ব্যাংক লুটপাটে পরিচালকরা

ব্যাংক লুটপাটে পরিচালকরা

সুমন সরদার: ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছে দেশের কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালকরা। নিজের ব্যাংক এবং অন্য ব্যাংক থেকে যোগসাজশের মাধ্যমে পরিচালকদের ভাগাভাগি করে নেওয়া অধিকাংশ ঋণের টাকাই আর ফেরত আসছে না। এর ফলে মন্দ ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, যা আর্থিক খাতকে ক্রমেই দুর্বল করে দিচ্ছে। দেশের ব্যাংকিং খাত খেলাপি ঋণের বৃত্ত থেকে বের হতে না পারায় এর প্রভাব যে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ওপর পড়ছে তা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের শিল্প খাতও। এ খাতে দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাটের জন্য পরিচালনা পর্ষদ বহুলাংশে দায়ী বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সূত্র বলছে, ঋণের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঋণদাতা ও গ্রহীতা একই চক্র। ভুয়া প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে কৌশলে দু’পক্ষ মিলে ঋণের টাকা আত্মসাৎ করে। এমনও অভিযোগ আছে, পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবশালী ব্যক্তি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে নিজেই ঋণের পুরো টাকা তুলে নিয়ে কিছুদিন পর তা খেলাপি দেখায়। এরপর যথানিয়মে তা অবলোপন করা হয়। আর অবলোপনের সময় নিরাপত্তা সঞ্চয়ের নামে যে অর্থ ব্যাংকে রাখা হয় তার মধ্যেও আছে শুভঙ্করের ফাঁকি। ব্যাংকের পরিচালনা ব্যয় বেশি দেখিয়ে চড়া সুদ আরোপ করে এসব ঘাটতি সেখান থেকে মেটানো হয়। এর ফলে বাড়তি সুদের চাপে এগোতে পারছে না শিল্পপ্রতিষ্ঠান। পরিচালকদের বেপরোয়া চাপে ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি, অনিয়মের পরিমাণ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি এ কথা স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, দেশে এখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি। এজন্য অনেকটা বেপরোয়াভাবেই বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার হিড়িক পড়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নতুন-পুরনো মিলিয়ে দেশের সরকারি-বেসরকারি ৬০টি ব্যাংক। এসব ব্যাংক পরিচালকদের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। ১৯টি ব্যাংকের পরিচালক নিজের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন প্রায় ৪শ’ কোটি টাকার বেশি। একইভাবে ৯টি ব্যাংকের পরিচালক জিম্মাদার হয়ে ঋণ দিয়েছেন আরো ২৩১ কোটি টাকা।


সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ব্যাংকগুলোর খেলাপিদের ঋণের একটি বড় অংশই বর্তমান ও সাবেক ব্যাংক পরিচালক, তাদের স্ত্রী-পুত্র-সন্তান বা তাদের নিকটাত্মীয়দের কাছে আটকা পড়ে আছে। এসব ঋণ প্রস্তাব, অনুমোদন ও বিতরণের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকগুলোর পরিচালকের সংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি হলেও এ ধরনের সমঝোতাভিত্তিক বড় অংকের ঋণ বিনিময় করেন শতাধিক পরিচালক। যাদের কয়েকজন বেশি বিতর্কিত। মূলত এদের কাছেই পুরো ব্যাংকিং সেক্টর জিম্মি।

সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্সের কেলেঙ্কারি

অর্থ পাচার ও বিএনপিকে অর্থায়নের অভিযোগে বেসরকারি খাতের সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংকের চেয়ারম্যান এসএম আমজাদ হোসেন ও তার স্ত্রী-কন্যার ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সম্প্রতি বিএফআইইউ থেকে চিঠি পাঠিয়ে দেশে কার্যরত ব্যাংকগুলোকে ৩০ দিনের জন্য ব্যাংক হিসাব স্থগিত করার পাশাপাশি তিন কর্ম দিবসের মধ্যে ব্যাংক হিসাবের স্থিতি বিএফআইইউতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এসএম আমজাদ হোসেন ছাড়াও, তার স্ত্রী সুফিয়া আমজাদ ও তাদের কন্যা তাজরি আমজাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে বিএফআইইউ। এর আগে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশনে চিঠি পাঠিয়ে আমজাদ হোসেনের শেয়ার বিক্রির বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-পরিচালক ও অনুসন্ধান দলের প্রধান গুলশান আনোয়ার প্রধান। জালিয়াতিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পেয়েছে দুদক। এসব অভিযোগ তদন্তের স্বার্থে এসএম আমজাদ হোসেন, তার স্ত্রী সুফিয়া আমজাদ ও তাদের কন্যা তাজরিকে দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার বিষয়ে ইমিগ্রেশন পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। অভিযুক্তরা স্থল ও সমুদ্র বন্দর দিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে পারেন- এমন তথ্য থাকায় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইমিগ্রেশন পুলিশকে অনুরোধ জানিয়েছিল দুদক। সাউথ বাংলা ব্যাংকের চেয়ারম্যান এসএম আমজাদ হোসেন নামে বেনামে ও বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে প্রায় ৬৬০ কোটি টাকার মতো ঋণ বিতরণ করেছেন।

