৬৯ বছরেও হয়নি ভাষা সৈনিকদের তালিকা

৬৯ বছরেও হয়নি ভাষা সৈনিকদের তালিকা

মেহেদী হাসান: ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।’ যে ভাষার জন্য পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলার রাজপথ হয়েছিল রক্তে লাল। যেই রক্তের বিনিময়ে আজ আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, যারাই প্রথম ভাষার জন্য ভঙ্গ করেছিল ১৪৪ধারা। সেই মহান ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ৬৯ বছরেও হয়নি। প্রতি বছরই জাতি তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়ে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করলেও তাদের সকলের ইতিকথাও আমাদের আজো অজানা।

বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে পাকিস্তানের সরকার। নিজেদের মায়ের ভাষা ও বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় সেই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করলে ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে পাকিস্তানি পুলিশ। এতে নিহত হয় রফিক, বরকত, জব্বার, সালামসহ অনেকেই। এরপর ২২-২৩ ফেব্রুয়ারি বাঙালিরা পূর্ণ হরতাল পালন করে পুনরায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। ভাষা আন্দোলনের শহীদ স্মৃতিকে অমøান ২৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন।

এরপর গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের সরকার ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে ২১৪ নং অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উল্লিখিত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা প্রবর্তিত হয়। ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন জারি করে বাংলাদেশ সরকার। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে বাংলাকে আন্তর্জাতিক দিবস প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়, এতে ১৮৮টি দেশ সমর্থন জানালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরে ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করবে জাতিসংঘ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়।

বাংলাভাষা নিয়ে সকল প্রাপ্তি ও স্বীকৃতি পেলেও বাঙালি জাতির ব্যর্থতার দায় যেন এখন শুধুই মহান ভাষা সৈনিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা না করতে পারা। এ বিষয়ে ২০১০ সালে হাইকোর্ট থেকে নির্দেশনা দেওয়া থাকলেও ১১ বছরেও তা প্রকাশ্যে আলোর মুখ দেখেনি।

তৎকালীন সময়ে ২০১০ সালে বাংলা ভাষার আন্দোলনে সম্পৃক্তদের তালিকা তৈরির নির্দেশনা চেয়ে রিট করেছিলেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ। পরে ২০১১ সালের ২০ জানুয়ারি আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি এক বছর পরে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেওয়া ১৪ নারীসহ জীবিত ৬৮ জনকে ভাষাসৈনিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সরকারি গেজেট প্রকাশ করে। তালিকাটি গেজেট আকারে  প্রকাশ হয় ২০১২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। এতে ছিল কিছুটা বিতর্ক। পরে ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদ ও ভাষা সৈনিকদের রাষ্ট্রীয় সম্মান-সম্মানী ভাতা ও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণের নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট করা হয়। এরপর ৬ মাসের মধ্যে ভাষা শহীদ ও ভাষা সৈনিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। 

এ বিষয়ে ভাষা সৈনিক আহমদ রফিক বলেন, যারা সত্যিকার অর্থে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে তাদের বেশিরভাগই বেঁচে নেই। তালিকা করতে গেলে দেখা যাবে যে যার ইচ্ছামত নাম করছে। এই তালিকা করা উচিত ছিল ৫০ বছর আগে। আজ পর্যন্ত যে সরকারই এসেছে কেউই এটিকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি।


বিআলো/ইসরাত