মেজর সিনহা হত্যার কিলিং মিশন

মেজর সিনহা হত্যার কিলিং মিশন

মেহেদী হাসান, মোঃ শাহীন মিয়া: এক পরিকল্পিত ছকেই নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হয়েছে সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা। বর্তমানে টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে এই হত্যাকান্ডটির ঘটনা। একের পর এক বের হতে চলেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। তবে সব রহস্যেরই তীর গিয়ে পৌঁছাচ্ছে মাদক ব্যবসাকেই ঘিরে। টানা কয়েকদিন যাবত ইয়াবা বাণিজ্যের নেপথ্য কাহিনী নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরি করতেই কক্সবাজার জেলায় অবস্থান নিয়েছিল সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। সব কিছু ছাপিয়েই গোপন অনুসন্ধানকালে অনেকটাই বিপদমুক্ত ছিলেন তিনি। তবে শেষ মুহূর্তে টেকনাফের ওসি প্রদীপ কুমারের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করাটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। সেই অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকারে কথা বলতে গিয়েও নাস্তানাবোধ হয় টেকনাফ থানা পুলিশ। জানা গেছে, দেশের সীমান্তবর্তী টেকনাফ থানায় যোগদানের পর থেকে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ব্যাপক বেপরোয়া। পুলিশি বাহিনীর পাশাপাশিও ছিল তার নিজস্ব প্রাইভেট বাহিনী। বিভিন্ন সময় নানাবিধ পুলিশি অভিযানে ব্যবহার করা হতো তাদের। স্থানীয় পর্যায়ে সর্ব মহলেরই অজানা ছিল না এসব অপকর্ম। তবে সবই ছিল ওপেন-সিক্রেট। কারণ পথের কাঁটা সড়াতে ক্রসফায়ারে হত্যা করতে ভুলতো না সাবেক ওসি প্রদীপ। গত ৩১ জুলাই টেকনাফের বাহারছড়া শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহাকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সদ্য বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপসহ সাতজন আত্মসমর্পণ করে। এখন কারাগারে। রবিবার থেকে আসামিদের পর্যায়ক্রমে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু  হয়। 

‘চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ এ শ্লোগানের বিপরীতে প্রদীপ টেকনাফ থানা এলাকাজুড়ে অবৈধ প্রভাব বিস্তারের যে বলয় গড়ে তুলেছিল তা অন্ধকার জগতকেও হার মানায়। পুলিশি ক্রসফায়ারের নামে তার সিরিয়াল কিলিং মিশন,  গ্রেফতার বাণিজ্য, জমি দখল থেকে শুরু করে সকল অপকর্মের সাথেই জড়িত ছিল প্রদীপ। ইয়াবাসহ মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার বিপরীতে তিনি টেকনাফ থানা ভবনের তিনতলায় একটি টর্চার সেল করেছিলেন। এছাড়া টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় ছিল একাধিক টর্চার সেল গড়ে তোলেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। 

