টিউশন ফি’র চাপে দিশেহারা অভিভাবক

টিউশন ফি’র চাপে দিশেহারা অভিভাবক

উৎপল দাশগুপ্ত: টিউশন ফি আদায় নিয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চাপে ‘দিশেহারা’ হয়ে পড়ার অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা। রাজধানীসহ সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই টিউশন ফি নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানরা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ছাড়া শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদান এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনা সম্ভব নয়, তাই স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকদের কাছে বকেয়া টিউশন ফি চাওয়া হচ্ছে।’ 

এদিকে করোনা মহামারির জন্য হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া এই সমস্যা সমাধানে সব পক্ষকে সহনশীল হওয়ার আহবান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা বিষয় তদারককারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মু. জিয়াউল হক বলেছেন, ‘চাপের বিষয়টি কোনো অভিভাবক যদি বোর্ডকে জানান তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের স্বার্থ সংরক্ষণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মো: জিয়াউল কবির দুলু এ বিষয়ে বলেন, ‘আগামী ৬ মাস শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি মওকুফ করার জন্য গত ১০ জুন আমরা শিক্ষামন্ত্রী বরাবর আবেদন করেছি। তবে এখনো কোনো সাড়া পাইনি।’

জানা গেছে, কিন্ডারগার্টেন স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ পর্যন্ত সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গত বেশ কিছুদিন ধরে টিউশন ফি পরিশোধের জন্য মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে অভিভাবকদের নোটিশ পাঠিয়ে তাগাদা দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো এসব এসএমএসে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নাম্বার, বিকাশ, নগদ এবং রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে ফি পরিশোধের জন্য তাগাদা দিচ্ছে। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান আবার টিউশন ফি আদায়ের কৌশল হিসেবে পরবর্তী শ্রেণিতে প্রমোশন না দেয়া এবং পরীক্ষায় বসার সুযোগ না দেওয়ার কথাও বলছে আকারে-ইঙ্গিতে। টিউশন ফি পরিশোধ নিয়ে সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই কমবেশি একই অবস্থা বিরাজ করছে। 

টিউশন ফি পরিশোধের তাগাদা দিয়ে বারবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমন নোটিশে বিব্রত ও বিরক্ত অভিভাবকরা। রাজধানীর মিতালী বিদ্যাপীঠের অষ্টম শ্রেণির এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘করোনাকালের এই দুঃসময়ে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই যেখানে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তখন সন্তানের টিউশন ফি পরিশোধে স্কুলের উপর্যুপরি তাগাদায় খুব খারাপ লাগছে। বারবার এসএমএস দিয়ে তাগাদা দিচ্ছে।’ 

অন্যদিকে রাজধানীর ওয়ারীর ইংরেজি মিডিয়ামের কানাডিয়ান ট্রিলিয়াম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ‘প্লে’ গ্রুপের এক অভিভাবক জানান, স্কুলের বারবার তাগাদায় বাধ্য হয়ে এপ্রিল পর্যন্ত টিউশন ফিসহ সকল বকেয়া পরিশোধ করে সন্তানকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছেন। রাজধানীর কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল এন্ড কলেজের একাধিক অভিভাবকও টিউশন ফি পরিশোধে বিকাশ নাম্বার দিয়ে তাগাদা দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন। এছাড়া ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ, রাজধানীর ধোলাইপাড়ের বর্ণমালা স্কুল এন্ড কলেজ, টিকাটুলির সেন্ট্রাল ওমেন্স কলেজসহ প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানই টিউশন ফি আদায়ে তাগাদা দিচ্ছে বলে জানা গেছে। 

করোনাভাইরাসের কারণে হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া এই সমস্যা সমাধানে সবপক্ষকে সহনশীল হওয়ার আহবান জানিয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমের কাছে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, ‘যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামর্থ্য আছে, তাদের উচিত অভিভাবকদের জন্য সর্বোচ্চ ছাড় দেওয়া। আর যেসব অভিভাবকের সামর্থ্য রয়েছে, তাদের উচিত টিউশন ফি দিয়ে দেওয়া।’ 

গত ২৩ এপ্রিল ঢাকা শিক্ষা বোর্ড টিউশন ফি আদায়ে অভিভাবকদের ‘বাধ্য করা যাবে না’ মর্মে নোটিশ জারি করলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানরা তা মানছেন না। বিষয়টি বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর মু. জিয়াউল হককে জানালে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, ‘বিষয়টিকে জেনারালাইজ করা যাবে না। কেউ কেউ মানছে। কোনো অভিভাবক যদি সুনির্দিষ্টভাবে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করে, আমরা ব্যবস্থা নিব।’  

অভিভাবকদের অভিযোগের জবাবে আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম বলেন, ‘ছাত্ররা বেতন না দিলে আমরা কিভাবে চলবো।’ তিনি জানান, এক অভিভাবকের করা রিট মামলায়  স্কুলের পক্ষে  রায় আসার পর আবার টিউশন ফি নেয়া শুরু হয়েছে। এদিকে টিউশন ফি পরিশোধে তাগাদার অভিযোগকে ‘মিথ্যা’ মন্তব্য করে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আরিফুর রহমান টিটু বলেন, ‘কোনো চাপ নয়, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে হয়, তাই অভিভাবকদের পরামর্শেই বিকাশ নাম্বার দিয়ে টিউশন ফি চাওয়া হচ্ছে।’ 

একই দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ আবুল হোসেন। তিনি জানান, তাগাদার পর যা পেয়েছেন তাতে গত পাঁচ মাসের মধ্যে একমাসেরও বেতন হয়নি। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ঠিকমত টিউশন ফি না পেলেও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়মিত দেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।’ বণর্মালা স্কুল এন্ড কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি সালাম বাবু অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য টিউশন ফি আদায় ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’ ভিকারুননেসা নুন স্কুল এন্ড কলেজও এসএমএস পাঠিয়ে টিউশন ফি পরিশোধে অভিভাবকদের নোটিশ করেছে। প্রতিষ্ঠানসূত্রে জানা গেছে, অনেক শিক্ষার্থীর গত পাঁচ মাসের বেতন বকেয়া হলেও মানবিক বিবেচনায় গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুই মাসের বেতন পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। 

টিউশন ফি নিয়ে সৃষ্ট এই জটিলতা সমাধানে অবিলম্বে একটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সবাই। সকল দিক বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেই এই সমস্যার সমাধান বের করতে হবে বলে তারা মনে করেন। 

বিআলো/ইসরাত