লাল বাতিতে চলে গাড়ি সবুজ বাতিতে থামে

লাল বাতিতে চলে গাড়ি সবুজ বাতিতে থামে

মেহেদী হাসান: ডিজিটাল দেশে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন করার লক্ষ্যে একে একে নানামুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও সেই অ্যানালগ পদ্ধতিতেই চলছে রাজধানী ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যাল। অথচ এ খাতে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের সড়কে প্রায় ৭২টি গুরুত্বপূর্ণ মোড় রয়েছে। ২০০২ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি স্থাপন করে নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্প। তবে রহস্যজনক কারণে এই বাতির ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়নি। 
ইতিমধ্যে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশ থেকে রিমোট ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ আমদানি করে কেইস প্রকল্প। রাজধানীর বেশকিছু এলাকার সড়কের মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা শেষে ট্রাফিক পুলিশের কাছে রিমোট হস্তান্তর করা হয়। তবে সেই সকল মোড়ে ব্যবহার হচ্ছে না ডিজিটাল সিগন্যাল বাতি। পর্যাপ্ত ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা না থাকায় যানজট যেন এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে লাল বাতি জ্বলে আছে দিনের পর দিন। অব্যবস্থাপনায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে সিগন্যাল বাতিগুলো। 

নগরীর সড়কে ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা চালু করা হলেও কোনো অদৃশ্য কারণেই থমকে আছে কার্যক্রম। বিভিন্ন সড়কের মোড়ে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানো হলেও বর্তমানে সেই বাতিগুলো পড়ে আছে নানা অবহেলায়। কোনোটি জ্বলে আছে দিনের পর দিন আবার কোনোটি আলোর মুখই দেখছে না। বাতিগুলোর নিয়ন্ত্রণে যেন রয়েছে ভুতুড়ে কর্মকাণ্ড।

বিশ্বের যানজটখ্যাত নগরীর মধ্যে অন্যতম স্থানে রয়েছে ঢাকা শহর। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি সেক্টরে ব্যাপক পরিবর্তন ও উন্নয়ন হলেও সড়কে যেন ভোগান্তির শেষ নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা অসহনীয় তাপদাহের মধ্যেও সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ট্রাফিক বিভাগ। রয়েছে নানা অভিযোগ, আছে নগরীতে দুর্বিষহ যানজট। আর সকলেই এর দায় দিয়ে থাকে ট্রাফিক ব্যবস্থার উপর। তবে কেউই দেখে না তাদের দুঃখ-কষ্ট। চারদিকের ধুলোবালি ও বাতাসেই যেন মিশে যায় এই সেক্টরে কর্মরত ট্রাফিক সদস্যদের সকল গ্লানি। দেশ ডিজিটাল হলেও এখন পর্যন্ত ট্রাফিক সেক্টরে লাগেনি তেমন উন্নয়ন ও ডিজিটালের ছোঁয়া। 
সরেজমিনে আব্দুল গনি রোড, বাংলামোটর, কাকরাইল মসজিদ, মৎস্য ভবন, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, কার্জন হল (শিক্ষাভবন) ও শাহবাগ মোড় পরিদর্শন করে দেখা যায়, মোড়গুলোতে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হয়েছে। তবে সেখানেও ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা রাস্তায় দাঁড়িয়েই অ্যানালগ পদ্ধতির মাধ্যমে (বাঁশি ফুঁ দিয়ে ও হাতের ইশারায়) সড়কে চলাচলরত পরিবহনের গতিবিধি ও সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করছেন।
এ বিষয়ে ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মোঃ আব্দুর রাজ্জাক বাংলাদেশের আলোকে বলেন, রাজধানীতে অফিস টাইম অর্থাৎ সকালে অধিকাংশ পরিবহন উত্তর সিটি কর্পোরেশন এরিয়া থেকে দক্ষিণ সিটি এরিয়ামুখী হয়। কারণ রাজধানীর বেশিরভাগ অফিসপাড়া হচ্ছে দক্ষিণ পাশে। হাসপাতাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বড় বড় শপিং মল ও সচিবালয়সহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক ও পেশাজীবীদের অবস্থান থাকে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এরিয়ামুখী। আর রেসিডেনসিয়াল এরিয়া হচ্ছে উত্তরমুখী (উত্তর সিটি কর্পোরেশন)। এতে করে প্রতিদিন সকাল বেলা অধিক পরিবহন উত্তর থেকে দক্ষিণমুখী হয়। এরকম দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে আবার বিকাল থেকে। এতে করে যে সকল এরিয়ায় আমাদের ট্রাফিক অটোমেটিক যে সিগন্যাল সেট করা হয়েছে সেখানে একটা নির্ধারিত সময় বেঁধে দেওয়া রয়েছে। ওই সময়েই সিগন্যাল বাতিগুলো চলে। কিন্তু অধিক পরিমাণ গাড়ির চাপ থাকায় ট্রাফিক সিগন্যালের নির্ধারিত সেট করা সময়ে সড়কে পরিবহন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় না। এতে করে রাস্তায় বিশাল লম্বা লাইন হয়ে যায়। দেখা যায়, পরিবহনের সারি এতটাই লম্বা হয় যে অন্য সিগন্যাল আটকে যায়। তাই ট্রাফিক পুলিশ বাধ্য হয়েই সিগন্যাল বাতি বাদ দিয়ে হাতের ইশারায় সড়কের ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে। 

