রাজনীতির মাঠ ফের উত্তপ্ত 

রাজনীতির মাঠ ফের উত্তপ্ত 

মেহেদী হাসান : দেশে রাজনীতির অঙ্গনে আবারও উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে। শান্ত পরিবেশকে আবারো অশান্ত করার পাঁয়তারায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে অগ্নিসন্ত্রাসীরা। রাজধানীতে একদিকে চলছিল উপনির্বাচনের ভোটের আমেজ অন্যদিকে বিভিন্ন প্রান্তে হঠাৎ করেই ধারাবাহিকভাবে যাত্রীবাহী বাসে আগুন লাগিয়ে আতংক সৃষ্টি করা হয়। ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণ শেষ হতে না হতেই এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনাকে রাজনীতিতে এক অশুভ সংকেত বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল হিসেবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থানে অনড় থাকায় বহুদিন পর হঠাৎ করেই রাজনীতির ময়দানে যেন টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে।

সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে  আওয়ামী লীগ ও জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জোটসহ দেশের নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে সারা দেশে ভোটারগণ ৪০,১৯৯টি ভোট কেন্দ্রে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোট শেষে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে। তবে ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি। 

এর আগে ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের দাবিতে নির্বাচন বর্জন করে। এর পরই দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে উত্তাপ। জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচিতে নাজেহাল হয়ে পড়ে দেশের জনগণ। রাজপথেই ঝরে পড়ে মানুষের নিথর দেহ। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় আন্দোলনের নামে সহিংসতা ও বিরোধীদের নামে মামলা  এবং গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে। ধীরে ধীরে শান্তশিষ্ট পরিবেশের রূপ নেয় সারা দেশ। পরপর তিনবার নির্বাচনে হেরে গিয়ে বিএনপি যেন হাঁপিয়ে ওঠে রাজনীতির ময়দানে। দুর্নীতির দায়ে কারাবরণ শেষে শর্তসাপেক্ষে খালেদা জিয়া জামিনে ছাড়া পেলেও রাজপথে নামতে দেখা যায়নি তাকে।

শূন্য আসনে উপনির্বাচনকে ঘিরে হটাৎ করেই যেন অশান্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে রাজপথ। পূর্বের মতই যেন জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচিতে নিজেদের শক্তির জানান দিতে পাঁয়তারা করছে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা। গত মাসের ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা-৫ আসনের উপনির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপি অংশগ্রহণ করে। তবে নির্বাচনের পূর্ব থেকেই বিএনপি-আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় চলে নানা সংঘর্ষ। এতে দুই দলেরই অনেক নেতা-কর্মী হতাহত হয়। ভোটের দিনেও চলে একে অন্যের ওপর দোষারোপ। ঢাকা-৫ এর ১৮৭টি কেন্দ্রে আ’লীগ প্রার্থী কাজী মনিরুল ইসলাম মনু ৪৫ হাজার ৬৪২টি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়। তবে ওইদিন সন্ধ্যায়ই সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদ ভোটের ফলাফল বয়কট করেন। এদিকে উপনির্বাচনে ভোটের আগেই নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠায় বিএনপি। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে বিরতিহীনভাবে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণ চলে।

ঢাকা-১৮ আসনে আ’লীগের প্রার্থী মো. হাবিব হাসান, বিএনপি মনোনীত এসএম জাহাঙ্গীর ও জাতীয় পার্টির নাসির উদ্দীন সরকারসহ ছয় প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৪টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ সংসদীয় আসনের ২১৫টি ভোটকেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৭৭ হাজার ৭৭৩ জন। নির্বাচনকে ঘিরে বেশ কিছুদিন যাবতই এই আসনে চলে টানটান উত্তেজনা। 

ওইদিন সকাল থেকেই যখন ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে ছুটে চলেছে ভোটকেন্দ্রে, ঠিক সেই সময়েই সকাল আনুমানিক পোনে ১১টার দিকে উত্তরার ৮নং সেক্টরের মালেকাবানু আদর্শ বিদ্যানিকেতন স্কুলের ভোটকেন্দ্রে আচমকাই ধারাবাহিক ককটেল বিস্ফোরণে যেন মুহূর্তের মধ্যেই ৮ আসনের প্রায় সব কেন্দ্রেই আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এসময় টানা ১৭টি ককটেল বিস্ফোরিত হয় এবং কয়েকটি অবিস্ফোরিত ককটেল থেকে যায় বলে জানায় স্থানীয়রা। এতে আতংকিত হয়ে ভোটাররা এদিক-সেদিক ছোটাছুটি শুরু করায় অনেকেই আহত হন বলেও জানা যায়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ দুই জনকে আটক  করে।

