্ত ফুটওভার ব্রিজ না থাকায় প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা। এদিকে যানজট নিরসনের নামে সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলম রাস্তায় নামিয়েছেন একটি বিশেষ বাহিনী। তারা ট্রাফিক পুলিশের সহযোগী হিসেবে যানজট রোধের নামে নিয়মিত অবস্থান করছে সড়কে। সড়ক-মহাসড়কের বিভিন্ন প্রবেশপথ, ইউটার্নে পথচারী-গাড়ি পারাপারে ট্রাফিক পুলিশকে সহায়তার নামে রাস্তায় তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩ শতাধিক কর্মী গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় নিয়োজিত রয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকশত সদস্যকে সিটি কর্পোরেশন থেকে বেতন দিচ্ছেন মেয়র।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ট্রাফিকের পাশাপাশি স্থানীয় থানাপুলিশও যানজট নিরসনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে আসছে। আর মেয়রের বিশেষ বাহিনী সড়কে নির্দিষ্ট কিছু পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যার মধ্যে অধিকাংশ পরিবহনই সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ। সড়কে ট্রাফিক পুলিশের চেয়ে মেয়রের দেওয়া পোশাক পরা বাহিনীর সংখ্যা বেশি থাকায় নানা প্রশ্ন উঠছে ট্রাফিক পুলিশ নিয়ে। স্থানীয় একাধিক লোক বলছেন, মেয়রের নির্বাচনে যারা কাজ করেছেন সেখান থেকে তিনি অনেক লোককে যানজট নিরসনের নামে চাকরি দিয়ে সরকারি টাকা গচ্ছা দিচ্ছেন। সড়কের লেন বিভাজন ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করলেই যানজট নিরসন সম্ভব বলেও মনে করেন অনেকেই। এদিকে সড়কে বছরের পর বছর খোঁড়াখুঁড়ি, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও অব্যবস্থাপনার ফলে প্রকল্প ব্যয় দফায় দফায় বৃদ্ধি পেলেও গাজীপুরের মহাসড়কটি এখন জনদুর্ভেগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত মহাসড়কের উভয় পাশের সকল প্রকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ আর্থিক লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানিয়েন এলাকাবাসী। মহাসড়কের মাঝখানে খালি রেখে দুদিকে সরু রাস্তা করে বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই বিকল্প রাস্তাও এখন খানাখন্দে ভরা। রাস্তার ওপর সোজা করে বিভিন্ন স্থানে রাখা হয়েছে রড, আবার সড়কেই ফেলা হচ্ছে আবর্জনা। ধুলোবালিতে সড়কের পাস দিয়েও হাঁটার মতো কোনো পরিবেশ নেই। সিটি কর্পোরেশন থেকে সড়কে কখনো পানি ছিটানো হয় না বলেও অভিযোগ করেন অনেকেই। সব মিলে দূষিত পরিবেশ আর অব্যবস্থাপনা সীমা ছাড়িয়ে গেছে মহানগরীতে। সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের রয়েছে নিজস্ব অনেক সম্পত্তি। সেই সম্পত্তির হচ্ছে না সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ। সিটি কর্পোরেশনের অনেক সম্পত্তিতেই গড়ে উঠেছে মাদক ও পতিতা বাণিজ্য।

এছাড়াও অনেকের বিরুদ্ধেই রয়েছে জমি দখলের নানা অভিযোগ। আছে উচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করার মতো গুরুতর অন্যায় কাজ। রেহাই পায়নি সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলীও। বেশকিছুদিন আগেই তাকে হত্যা করা হয়। এই অভিযোগের তীরও এসেছিল মেয়রের কাছের এক শুভাকাক্সক্ষীর বিরুদ্ধে। স্থানীয় অনেকেই বলেন, বর্তমান সরকার দলীয় মেয়র জাহাঙ্গীর আলম দায়িত্ব পাওয়ার পরও মহানগরীর ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। এ বিষয়ে মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কথা মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বাংলাদেশের আলোকে বলেন, তার এলাকাতে সিটি কর্পোরেশনের অনেক উন্নয়নমুলক কাজ হচ্ছে। সড়কে খানাখন্দের বিষয়ে মেয়র বলেন, সড়কে উন্নয়নের কাজ চলছে। যারা কাজ করছে সেটা তাদের বিষয়। যানজট নিরসনের বিষয়ে তিনি বলেন, এলাকার যানজট কমাতেই সিটি কর্পোরেশন থেকে লোক দেয়া হয়েছে। তাদের বেতন কিছু সিটি কর্পোরেশন দেয় কিছু তার ফাউন্ডেশন বহন করে। সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব কোন সম্পত্তি নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এছাড়াও সিটি কর্পোরেশনের কোন দুর্নীতি অনিয়ম নেই বলেও জানান গাজীপুর সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলম।

বিআলো/ইসরাত