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে,  মেজর সিনহা হত্যাকান্ডের দিন বিকেল আনুমানিক চারটার দিকে টেকনাফের ওসি প্রদীপ কুমার দাস (সাবেক ওসি) সাবেক মেজর সিনহার একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি সাক্ষাৎকারের ফাঁদে পড়েন। অতিমাত্রায় উৎসাহী ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগীরা ইয়াবা বাজারজাত ও পাচারের ক্ষেত্রেও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকার কথা স্বীকার করতেও বাধ্য হন। সফল সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেই মেজর সিনহা আর একদন্ড সময় ক্ষেপণ করেননি। ঝড়ের বেগে থানা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের গাড়িতে উঠে বসেন। তার সঙ্গে ভিডিও রেকর্ডিংয়ে ব্যস্ত থাকা সাহেদুল ইসলাম সিফাতও ক্যামেরা, ট্রাইপড, ব্যাগ গোছাতে গোছাতেই ছুটে গিয়ে গাড়িতে উঠতেই টেকনাফ সদর ছেড়ে গাড়িটি ছুটতে থাকে উত্তর দিকে বাহারছড়ার পথে। বাহারছড়া সংলগ্ন মারিসঘোণা এলাকাতেই বসবাস করেন চলচ্চিত্রের ফাইটিং গ্রুপ পরিচালনাকারী ইলিয়াস কোবরা। হঠাৎ তার টেলিফোনে করা আমন্ত্রণ পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারেননি মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এদিকে থানা থেকে মেজর সিনহা বেরিয়ে যেতেই ওসি প্রদীপ অচিরেই বড় রকমের বিপদের আশংকায় তৎক্ষনাৎ কক্সবাজারের এসপি মাসুদকে ফোন করে বিস্তারিত জানিয়ে দেন। সব শুনে এসপি নিজেও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কয়েক মিনিটেই এসপির নির্দেশনায় তৈরি হয় মেজর সিনহা’র নৃশংস হত্যার নিশ্ছিদ্র পরিকল্পনা। মারিসঘোণায় নিজের বাগানবাড়ি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার নামে ইলিয়াস কোবরা সেদিন বিকেল সাড়ে চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত নির্জন পাহাড়েই নিজ হেফাজতে রেখেছিলেন মেজর সিনহাকে। এ সময়ের মধ্যে মেজরের অবস্থান, কতক্ষণ পর কোন রাস্তায় কোথায় যাবেন সেসব তথ্য জানিয়ে কোবরা প্রায় ৯টি গোপন এসএমএস পাঠান ওসিকে।

সূত্রটি আরও জানায়, সিনহাকে গণপিটুনিতে হত্যার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছিল গ্রামবাসীর এক বাহিনীকে, ওসির সেই বাহিনী অবস্থান নেয় দক্ষিণের বড়ডিল পয়েন্টে- আর উত্তরদিকের শামলাপুর চেকপোস্টে ওঁৎপেতে ছিলেন খুনি লিয়াকতের বাহিনী। নিশ্ছিদ্র ছকে কোনোভাবেই বেঁচে ফেরার উপায় ছিল না সিনহার। অভিযুক্ত পুলিশের পরিকল্পনা অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টার দিকেই টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস তার পছন্দের দুই এসআই ও দুই কনস্টেবল নিয়ে নিজের সাদা নোহায় এবং আরো ৫/৭ জন পুলিশ সদস্য অপর একটি মাইক্রোবাসে থানা থেকে মেরিন ড্রাইভওয়ে ধরে উত্তর দিকে ছুটতে থাকে। ওসি বাহিনী বাহারছড়া-কক্সবাজারের পথে শামলাপুর পুলিশ ক্যাম্পে যাওয়ার পথেই ইলিয়াস কোবরার নতুন খবর আসে।

সূত্রটি আরো জানায়, ওসি প্রদীপকে ফোন করে তিনি জানান, এ মুহূর্তে মেজর সিনহা ও তার ভিডিওম্যান সিফাত মারিসঘোণার পাহাড় চূড়ায় উঠছেন। সেখানে গভীর সমুদ্রের দিক থেকে ছোট বড় ইঞ্জিনবোটগুলো সার্চ লাইটের আলো ফেলে ফেলে সমুদ্র সৈকতের দিকে আসতে থাকে, আবার ডজন ডজন ইঞ্জিনবোট সমুদ্র সৈকত ছেড়ে গভীর সমুদ্রের দিকেও যেতে থাকা দৃশ্যপটের ভিডিওচিত্র ধারণ করাটাই ছিল তার ডকুমেন্টারির শেষ দৃশ্য। 