গাড়ির চাপ-রাস্তাস্বল্পতায় ব্যাহত সিগন্যাল বাতি : রাজধানীতে প্রতিনিয়তই চলাচল করছে লক্ষাধিক পরিবহন। পরিবহনের তুলনায় রাস্তা সংকুলান থাকায় প্রতিদিনই বাড়ছে তীব্র যানজট। সড়কে পরিবহনের চাপ সামাল দিতে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। যানজটের কারণে ধীরগতিতে চলছে এসব যানবাহন। করোনার প্রকোপের মধ্যেই রাজধানীতে গাড়ির চাপ বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগেই থাকে যানজট। বর্তমানে সড়কের পরিবহন নিয়ন্ত্রণেও হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগকে। যাত্রাবাড়ী এলাকার দায়িত্বরত একাধিক ট্রাফিক পুলিশ অফিসার জানান, সড়কে গাড়ির চাপ বাড়ছে। সড়কের তুলনায় পরিবহন বেশি হওয়ায় সড়ক নিয়ন্ত্রণ বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে যাত্রাবাড়ী থেকে মতিঝিল যাওয়া এক যাত্রীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বাংলাদেশের আলোকে বলেন, ফ্লাইওভার হওয়ায় আগের চেয়ে বর্তমানে যানজট অনেকটাই কম। তবে অন্যান্য সড়কের পরিধি বাড়ালে রাজধানীর যানজট কমে যেত।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মোঃ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গাড়ির অতিরিক্ত চাপ ও রাস্তার সংকুলানের জন্য ১০ মিনিটের রাস্তায় যাতায়াত করতে সময় লেগে যাচ্ছে ৩০ মিনিটের মত। এরমধ্যে যদি অটোমেটিক সিগন্যাল বাতি ব্যবহার করা হয় তাহলে এই যানজট আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আমরা চিন্তা করলাম যানজট নিরসনে আপাতত ট্রাফিক সদস্যরা সরেজমিনেই ভূমিকা পালন করুক। রাজধানীতে যে সংখ্যক রাস্তা রয়েছে তার অধিক রয়েছে পরিবহন। তার মধ্যে চলছে মেট্রোরেলের কাজ। তবে মেট্রোরেলের কাজ শেষ হলে যানজট সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে বলেও আশা ব্যক্ত করেন এই কর্মকর্তা। 

অনেক মোড়েই কাজ করছে না সিগন্যাল রিমোট : রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সড়কে সিগন্যালবাতি স্থাপন করা হলেও তা ব্যবহার হচ্ছে না। অনেকাংশই এখন অকেজো হয়েই পড়ে আছে রাস্তার পাশে। ট্রাফিকের হাতে সিগন্যাল রিমোট থাকলেও তা অকেজো থাকায় ব্যবহার হচ্ছে না সিগন্যাল বাতি। এজন্য যেসকল স্থানে সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হয়েছে সেখানেও হাতের ইশারায় চলছে ট্রাফিক ব্যবস্থা।  
ট্রাফিক বিভাগ বলছে, কেইস প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর ৭০টি মোড়ে ‘ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি’ বসানো হয়। এর মধ্যে ট্রাফিক দক্ষিণ বিভাগে ৩৪, পূর্ব বিভাগে ১২, উত্তরে ১১ ও পশ্চিমে ১৩টি ট্রাফিক সিগন্যাল রয়েছে। ২০০৯ সালের ২২ নভেম্বর এসব বাতি চালু করা হলেও স্বল্প সময়ে তা অকেজো হয়ে পড়ে। এসকল বাতি অকেজো থাকায় ট্রাফিক পুলিশ হাত উঁচিয়েই গাড়ি নিয়ন্ত্রণের কাজ করে আসছে।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মোঃ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বেশ কিছু জায়গায় রিমোট কন্ট্রোল সিগন্যাল বাতি থাকলেও সেখানে রিমোট ভালোভাবে কাজ করছে না। মাঝে মধ্যে ঝড়-বৃষ্টি হলে রিমোট দিয়ে সিগন্যাল বাতি নিয়ন্ত্রণ হয় না। আবার অনেকাংশে রিমোট পুরোপুরিই নষ্ট থাকায় সিগন্যাল রিমোট ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, একটি আদর্শ সিটির জন্য যে সংখ্যক রাস্তা থাকা দরকার সে সংখ্যক রাস্তা আমাদের নেই। পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন সড়কে মেট্রোরেলের কাজ হচ্ছে। অনেক জায়গায় আন্ডার কনস্ট্রাকশন কাজ চলছে। এতে করেই অনেক সড়কে ডিজিটাল সিগন্যাল সিস্টেম ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ট্রাফিকে যে সংখ্যক পরিবহনের প্রেসার রয়েছে সেই হিসেবে অটোমেটেড যে লাইনটি (রিমোট কন্ট্রোল সিগন্যাল) রয়েছে তাতে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। 

বিআলো/ইসরাত