হারিছ চৌধুরী মৃত্যু নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে ধূম্রজাল

হারিছ চৌধুরী মৃত্যু নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে ধূম্রজাল

নিজস্ব প্রতিবেদক:বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নেতা হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর খবর নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। এ ব্যাপারে বিএনপি ও তার পরিবারের কাছ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। হাওয়া ভবন-ঘনিষ্ঠ এই নেতা ক্ষমতাসীন সময়েও আলোচনায় ছিলেন। তার মৃত্যুরহস্য, কোথায় মারা গেছেন, কোথায় দাফন হয়েছে বা আদৌ তিনি মারা গেছেন কিনা সে বিষয়ে বিএনপির শীর্ষনেতারা কিছুই জানেন না বলে দাবি করছেন। দলের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো বিবৃতি দেয়া হয়নি।


অন্যদিকে হারিছ চৌধুরীর চাচাতো ভাই আশিক চৌধুরী তার ফেসবুকে একটি ছবি শেয়ার করার পর তার মৃত্যুর বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে তিনি মৃত্যুর খবর নিয়ে গণমাধ্যমে দুই রকম বক্তব্য দেয়ায় সৃষ্টি হয়েছে ধূম্রজাল।
বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর হঠাৎ করেই তিনি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যান। এরপর থেকে ছিলেন আড়ালে। এবার মৃত্যুর খবরের মধ্য দিয়ে ফের আলোচনায় উঠে এসেছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী।


ঢাকায় না লন্ডনে, কোথায় মারা গেলেন পলাতক বিএনপি নেতা আবুল হারিছ চৌধুরী? এ নিয়েই আলোচনা চলছে দেশের রাজনৈতিক মহলে। একই আলোচনা চলছে লন্ডন এবং সিলেটেও। হারিছ চৌধুরীর পারিবারিক সূত্র জানায়, তিন মাস আগে তার মৃত্যু হলেও এত দিন বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। তবে ওয়ারিশ সনদ ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বেহাত হওয়া ঠেকাতে মৃত্যুর খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।


হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে বিএনপি চুপ রয়েছে। সাধারণত দলের নেতাদের মৃত্যুতে শোক জানানো হলেও তার ঘটনায় এ ধরনের কোনো বিবৃতি বা বক্তব্য আসেনি। দলীয় সূত্রের দাবি, তার প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে বহু বছর ধরে নেতারা অন্ধকারে ছিলেন। যে কারণে মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ হয়নি।

আশিক চৌধুরী গণমাধ্যমে প্রথমে বলেছেন, তিনি লন্ডনে মারা গেছেন। এখন তিনি হয়ে বলছেন ‘হারিছ চৌধুরীর সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। উনি মারা গেছেন আমি শুনেছি।’


তার এই দুই রকম বক্তব্যের কারণে অনেকের মধ্যে হারিছ চৌধুরীর অবস্থা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।


হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর সংবাদ প্রসঙ্গে বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বিবার্তাকে বলেন, ১/১১’র পর বিভিন্ন মামলার কারণে উনি দেশের বাইরে চলে যান। পরে আর দেশে ফিরেছেন কিনা জানা নেই। পার্টির সাথে তার কোনো যোগাযোগ ছিলো না। স্মৃতির আড়ালে চলে যান তিনি। যার কারণে তিনি কিভাবে মারা গেছেন, কোথায় মারা গেছেন আর আদৌ মারা গেছেন কিনা জানি না।


তিনি বলেন, হারিছ সাহেব আমাদের ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। কিন্তু আমাদের দেশের রাজনৈতিক কালচার হলো যারা দূরে সরে যায়, রাজনীতি ও ব্যক্তি যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তিনি এমনিতেই হারিয়ে যান। উনি পার্টির সাথে ন্যূনতম যোগাযোগ রক্ষা করলে পার্টিও তার নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখতো। যারা পার্টির সাথে যোগাযোগ রাখে পদে না থাকলেও কেউ মারা গেলে পার্টি অফিসে তার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। দলের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হয়।


বিএনপি চেয়ারপারর্সনের উপদেষ্টা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বিএনপির আহবায়ক আব্দুস সালাম এ বিষয়ে বিবার্তাকে বলেন, তার মৃত্যু সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। তার সাথে আমাদের কোন নেতাকর্মীর সম্পর্ক নেই।


চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব ছিলেন হারিছ চৌধুরী। সেই সময়ের প্রভাবশালী নেতা বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরই দেশ ছেড়ে চলে যান। তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় গত ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর হারিছ চৌধুরীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। সে বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলায়ও তিনি আসামি ছিলেন। পলাতক অবস্থায় তিনি কখনো ভারতে, কখনো ইরানে, কখনোবা যুক্তরাজ্যে বলে খবর ছড়ায় বিভিন্ন সময়। তার অবস্থান সম্পর্কে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও অনেকটা অন্ধকারে।


সিলেটের কানাইঘাটের দিঘিরপাড় পূর্ব ইউনিয়নের দর্পণনগরে হারিছ চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি। পাঁচ ভাই, পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। হারিছ চৌধুরীর দুই ভাই মারা গেছেন। সবার ছোট ভাই কামাল চৌধুরী জন্মলগ্ন থেকেই অসুস্থ। তিনি গ্রামের বাড়িতে থাকেন। এক ভাই থাকেন ইরানে। তিনি পেশায় চিকিৎসক। হারিছ চৌধুরীর ছেলে ও মেয়ে যুক্তরাজ্যে থাকেন। মেয়ে ব্যারিস্টার, ছেলে বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন।

বিআলো/শিলি