বিনামূল্যের পাঠ্যবই নিয়ে জটিলতা 

বিনামূল্যের পাঠ্যবই নিয়ে জটিলতা 

উৎপল দাশগুপ্ত: আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বিনামূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণ নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। মূলত পাঁচটি কারণে এই জটিলতার সৃষ্টি। 

এর ফলে ১ জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তক উৎসবের মাধ্যমে দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে শতভাগ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাঠ্যবই বিতরণ নিয়েও শংকা তৈরি হয়েছে। শংকার বিষয়টি মেনে নিয়েও মানসম্পন্ন পাঠ্যবই পাওয়ার বিষয়টিই আগে নিশ্চিত করতে চায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।  

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যে পাঁচটি কারণে পাঠ্যবই মুদ্র্রণ নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে সেগুলো হলো- কাগজের দাম বৃদ্ধি, বইয়ের কাভার মুদ্রাকরদের হাতে না পৌঁছানো, মাধ্যমিকের বইয়ের ভিতরের মলাটের ছবি মুদ্রণের ব্যয় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া, এনসিটিবির মান তদারকি প্রতিষ্ঠানের কাগজের ছাড়পত্র দিতে দেরি হওয়া এবং ‘বাস্টিং ফ্যাক্টর’ (কাগজের শক্তি বা কতটুকু টান দিলে কাগজটি ছিঁড়ে যায়) বিষয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান।

এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় মুদ্রণের কাজ বন্ধ হয়ে আছে। এছাড়া ইতিপূর্বে ছাপা হওয়া প্রাথমিকের বইগুলোও এখনও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো সম্ভব হয়নি। অথচ বিগত দিনগুলোতে এই সময় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের মোট বইয়ের অন্তত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মাঠপর্যায়ে পাঠানোর কাজ শেষ হয়ে থাকে। 

এনসিটিবির একাধিক সূত্র এবং পাঠ্যবই মুদ্রণের সঙ্গে জড়িতরা জটিলতার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে এসব সংকট কাটিয়ে প্রতিবারের মতো এবারও বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই হাতে পাবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন।  

এসব প্রসঙ্গে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা দৈনিক বাংলাদেশের আলোকে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে এ বছরটি ব্যতিক্রম। পাশপাশি ইজিপিতে (অনলাইন) দরপত্রের কারণে গত বছরের চেয়ে এবার দেরিতে কাজ শুরু করতে হয়েছে। ফলে পাঠ্যবই মুদ্রণের টেন্ডার থেকে শুরু করে সব প্রক্রিয়াই অন্য সময়ের চেয়ে পিছিয়েছে। তারপরও আমরা আমাদের রুটিন অনুযায়ী সকল কাজ করে যাচ্ছি। 

এখনও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বই পাঠানো শুরু হয়নি, তাই বছরের শুরুতে শতভাগ পাঠ্যবই বিতরণ নিয়ে শংকা রয়েছে কিনা প্রশ্নের উত্তরে চেয়ারম্যান বলেন, যারা বই ছাপায় বই পাঠানো তাদেরই দায়িত্ব। নানা কারণে তাদের হয়তো দেরি হয়েছে। বিষয়টি প্রিন্টার্সদের অভ্যন্তরীণ ম্যানেজমেন্টের বিষয়। আজ রবিবার থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পাঠ্যবই পাঠানো শুরু হবে বলে চেয়ারম্যান জানান। 
এনসিটিবির দরপত্রের শর্তানুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সবাইকে বই সরবরাহ করতে হবে। ফলে কাজে দেরি করা বা অযথা সময় নষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই মন্তব্য করে চেয়ারম্যান বলেন, এতে প্রিন্টার্সদেরই ক্ষতি। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শতভাগ পাঠ্যবই বিতরণ ও পাঠ্যপুস্তক উৎসবের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এনসিটিবির এই শীর্ষ কর্মকর্তা।     

এদিকে এনসিটিবির পাঠ্যবই মুদ্রণের সঙ্গে জড়িত একাধিক নাম প্রকাশ না করার প্রিন্টার্স জানিয়েছেন, সম্প্রতি কাগজের মিলগুলো সিন্ডিকেটেড হয়ে কাগজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। যে দরে তারা এনসিটিবির কাজ পেয়েছে বর্তমান দর তার চেয়ে অনেক বেশি। বই মুদ্রণে এটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
মাধ্যমিক স্তরের বই মুদ্রণের জন্য এখনও বইয়ের কাভার পাননি উল্লেখ করে প্রিন্টার্সরা জানান, পাঠ্যাংশ মুদ্রণের পরপরই তা বাঁধাই না করলে কাগজ নষ্ট হয়ে যায়। তাই আগে কাভার ছেপে পরে পাঠ্যাংশ ছাপিয়েই বাঁধাই করে ফেলা হয়। কিন্তু এখনও কাভার ছাপতে না পারায় বই মুদ্রণের পুরো প্রক্রিয়াটিই আটকে আছে। 

