বিএনপির নতুন ঐক্য গঠনের আহবানে রয়েছে সফলতার প্রশ্ন

বিএনপির নতুন ঐক্য গঠনের আহবানে রয়েছে সফলতার প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক:রাষ্ট্রপতির সংলাপ গুরুত্ব না দিয়ে নির্বাচনী বৃহৎ ঐক্য গঠনের লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছে বিএনপি। এই ঐক্য গঠনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপে বসতে চায় দলটি। তবে, তাদের এই উদ্দেশ্য কতটুকু সফলতার মুখ দেখবে তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। যেখানে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোটেই ভাঙন ধরেছে একাধিকবার। জোটের শীর্ষনেতারা বলছেন, বিএনপি প্রায় দু'বছর জোটের কোনো বৈঠকই করতে পারেনি। বিএনপি কী উদ্দেশ্যে নতুন ঐক্যের ডাক দিচ্ছে তা তারাই জানে।

বিগত জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপির নেতৃত্ব ড. কামাল, আ স ম রব, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, মাহমুদুর রহমান মান্নাকে নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও এখন আর কার্যকর নয়। বিএনপির এ নয়া উদ্যোগের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতারা। এই অবস্থায় বিএনপির নতুন ঐক্যের ডাক কতটুকু সফলতা আসবে তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।

বিএনপির নতুন ঐক্যের আহবান প্রসঙ্গে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বিবার্তাকে বলেন, এখনও মেসেজ পাইনি। সংলাপ বা ঐক্য গঠনের আহবান পেলে সিদ্ধান্ত জানাবো। বিএনপির এই ঐক্য গঠনের সফলতা নিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি কোন প্রক্রিয়ায় ঐক্য করতে চাচ্ছে, এর উদ্দেশ্য কী তা আগে পরিস্কার হতে হবে। তারপর এর সফলতা ও ব্যর্থতার বিচার করা যাবে।


২০দলীয় জোট বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হলেও সরকার বিরোধী কোনো কঠোর কর্মসুচি দিতে পারেনি বিএনপি। জোট বা ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতে বিএনপিকেই দৃশ্যমান দেখা গেছে। এবার নতুন করে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিসহ নানা প্রস্তাব নিয়ে অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে নিজেরাই সংলাপের আয়োজন করছে বিএনপি। ৩ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। মতবিনিময় সভায় বিএনপির অবস্থান সম্পর্কিত একটি খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয় দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে। ডান, বাম ও মধ্যপন্থি ছোট-বড় সব ধরনের রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই আলোচনা করবে তারা। যেসব রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ বর্জন করেছে তাদের নিয়ে বৃহত্তর জোট করার কথাও ভাবছে বিএনপি।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের বাইরে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত সব দলকে আমন্ত্রণ জানাবে বিএনপি। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে এই সভা শুরুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দলগুলোর সঙ্গে কিছু সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে আলোচনা করার কথা রয়েছে। অভিন্ন দাবিতে ‘একসঙ্গে’ অথবা ‘যুগপৎ’ আন্দোলনের উদ্দেশ্যে ঐক্য গড়ার বিষয়ে আগ্রহের কথা জানাবে বিএনপি। এক্ষেত্রে পুরনো জোটকাঠামো প্রয়োজনে ভেঙে দিতেও রাজি বলে দলটির নীতিনির্ধারকরা জানান।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম চলমান সংলাপে অংশ নিলেও বিএনপি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), সিপিবি, ইতোমধ্যে সংলাপের আমন্ত্রণ পেলেও তাতে অংশ নেয়নি। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগও (বিএমএল) অংশ নেবে না বলে জানা গেছে। সংলাপে অংশ না নেয়া দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় সভার বিষয়ে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করেছে বিএনপি।

বিএনপির আরেকটি সুত্র জানায়, সিপিবি, জাসদ (একাংশ), বাসদসহ আরও বেশ কিছু দলের সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপি। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা সবাই ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। পর্যায়ক্রমে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত সব দলের সঙ্গেই কথা বলবে বিএনপি।


জানা গেছে, বিএনপির এই মতবিনিময়ের উদ্দেশ্যই হলো- নির্বাচনের আগে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা। এই ঐক্যের মাধ্যমেই বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা, নির্বাচনকালীন তত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠন করতে চায় দলটি।

এদিকে, রাষ্ট্রপতির সংলাপে বিএনপির না যাওয়ার সিদ্ধান্ত অনুসারেই দেশের ডান, বাম ও ইসলামীসহ অনেক রাজনৈতিক দলই এখন আর সংলাপে যাচ্ছে না।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) কর্নেল অব. অলি আহমেদ বিএনপির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবার্তাকে বলেন, বিএনপি কী করছে, কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তারাই ভালো বলতে পারবে। তাদের সম্পর্কে আমাদের কোনো ধ্যান-ধারণা নেই। প্রায় দু’বছর ২০দলীয় জোটের কোনো বৈঠক নেই। বিএনপি কী উদ্দেশ্যে আবার নতুন ঐক্যের ডাক দিচ্ছে, কার কথায় এগুলো করছে তা তারাই ভালো বলতে পারবে।


বিএনপি সংলাপের আহবান নিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ স ম রব বিবার্তাকে বলেন, যেকোনো সময় যেকোনো বিষয়ে সংলাপ বা আলোচনা হতেই পারে। আমরা বিদ্যমান সংকট নিরসনে জাতীয় সরকার দাবি করছি। কোনো একক দলের পক্ষে এই পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব নয়। সংলাপ হলে আমরা জাতীয় সরকার নিয়ে কথা বলবো।

বিএনপির এই আহবান কতটুকু সফল হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে রব বলেন, একটি স্বৈরাচারী সরকার যখন ঘাড়ে চেপে বসে তখন সারাবছরই আলোচনা হতে পারে। আমরা গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, বাক-স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি। সেই গণতন্ত্র আজ বন্দী। তা মুক্তির প্রশ্নে অবশ্যই আমরা সফল হবো।

নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর মান্না এবিষয়ে বিবার্তাকে বলেন, বিএনপির নতুন জাতীয় ঐক্য গঠন বা সংলাপ নিয়ে কিছু জানি না। আমার কাছে এবিষয়ে কেউ কোনো মতামতও জানতে চায়নি। তবে, যেকোনো ঐক্যই পজেটিভ। আমরা ২০দলীয় জোটে ছিলাম না। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে যেকোন সময় যেকোনো ঐক্য হতে পারে।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কাছে এই নুতন ঐক্যের সফলতা নিয়ে জানতে চাইলে বিবার্তাকে এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

এবিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য আমাদের চেয়ারপার্সন বেগম জিয়ার সুচিকিৎসা, মুক্তি এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এই প্রশ্নে বিএনপি দেশের সকল ডান ও বামপন্থি সব রাজনৈতিক দলের বৃহৎ ঐক্য গড়ে তুলতে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবে। এরই মধ্যে বাম গণতান্ত্রিক জোটের কয়েকটি দল এবং ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে তাদের অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিআলো/শিলি