ইলিয়াস কোবরার পরবর্তী ফোনের তথ্য অনুযায়ী ওসি প্রদীপ ক্রসফায়ার বাণিজ্যের টাকা সংগ্রহকারী এজেন্ট বলে কথিত আব্দুল গফুর মেম্বার, হাজী ইসলাম, মুফতি কেফায়েতউল্লাহ ও হায়দার আলীকে ফোন করে জানান, মারিসঘোণা পাহাড়ের চূড়ায় বেশ কয়েকজন ভয়ংকর সন্ত্রাসী বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জড়ো হয়েছে। তারা কেউ পাহাড় থেকে নামার চেষ্টা করলেই যেন এলাকার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে ডাকাত ডাকাত চিৎকার জুড়ে দেয়া হয় এবং যাদেরকে হাতেনাতে পাবে তাদেরকেই যেন গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হয়। তবে চৌকস সেনা অফিসার সিনহা পাহাড়ের চূড়ায় থাকাবস্থায়ই চারপাশে সাজ সাজ রব দেখে সতর্ক হয়ে উঠেন। ঠিক তখনই বেশ কিছুসংখ্যক গ্রামবাসী ডাকাত ডাকাত চিৎকার জুড়ে দিয়ে তাদের চারপাশ থেকেই ধাওয়া দিতে থাকে। শামলাপুরের সেই পুলিশ চেকপোস্ট। ওসির নির্দেশে যেখানে এসআই লিয়াকতসহ একদল পুলিশ আরো আগে থেকেই ওঁৎপেতে অপেক্ষায় ছিল-সেখানেই পৌঁছে যায় মেজর সিনহার গাড়িটি। গাড়িটির খুব কাছে অস্ত্র তাক করে মেজরকে হাত তুলে সামনের দিকে মুখে করে আসার নির্দেশ দেন তিনি। আর গাড়ি থেকে নামতেই অব্যর্থ নিশানায় লিয়াকত পর পর চারটি বুলেটবিদ্ধ করেন মেজর সিনহার দেহে। ফলে লুটিয়ে পড়েন তিনি। লিয়াকতের গুলিতে মেজর মাটিতে লুটিয়ে পড়ার ১৫/১৬ মিনিটের মধ্যেই ওসি বাহিনী সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হন। কারণ, টেকনাফ থানা থেকে শামলাপুর চেকপোস্ট পর্যন্ত যেতে প্রাইভেটকারে ৪০/৪৫ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু তিনি মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরের বড়ডিল এলাকায় থাকায় ১৫/১৬ মিনিটেই চেকপোস্টে পৌঁছেই মেজর সিনহার লুটিয়ে পড়া দেহখানাকে পা দিয়ে চেপে ধরে নিজের আগ্নেয়াস্ত্র থেকে পর পর দুটি গুলিবর্ষণ করে লাথি মেরে নিথর দেহখানাকে রাস্তার ধারে ফেলে দেন।

তবে এবিষয়ে ইলিয়াস কোবরা নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। এবং তার সাথে নিহত সিনহার কোন পরিচয়ও হয়নি বলেন। তিনি বলেন, তাকে নিয়ে মিথ্যা অপপ্রচার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ইলিয়াস কোবরার বক্তব্য নিতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয় গেছে। এরপর শুরু হয় পুলিশের যত নাটকীয়তা। ওসি নিজে বাঁচতে একের পর এক সহায়তা চাইতে থাকেন বিভিন্ন জায়গায়। আইনি জটিলতা কাটাতেও নেয়া হয় এক আইনজীবীর পরামর্শ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৯ অক্টোবর টেকনাফ থানায় ওসি পদে যোগ দেয়ার পর প্রদীপের নির্দেশনায় এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে ১৪৪টি। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২০৪ জন। এই ২০৪ জনের মধ্যে আসলে কে দোষী, কে নির্দোষ তা প্রদীপই বলতে পারবেন। এছাড়া বলতে পারবেন এলাকার লোকজন। ইতোমধ্যে প্রদীপের বিরুদ্ধে এলাকায় স্বজন হারানো লোকজন সোচ্চার হতে শুরু করেছেন। ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে, নিরীহ লোকজনদের ধরে নিয়ে মোটা অংকের অর্থ আদায় করতেন। অর্থ আদায়ের পরও কাউকে ক্রসফায়ারে দিতেন। আবার কাউকে আদালতে চালান দিতেন।

বিআলো/ইসরাত