সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো কাজ করছে

সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো কাজ করছে

***এহসান খসরু, এমডি ও সিইও, পদ্মা ব্যাংক

করোনাকালীন স্থগিত কিস্তি ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে কতটা ঝুঁকিতে ব্যাংক খাত, ব্যাংকের জন্য আশার খবর কী, এসএমই ও ব্যক্তি খাত কেন ঋণ পায় না, সামনে অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ কী কী?

এসব বিষয় নিয়ে পদ্মা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এহসান খসরুর সঙ্গে দৈনিক বাংলাদেশের আলোর প্রতিবেদকের নানা বিষয়ে আলাপচারিতা হয়। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো : 

মো. ইব্রাহীম হোসেন: করোনাকালীন কেমন চলছে ব্যাংকিং ব্যবসা? বর্তমানে এ খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ কী? এমন প্রশ্নে এহসান খসরু বলেন, বৈশ্বিক মহামারি করোনা যা বিশ্বের অন্যান্য অর্থনীতির মতো বাংলাদেশকেও আঘাত হেনেছে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও এর প্রবৃদ্ধিকে ধীরগতির চক্রে আবদ্ধ করে ফেলেছে। যার ফলে আইএমএফের প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির হার ৫.২ শতাংশতে নামিয়ে আনা হয়েছে ২০২১ সালের জন্য। যা ২০০৮-২০০৯-এর বৈশ্বিক মন্দার চেয়ে বেশি সংকুচিত করবে বিশ্ব অর্থনীতিকে। জুন-২০২১-এ ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮.৪ শতাংশ যা জুন-২০২০-এ ১১.৩ শতাংশ ছিল। একদিকে সাধারণ গ্রাহকদের ঋণ প্রদান কমে গেছে। এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে তারল্য ২ লাখ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে জুনে। অর্থাৎ বাজার তারল্য ১২০.৬৬% বৃদ্ধি পেয়েছে কারণ এখন কোনো বড় বিনিয়োগ হচ্ছে না। অন্যদিকে সরকার প্রদত্ত পুনঃঅর্থায়নের তারল্য ব্যাংকিং খাতে প্রবেশ করছে। এ অবস্থায় কোনো প্রকৃত ও ভালো ব্যবসায়ী নতুন ব্যবসা শুরুর জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে আগ্রহী নয়। 

তাহলে আশার খবর কি? এমন প্রশ্নের জবাবে পদ্মা ব্যাংকের এমডি এন্ড সিইও এহসান খসরু বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর জন্য আশার খবর হচ্ছে সরকার কর্তৃক ঘোষিত সহায়তার তহবিল বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। সমাজের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে ব্যাংকগুলো সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ব্যবসাসমূহকে নগদ তহবিল সহযোগিতা প্রদান। সরকার প্রদত্ত ১২৩, ১১৭ কোটি টাকা প্রণোদনা তহবিল ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পে যথাযথ বণ্টন সুনিশ্চিত করা। সরকার ঘোষিত সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো কাজ করছে। যার ফলে জুন-২০২১-এর বাজারে ঋণের সুদের হার গড়পড়তায় ৭.৩৩% এবং আমানতের সুদ হার ৪.১৩ এসে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ব্যাংকসমূহ ২০% সুদে ক্রেডিট কার্ড ঋণ প্রদান করছে। এছাড়া প্রান্তিক ঋণগ্রহীতাকে নতুন ধরনের ঋণ সুবিধা প্রদান করছে। বিশেষ করে এসএমই খাতের ঋণের ক্ষেত্রে সরকার সুদ ভর্তুকি প্রদান করছে যা দ্বারা তারা করোনা মহামারিতে সৃষ্ট ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে। 

স্থগিত কিস্তি ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে কতটা ঝুঁকিতে ব্যাংক খাত? এ বিষয়ে এহসান খসরু বলেন, করোনাকালীন অতিমারির ধকল কাটিয়ে ওঠে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ গ্রহীতাদের পক্ষে স্থগিত কিস্তি ফেরত প্রদান যথেষ্ট কষ্টসাধ্য হবে। বিষয়টি অনুধাবন করে কেন্দ্র্রীয় ব্যাংক সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিতকৃত কিস্তি পরিশোধের সময় প্রদান করেছেন। যদিও এর ফলে ব্যাংকের তারল্য প্রবাহ কিছুটা বিঘ্নিত হবে। তবে সামগ্রিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। 

করোনাকালীন অর্থনীতি নিয়ে এহসান খসরু তার মূল্যায়ন সম্পর্কে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে অর্থমন্ত্রী যে বাজেট ঘোষণা করেছেন তা যেমন গণমুখী এবং এর বাস্তবায়নের জন্য তিনি ব্যাংকিং খাতকে অগ্রণী ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া সরকার ঘোষিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্যাকেজের আওতায় বরাদ্দকৃত ১২৩,১১৭ কোটি টাকা সঠিকভাবে বিতরণ করা। প্রথমত, বিলাসী ব্যয় সংকোচন করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকারি ব্যয়ের প্রাধান্য দেওয়া।

দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাকে ভর্তুকি সুদ হারে ঋণের ব্যবস্থা করা যাতে তারা এই মহামারিতে তাদের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। তৃতীয়ত প্রান্তিক পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সরকারের ঝড়পরধষ ঝধভবঃু ঘবঃ এর আওতায় আনা যাতে তাদের হঠাৎ করে কর্মহীন হয়ে পড়াকে সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়। চতুর্থত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থের যোগানের ভারসাম্য রক্ষা করে গড়হবু ঝঁঢ়ঢ়ষু বৃদ্ধি করা। 

গ্রাহকদের জন্য নতুন কী সেবা পদ্মা ব্যাংক আনছে এমন প্রশ্নের উত্তরে এহসান খসরু বলেন, এখন গ্রাহকরা ঘরে বসে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে হিসাব খুলতে পারছে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা ঘরে থেকে তাদের ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে। এছাড়া মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তাদের প্রয়োজনীয় লেনদেন করতে পারছে। গ্রাহকদের ঘরে বসে হিসাব খোলার সুবিধা প্রদান করেছি এবং ব-কণঈ প্ল্যাটফর্ম বাস্তবায়ন করেছি। এমনকি ঘরে বসেও ইউটিলিটি বিল পেমেন্ট করার সুবিধা বাস্তবায়ন করেছি আই ব্যাংকিং ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে এবং সরকার ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে পদ্মা ব্যাংক তার শাখাগুলো থেকে গ্রাহক সেবা অব্যাহত রেখেছে। 

পদ্মা ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি এখন কেমন? এমন প্রশ্নে এহসান খসরু বলেন, পদ্মা ব্যাংক ২০১৯ সালে যে অবস্থান থেকে যাত্রা শুরু করেছিল বিগত ২ বছরে তা অপেক্ষা সব আর্থিক সূচকে উন্নতি লাভ করেছে। বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে আর্থিক ভিত্তি উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সুদহার কমার পরও ব্যাংকের তারল্য বেড়েছে। কিভাবে এমন পরিস্থিতি হলো বলে আপনার মনে হয়? এমন প্রশ্নের উত্তরে এহসান খসরু বলেন, ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাওয়ার ফলে সাধারণ গ্রাহকদের ঋণ প্রদান কমে গেছে। এর ফলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে তারল্য ২ লাখ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে জুন, ২০২১। অর্থাৎ বাজার তারল্য ১২০.৬৬% বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ এখন কোনো বড় বিনিয়োগ হচ্ছে না। অন্যদিকে সরকার প্রদত্ত পুনঃঅর্থায়নের তারল্য ব্যাংকিং খাতে প্রবেশ করছে। এমতাবস্থায় কোনো প্রকৃত ও ভালো ব্যবসায়ী নতুন ব্যবসা শুরুর জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে আগ্রহী নয়। সাধারণ গ্রাহক পুঁজিবাজার কিংবা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে এবং ব্যাংকগুলো সব সময়ের মতো এখনও আস্থার জায়গা ধরে রেখেছে। তাছাড়া সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে ঋণ সুবিধা না থাকায় গ্রাহক ব্যাংকগুলোতেই আমানত রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। মূলত এসব কারণেই ব্যাংকে তারল্য বেড়েছে।

গ্রাহকসেবা বাড়াতে কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে এহসান খসরু বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বা ব্যাংকিং সেবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহজ প্রাপ্য করার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতকে আরো গণমুখী করা। এই খাতের অভিভাবক হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবার আওতায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সময়োপযোগী নির্দেশনা প্রদান করে আসছে তার যথাযথ বাস্তবায়ন করা। এজেন্ট ব্যাংকিং, স্কুল ব্যাংকিং, উপ-শাখা খোলা, মোবাইলে আর্থিক সেবা প্রদান ইত্যাদি ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে আমাদের ব্যাংক ঘবি ঘড়ৎসধষ খরভব-এর চাহিদা পূরণে সচেষ্ট। 

সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কার্যক্রম সম্পর্কে এহসান খসরু বলেন, পদ্মা ব্যাংক লিমিটেড করোনাপীড়িত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে অনুদান প্রদান করেছে। এছাড়া পদ্মা ব্যাংক তার কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম প্রদান করা। এছাড়া তাদের যাতায়াতের জন্য ব্যাংক পরিবহন ব্যবস্থা করেছে। গ্রাহকের স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক বার্তা প্রেরণসহ ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করা। এছাড়া শাখায় আগমন অত্যাবশ্যক হলে তাদের সঠিকভাবে স্যানিটাইজ করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিআলো/ইলিয়াস