তারা আরও জানান, এবারই প্রথমবারের মতো মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের মলাটের ভিতরের পৃষ্ঠায় স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন ছবি ক্যাপশনসহ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে ৭০টি ছবি বাছাই করা হয়। ছবি বাছাই করা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন নিতে অনেক সময়  নষ্ট হয়। 

প্রিন্টার্সদের দাবি, ছবি বাছাই ও তা ছাপানোর বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেলেও বিষয়টি ব্যয়সাপেক্ষ। তাছাড়া এনসিটিবির মূল কাজের মধ্যে এটি ছিল না। এটি অতিরিক্ত কাজ। এই কাজের ব্যয়বাবদ প্রিন্টার্সরা কী হিসাবে অর্থ পাবেন, বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে প্রিন্টার্সদের পরামর্শ হচ্ছে-এজন্য এনসিটিবি বাংলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট এসব প্রতিষ্ঠানের বই মুদ্রণের বিষয়টি যাচাই করে সে হিসাবে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে বিষয়টির দ্রুত সমাধান চান তারা। না হলে বই মুদ্রণে অনেক সময় নষ্ট হবে। 

এছাড়া চাহিদা অনুযায়ী কাগজের বাস্টিং ফ্যাক্টর  নিয়ে এনসিটিবি ও প্রিন্টার্সদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী অবস্থান তৈরি হয়েছে। এনসিটিবির চাহিদা হচ্ছে ৮০ শতাংশ জিএসএম (পুরুত্ব) এবং ৮৫ শতাংশ উজ্জ্বলতার পাশাপাশি কাগজের বাস্টিং ফ্যাক্টর ১৬ থাকতে হবে। কিন্তু প্রিন্টার্সদের দাবি, দেশের যেসব কাগজ কলের কাগজে বই ছাপা হয় তাতে বাস্টিং ফ্যাক্টর সর্ব্বোচ্চ ১৪ থাকে। এছাড়া এনসিটিবির মান তদারককারী প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র প্রদানের জটিলতাতেও পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি প্রিন্টার্সদের। তবে এসব সংকট সত্ত্বেও নির্দিষ্ট সময়েই পাঠ্যপুস্তক উৎসব করে শতভাগ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাঠ্যবই বিতরণ সম্ভব মন্তব্য করে প্রিন্টার্সরা বলেন, পাঠ্যবই বিতরণ অনিশ্চিত বলার মতো সময় এখনও হয়নি। এখনও আড়াই মাস বাকি। সংকটের সমাধান হয়ে গেলে দ্রুতই বই পাঠানো সম্ভব।

১ জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তক উৎসবের বিষয়টি পালন করা সম্ভব হলেও ওই সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শতভাগ বই বিতরণের বিষয় নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে এনসিটিবিতে। 

সূত্র জানায়, বর্তমানে বৈশ্বিক করোনাভাইরাস মহামারি চলছে। ১ জানুয়ারি স্কুল খুলবে কিনা সে বিষয়টি অনেক কিছুর উপর নির্ভর করছে। পাশপাশি ১ জানুয়ারি স্কুল খুললেও মূল বিষয়ের বই নিয়েই উৎসব হতে পারে। পরবর্তীতে স্কুলে ওই শিক্ষার্থীর ভর্তির পর বাকি বইগুলো পেলেওতো কোনো সমস্যা নেই। 
সূত্রের দাবি, ১ জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তক উৎসব ও শতভাগ শিক্ষার্থীর মধ্যে বই  বিতরণ নিয়ে প্রতিবছর অনিশ্চয়তার প্রশ্ন তোলা একশ্রেণির প্রিন্টার্সদের একটি  কৌশল। এর ফলে এনসিটিবি বই মুদ্রণে তাড়াহুড়া করবে। সে সুযোগে তারা (প্রিন্টার্সরা) নিয়মের বাইরে অনেক কিছু করার সুযোগ পাবে বলে মন্তব্য করেন এই সূত্র। সূত্র মতে, এবার করোনকাল, তাই উৎসবের বিষয়টি মাথায় রেখেও পাঠ্যবইয়ের মান নিয়ন্ত্রণে কোনো ছাড়  দেওয়া হবে না।    

আজ রবিবার থেকে প্রিন্টার্সদের মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের কাভার সরবরাহ করা হবে বলে জানিয়েছেন এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মো: জিয়াউল হক। এই স্তরের বইয়ের ভিতরের কাভারের ছবি ছাপার খরচের বিষয়টিও শিগগিরই সমাধান হয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বইয়ের বাস্টিং ফ্যাক্টর নিয়ে জটিলতার বিষয়ে তিনি বলেন, সম্প্রতি আমরা মেঘনা পেপার মিল থেকে কাগজ কিনেছি, তাদের কাগজের বাস্টিং ফ্যাক্টর ২১। তাহলে অন্যরা পারবে না কেন। 

২০২১ শিক্ষাবর্ষে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩৪ কোটি বই বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১০ কোটি ২৫ লাখ ৮২ হাজার ৫৫৫টি প্রাথমিক স্তরের। বাকিগুলো মাধ্যমিক, দাখিল ও ইবতেদায়ি স্তরের বই।

বিআলো/ইসরাত