ডাকাত আতংকে মতলব উত্তরবাসী

ডাকাত আতংকে মতলব উত্তরবাসী

সুমন সরদার: জলে-স্থলে সমান তালে ডাকাতের কবলে সর্বস্ব হারাচ্ছে চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তরের মানুষ। একেকটা ঘটনা ঘটার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে হুলস্থুল আয়োজন দেখা গেলেও মিলছে না স্থায়ী কোনো সমাধান। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর থেকে আস্থা হারাচ্ছে সর্বসাধারণ।

চুরি, ডাকাতির ঘটনায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আতংকে দিন কাটছে এ দ্বীপ অঞ্চলবাসীর। জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন ধরনের চাকরি অথবা নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার কাজে রাজধানীমুখী এখানকার অধিকাংশ মানুষ। মতলব উত্তরের দক্ষিণ অংশের কিছু মানুষ ছাড়া বাকিদের বাড়িতে ফিরতে নৌপথ একমাত্র অবলম্বন হওয়ায় একের পর এক ডাকাতির কবলে পড়ে হারাতে হচ্ছে সর্বস্ব।

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া ও মতলব উত্তরের কালিপুর বাজারে নৌ-পুলিশের ফাঁড়ি থাকলেও জনগণের জান-মালের নিরাপত্তায় বরাবরের মতই ব্যর্থ হওয়ায় জনসাধারণের ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ১৯ নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় নারায়ণগঞ্জ ঘাট থেকে মতলবের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া মুকবিল-২ লঞ্চটি মতলব উত্তরের ষাটনল ঘাটে পৌঁছার আগেই ৪ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে একদল সশস্ত্র ডাকাত হামলা চালায়।

এসময় নারী-পুরুষ সবাইকে অস্ত্রেরমুখে জিম্মি করে অর্থসম্পদসহ সকল মালামাল লুটে নেয়। দেড় শতাধিক মানুষের মালামাল লুটে নিয়ে ডাকাতদল বীরের মতো চলে যায়। লঞ্চটিতে ডাকাতি হচ্ছে এমন তথ্য নৌ-পুলিশকে জানালেও ডাকাত ধরতে তারা ব্যর্থ হয়। ঢাকা থেকে মতলব উত্তরে যেতে ভবেরচর থেকে চর কালিপুর হয়ে ট্রলার দিয়ে নৌপথ পাড়ি দিয়ে মতলব উত্তরের বাজার কালিপুর যেতে হয়। এই পথটিও রয়েছে ডাকাতদের দখলে।

নিয়মিত বিরতিতে এই পথে ঘটছে ডাকাতির ঘটনা। গত ৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় মেঘনা নদীর মল্লিকের চর এলাকায় একই সঙ্গে ঘটে তিনটি ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা। এর আগে ১৭ আগস্ট রাত সাড়ে আটটার দিকে একটি যাত্রীবাহী ট্রলারে এবং গত ১৪ আগস্ট দিনে-দুপুরে বরযাত্রীবাহী একটি লঞ্চে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ১৫ জনের সশস্র ডাকাত দল ১২ ভরি স্বর্ণালংকারসহ সকলের মোবাইল সেট নিয়ে যায়।

এ এলাকায় এখন প্রাণের মায়ায় নিজের সব কিছু ডাকাতের হাতে তুলে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে শূন্যহাতে বাড়ি যেতে হয়। চলতি বছরের জানুযারী মাসে কালির বাজার ও কালিপুর বাজারে ১১টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রায় ৫০ ভরি স্বর্ণ, একহাজার ভরি রুপা এবং নগদ ৮ লাখ টাকা নিয়ে চম্পট দেয় ডাকাতদল।

এই ঘটনায় ডাকাতের হামলায় প্রশান্ত দেবনাথ নামে এক স্বর্ণ দোকানি আহত হন। এদিকে গত ২৬ অক্টোবর উপজেলার বাগানবাড়ি ইউনিয়নের গালিমখা এলাকায় ডাকাতের কবলে পড়ে খোদ পুলিশের টহল গাড়ি। এসময় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তিন ডাকাতকে আটক করা হয়। আটককৃত ডাকাতদের কাছ থেকে বেশকিছু অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়।

ধর্ষণের ভয় দেখিয়ে মা-মেয়ের হাত-পা বেঁধে ডাকাতির ঘটনা ঘটে চলতি বছরের ১৬ অক্টোবর ছেংগারচর পৌরসভার সিকিরচর গ্রামে। এসময় নগদ দেড় লাখ টাকা, তিনটি মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নেয় ডাকাতরা। মতলব উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ নাসির উদ্দিন মৃধা জানান, এ পর্যন্ত ৩টি ডাকাতির মামলায় ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি বাজারে নাইটগার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

চৌকিদারদের মাধ্যমে নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। নৌপথে ডাকাতি বন্ধে কার্যকরি কোনো পদক্ষেপ হাতে নিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে নৌ-পুলিশের চাঁদপুর জোনের এডিশনাল এসপি বেলায়েত হোসেন জানান, মকবুল-২ লঞ্চে ডাকাতির ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন। নৌপথে ডাকাতি বন্ধে বিশেষ টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নৌপথে ডাকাত নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন থেকে শক্ত হাতে ডাকাত দমন করা হবে। নিজেদের সীমানায় একের পর এক ডাকাতি ঘটনায় ঘটে চললেও ডাকাতি প্রতিরোধে কোনো সফলতা কেন পাচ্ছেন না জানতে চাইলে গজারিয়া নৌ-ফাঁড়ির এসআই মজিবুর রহমান দায়সারাভাবে বলেন, সারা রাত পাহারা দিতে আমাদের কমপক্ষে ২০ লিটার তেল লাগবে। তাই আমরা পাড়ের কাছেই দৃশ্যমান এলাকায় অবস্থান নিয়ে থাকি।

কোনো দুর্ঘটনার খবর পেলেই আমরা ছুটে যাই। পাহারায় থাকার পরও কেন প্রতিনিয়ত ডাকাতির ঘটনা ঘটছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডাকাতি হলে আমরা মামলা নেই আসামি ধরি। এ পর্যন্ত ২টি ডাকাতির ঘটনায় ৫ জনকে আটক করেছে বলেও জানান তিনি।