হলমার্ক কেলেঙ্কারি : হলমার্ক দুর্নীতি ছিল ব্যাংকিং জগতের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। এ ঘটনা অর্থনীতিবিদদের মতো গোটা দেশের মানুষকে বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়েছিল। সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে ২০১০-১২ সময়ের মধ্যে জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয় তিন হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে হলমার্ক গ্রুপই হাতিয়ে নেয় আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি। এত বড় অর্থ কেলেঙ্কারির জন্য সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা অফিস মূল অভিযুক্ত হলেও ব্যাংকটির পরিচালনা কর্তৃপক্ষও এর দায় এড়াতে পারে না। এই বিবেচনা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের সুপারিশ করে। ২০১২ সালে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল তখনকার সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ।
বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারি : হলমার্কের রেশ কাটতে না কাটতেই ব্যাংকিং খাতে আরেকটি আঘাত এসে ধাক্কা দেয়। তৈরি হয় গভীর ক্ষত। সেই ক্ষতের নাম বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারি। টেরি টাওয়েলস রপ্তানির ভুয়া তথ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ১২শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন বিসমিল্লাহ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা সোলায়মান আনোয়ার চৌধুরী। ব্যাংকের পরিচালক ও কর্মকর্তাদের সহায়তায় জনতা, প্রাইম, প্রিমিয়ার, শাহজালাল, সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেন তিনি। বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উদ্ঘাটিত হওয়ার পর থেকে খাজা সোলায়মান আনোয়ার চৌধুরী, তার স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান নওরীন হাসিবসহ অন্য পরিচালকরা ২০১৩ সালে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। বিসমিল্লাহ গ্রুপ জনতা ব্যাংক ভবন কর্পোরেট শাখা থেকে ফান্ডেড ৩০৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ও নন ফান্ডেড ২৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, মগবাজার শাখা থেকে ১৭৭ কোটি ১০ লাখ ফান্ডেড ও নন ফান্ডেড এক কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং এলিফ্যান্ট রোড শাখা থেকে ফান্ডেড ১৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে। এ ছাড়া প্রাইম ব্যাংক মতিঝিল শাখা থেকে ফান্ডেড ২৬৫ কোটি ৪০ লাখ ও নন ফান্ডেড টাকা ৬১ কোটি ৮ লাখ, প্রিমিয়ার ব্যাংক মতিঝিল শাখা থেকে ফান্ডেড ২৩ কোটি ২২ লাখ ও নন ফান্ডেড ৩৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যমুনা ব্যাংক লিমিটেডের দিলকুশা শাখা থেকে ফান্ডেড ১০৮ কোটি ৪৪ লাখ ও নন ফান্ডেড ৪৬ কোটি দুই লাখ টাকা এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের ইস্কাটন শাখা থেকে ৯৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা ফান্ডেড ও ১০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা নন ফান্ডেড হিসেবে অর্থ আত্মসাৎ করে।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি : বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতি দেখে চোখ কপালে উঠে  অর্থনীতিবিদদের। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন শেখ আবদুল হাই বাচ্চু। সিএজির প্রতিবেদনে ঋণ বিতরণে অনিয়মের জন্য তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ পর্ষদকে দায়ী করা হয়েছে। বেসিক ব্যাংকের ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বা সিএজি কার্যালয়। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক এ সংস্থাটি বলেছে, ব্যাংকটি যে প্রক্রিয়ায় ঋণ অনুমোদন দিয়েছে তা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে নজিরবিহীন। কোনো রকম বাছ-বিচার ছাড়াই স্বেচ্ছাচারীভাবে যাকে খুশি তাকে ঋণ দেওয়া হয়েছে। যে কারণে এক সময়ের সবচেয়ে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটি লোকসানে পড়েছে। যার বিরূপ প্রভাবে বেসিক ব্যাংক বর্তমানে গভীর সংকটে। সিএজির এই প্রতিবেদনে মোট ৫ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকার গুরুতর অনিয়ম উঠে আসে। এতে অবৈধ ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। পাঁচ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকার ঋণ বিতরণে ১১১টি গুরুতর অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে সিএজির নিরীক্ষা দল। অবৈধ প্রক্রিয়ায় গুলশান শাখার গ্রাহক না হওয়া সত্ত্বেও এএফজি শিপিং লাইন, মেসার্স শিফান শিপিং লাইন, মেসার্স আমির শিপিং লাইন, এশিয়ান শিপিং লাইনকে জাহাজ কেনার জন্য মোট ২১২ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। একই শাখায় সুহী শিপিং লাইন নামে এক প্রতিষ্ঠানকে জামানত ছাড়া ১৪৭ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার প্রমাণ পায় অডিট দল।

