উপকূলীয় অঞ্চল ও সুন্দরবনের নিরাপত্তায় নিরলস কোস্ট গার্ড
ডাকাত দমনে একের পর এক সফল অভিযান
মাসুম হাওলাদার,বাগেরহাট: প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড দেশের উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, বনজ ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানবিক সহায়তা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ সুন্দরবনের নিরাপত্তা ও ডাকাত দমনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাহিনীটি।
সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্বাহ এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশে সুন্দরবনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে এটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে সক্রিয় কয়েকটি ডাকাত চক্র বনজ সম্পদ লুণ্ঠন, জেলে ও বনজীবীদের অপহরণসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। এসব কার্যক্রম স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, বাস্তুসংস্থান ও পর্যটন শিল্পের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছিল। কোস্ট গার্ড দায়িত্বের অংশ হিসেবে সূচনালগ্ন থেকেই এসব ডাকাত চক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে।
তিনি আরও জানান, গত ২ জানুয়ারি (শুক্রবার) সুন্দরবনের গোলকানন রিসোর্ট থেকে কানুরখাল সংলগ্ন এলাকায় কাঠের বোটে ভ্রমণের সময় কুখ্যাত ডাকাত মাসুম বাহিনী ২ জন পর্যটকসহ রিসোর্ট মালিককে জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করে। বিষয়টি রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ কোস্ট গার্ডকে অবহিত করলে কোস্ট গার্ড তাৎক্ষণিকভাবে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। গোয়েন্দা তথ্য, ড্রোন নজরদারি ও ফিন্যান্সিয়াল ট্রেসিং ব্যবহার করে টানা ৪৮ ঘণ্টার অভিযানের মাধ্যমে জিম্মিকৃত পর্যটক ও রিসোর্ট মালিককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
এ অভিযানে ডাকাত চক্রের সদস্য কুদ্দুস হাওলাদার (৪৩), মো. সালাম বক্স (২৪), মেহেদী হাসান (১৯), আলম মাতব্বর (৩৮), অয়ন কুন্ডু (৩০), মো. ইফাজ ফকির (২৫), জয়নবী বিবি (৫৫) ও মোছা দৃধা (৫৫) কে সুন্দরবন, দাকোপ ও খুলনার বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক করে দাকোপ থানায় হস্তান্তর করা হয়।
আটককৃতদের দেওয়া তথ্য ও গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে গত ৭ জানুয়ারি (বুধবার) কোস্ট গার্ড খুলনার তেরখাদা থানাধীন ধানখালী এলাকা থেকে ডাকাত বাহিনীর প্রধান মাসুম মৃধা (২৩) কে আটক করে। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সুন্দরবনের গাজী ফিশারিজ সংলগ্ন এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে ৩টি দেশীয় ওয়ান শুটার পাইপগান, ৮ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ৪ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১টি চাইনিজ কুড়াল, ২টি দেশীয় কুড়াল, ১টি দা, ১টি স্টিল পাইপ ও মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এছাড়া জিম্মি পর্যটকদের ৫টি মোবাইল ফোন ও ১টি হাতঘড়িও উদ্ধার করা হয়। আটককৃত ডাকাত ও জব্দকৃত আলামতের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কোস্ট গার্ড জানায়, গত এক বছরে সুন্দরবনে ডাকাত ও জলদস্যুবিরোধী অভিযানে ৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২টি হাতবোমা, ৭৪টি দেশীয় অস্ত্র, অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম, ৪৪৮ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি জিম্মিদশা থেকে ৫২ জন নারী ও পুরুষকে উদ্ধার এবং ৪৯ জন সক্রিয় ডাকাতকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ধারাবাহিক অভিযানের ফলে আছাবুর বাহিনী, হান্নান বাহিনী, আনারুল বাহিনী, মঞ্জু বাহিনী ও রাঙ্গা বাহিনী সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া ছোট সুমন বাহিনী, ছোটন বাহিনী ও কাজল মুন্না বাহিনী বর্তমানে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। সক্রিয় করিম শরিফ বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী ও দয়াল বাহিনীকে দমনে কোস্ট গার্ড টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করেছে।
সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ডের জনবল বৃদ্ধি, কৌশলগত স্থানে নতুন স্টেশন স্থাপন, দ্রুতগামী স্পিডবোট সংযোজন ও আধুনিক ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম সুন্দরবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্টরা।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক বলেন, “বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা, বনজ সম্পদ সংরক্ষণ, জেলে ও বনজীবীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং পর্যটনবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে ভবিষ্যতেও নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত রাখবে।”
বিআলো/ইমরান