এদিকে উপনির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনে সকাল আনুমানিক ১১টায় নগরীর নয়া পল্টন এলাকার বিএনপি কার্যালয় থেকে একটি মিছিল বেড় করে ভাসানী ভবন হয়ে পুনরায় দলীয় কার্যালয়ে এসে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে বিএনপি সমর্থিতরা। বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, বিক্ষোভকারীরাই প্রথম কর কার্যালয়ের সামনে থাকা একটি সরকারি বাসে আগুন দেয়।  এছাড়াও দুপুরেই রাজধানীর শাহবাগ, প্রেসক্লাব, গুলিস্তান, মতিঝিল, নয়াবাজার, ভাটারা, শাহজাহানপুর, বিমানবন্দরসহ নয়টি স্থানে ১০টি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।

এ ঘটনায় বিএনপির ইশরাক হোসেন, ছাত্রদলের সভাপতি-সম্পাদক এবং যুবদলের সাধারণ সম্পাদকসহ মোট পাঁচ শতাধিক জনকে আসামি করে ১৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে নাশকতাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ১০টি বাস পোড়ানোর ঘটনায় জড়িত অনেককেই শনাক্ত করা হয়েছে। নাশকতার ঘটনায় ভাড়াটে অপরাধীরা অংশ নেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, জনমনে আতংক সৃষ্টি করা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ইতিমধ্যে এসকল মামলায় প্রায় অনেক আসামিকেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। হটাৎ করেই রাজধানীতে ধারাবাহিকভাবে ১০টি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগকে রাজনীতির আকাশে কালো মেঘের ঘনাঘটা বলেও মন্তব্য করছেন অনেকেই। দুপুরের পর থেকেই রাজধানীতে বেশ থমথমে অবস্থা বিরাজ করে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর প্রতিটি এলাকাতেই নাশকতা রোধ করতে পুলিশের পাশাপাশি সরকার দলীয় নেতা-কর্মীরা মাঠপর্যায়ে অবস্থান করে। সন্ধার পর থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নাশকতাবিরোধী মিছিল বের করে সরকার দলীয় নেতা-কর্মীরা। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি কামরুল হাসান রিপনের নেতৃত্বে বিশাল একটি মিছিল এসে জড়ো গুলিস্তানের আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ে। এছাড়াও প্রতিটি থানায় অবস্থান নেয় নেতাকর্মীরা। এ বিষয়ে সাবেক ছাত্রনেতা শওকত সাগর বাংলাদেশের আলোকে বলেন, যে কোনো ধরনের নাশকতা এড়াতে রামপুরার প্রতিটি ওয়ার্ডে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মীরা পুলিশের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে অবস্থান করে। জনগণের জানমাল রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর।

একই দিনে উপনির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে রাজধানীতে মশাল মিছিল করে ছাত্রদল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কারওয়ান বাজার মোড় থেকে মিছিলটি বেড় হয়ে পান্থপথে গিয়ে শেষ হয়। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের আয়োজনে মশাল মিছিলটি অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে দেশের প্রধান দুই দলের নেতাকর্মীরাই বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় একে অপরের বিরুদ্ধে আনছে নানা অভিযোগ। ধানমণ্ডির আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি তাদের ‘নীলনকশা অনুযায়ী’ ভোটের দিন রাজধানীতে ‘বাসে আগুন দিয়ে নাশকতা করেছে’। সেই পুরনো আগুন সন্ত্রাসের সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি, এটা তারা আগের মত শুরু করেছেন। পুলিশ একটি ভিডিও উদ্ধার করেছে বলেও জানান তিনি।

অপরদিকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত মিট দ্যা রিপোর্টার্স অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকারের কিছু এজেন্ট থাকে, যারা ষড়যন্ত্র করে, তারাই আন্দোলন বাধাগ্রস্ত করতে গাড়ি পুড়িয়ে নাশকতার সৃষ্টি করে। এছাড়াও নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পুনঃনির্বাচন দিতে এবং গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবিতে শনিবার ও রবিবার প্রতিবাদ সমাবেশের ঘোষণা দেয় বিএনপি।

বিআলো/ইসরাত