এনআরবি ব্যাংকে অনিয়ম : দুর্নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কাজটি করে এনআরবি ব্যাংক। এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক সম্পর্কে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনআরবিসির বোর্ড সভায় অনুপস্থিত পরিচালকদের স্বাক্ষর জাল করে উপস্থিতি দেখিয়ে পর্ষদ সভার কার্যবিবরণী করা হয়েছে। নিয়ম ভেঙে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেয়ারম্যানের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে। ব্যাংকটি গঠনের সময় মূলধন আনায় অনিয়ম, অনিবাসীদের পরিবর্তে বেনামে বাংলাদেশে বসবাসকারী ব্যক্তি কর্তৃক ব্যাংকের শেয়ার কেনা, বিধিবহির্ভূতভাবে ঋণ প্রদান এবং ব্যাংক হতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টির সঙ্গে পর্ষদ সদস্য ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সম্পৃক্ততার কথা আসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনে।

ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ অনিয়ম : আর্থিক খাতের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে ফারমার্স ব্যাংককে চিহ্নিত করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।  সাবেক মন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মালিকানাধীন ফারমার্স ব্যাংক যাত্রা শুরুর তিন বছর না যেতেই শত শত কোটি টাকা ঋণ বিতরণে অনিয়ম ধরা পড়ে বেসরকারি এই ব্যাংকটিতে। অনিয়মগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- ঋণ নিয়মাচার লঙ্ঘন করে ব্যাংকের পরিচালকসহ অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দেওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা না মেনে ফারমার্স ব্যাংকের নতুন ঋণ দেওয়ার কথাও এসেছে প্রতিবেদনে। এসব অনিয়মের কথা ফারমার্স ব্যাংক স্বীকারও করেছে বলে জানায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ২০১৩ সালের জুন মাসে ফারমার্স ব্যাংক আরো আটটি ব্যাংকের সঙ্গে লাইসেন্স পেয়েছিল, যা রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে চরম অর্থ সংকটে ভোগা এ ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের রাখা আমানতের টাকাও দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে সংসদীয় কমিটির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক পরে সাংবাদিকদের বলেন, ব্যাংকগুলো যেসব অনিয়ম করেছে, পড়লেই গা শিউরে ওঠে। এসব অনিয়মের দায় বোর্ডকে নিতে হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যাংক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকের মালিকপক্ষ তথা কিছু পরিচালক ব্যাংককে সেবামূলক বা লাভজনক প্রতিষ্ঠান না ধরে এটাকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মেশিন বানিয়ে রেখেছে। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার প্রশ্নে ব্যাংকে তার আমানত রাখবে, আর সে টাকা নিজেরা ভাগাভাগি করে নেবেন। আবার নিজেরা ঋণখেলাপি হয়ে তা এক পর্যায়ে অবলোপনও করবেন। এজন্য পরিচালক হয়েও যারা ঋণ নিচ্ছেন তাদের কোনো চিন্তা নেই। পরিস্থিতি খারাপ দেখলে সপরিবারে বিদেশে সটকে পড়বেন। ভবিষ্যতে এমন আশংকার কথা মাথায় রেখে তাদের প্রত্যেকে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে নিয়ে গেছেন। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ঋণ ছিল ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ঋণের ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ খেলাপি। খেলাপি ঋণের মধ্যে ৪২ হাজার ২৯২ কোটি টাকা রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ৪০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। আর বিশেষায়িত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা ও বিদেশি ব্যাংকের ৪ হাজার ৬১ কোটি টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৪ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, যা ওই সময়ে মোট ঋণের ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ। আর জুন শেষে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৬ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। খেলাপি ঋণ এত কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান  গণমাধ্যমকে জানান ‘নিয়ম করে কোনো ঋণকে খেলাপি হতে দেওয়া হয়নি। তাই খেলাপি ঋণ কম। এতে কোনো স্বস্তি নেই। যদি প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণ এত কম হতো, তাহলে ভালো লাগত। এখন যেসব ঋণ আদায় হবে না, তার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।’ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘ব্যাংকিং খাত তদারকি ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ : বাংলাদেশ ব্যাংকের সুশাসনের সমস্যা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা ও আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি কার্যক্রমের ক্ষেত্রে দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তার একটি হলো বাহ্যিক প্রভাব, অন্যটি অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ।

 

বিআলো/ইসরাত