গুরুবাক্যের পথে বাউল সাধনা: ডলি মণ্ডলের গানের যাত্রা
ছোটবেলা থেকে শুরু, থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ
এক শিল্পীর অবিচল সাধনার গল্প
হৃদয় খান: ডলি মণ্ডলের গানের যাত্রার শুরুটা বাবার হাত ধরেই। মজ্জুবি সাধক ফকির নিকবার শাহ তাঁর গুরুর বাণী অনুসরণ করেই কন্যাকে সংগীতের পাঠ দিতে শুরু করেন। গুরুবাদি মানুষের কাছে গুরুবাক্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ— “গুরুবাক্য বলবান, আর সব কিছু বাহ্যজ্ঞান।” সেই বাণীকে শিরোধার্য করেই সমাজের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে মেয়েকে সংগীতচর্চায় এগিয়ে নেন তিনি। এই সাধনাময় শিক্ষাই ডলি মণ্ডলের গানের ভিত গড়ে দেয়।
ডলির পারিবারিক পরিবেশ ছিল গভীরভাবে গান ও সাধনাকেন্দ্রিক। বাড়িতে নিয়মিত পালাগান ও লোকগানের আসর বসত। সেই আবহেই ছোটবেলা থেকেই গানের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে পালাগানের প্রাথমিক শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেন দাদাগুরু সাধন শাহ ফকিরের কাছে। এরপর মোতালেব মাস্টারের কাছে ক্লাসিক্যাল সংগীত ও হারমোনিয়ামে হাতেখড়ি হয় তার, যা তার সংগীতচর্চাকে আরও পরিপক্ব করে তোলে।
গানের প্রতি গভীর টান তাকে একসময় ঢাকায় নিয়ে আসে। রাজধানীতে এসে তিনি বাউল শফি মণ্ডলের সান্নিধ্যে আসেন এবং তাঁর হাত ধরেই লালনসংগীতে পথচলা শুরু করেন। লালনের মানবতাবাদী দর্শন, আত্মার অনুসন্ধান এবং বাউল সাধনাই ধীরে ধীরে তার সংগীতের মূল দর্শন হয়ে ওঠে।
নিজের গানের ভাবনা নিয়ে ডলি মণ্ডল বলেন, “বাউল গানেই নিজেকে সঁপে দিয়েছি। বাউল গানের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক সেই ছেলেবেলা থেকেই। ‘যা আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডেন তা আছে মানব ভাণ্ডে।’ পাঞ্জু সাঁইয়ের বাণীতে বলা হয়েছে— ‘বস্তুতে ঈশ্বর আছেন, কররে তার উল; যে খোঁজে মানুষে খোদা সেই তো বাউল।’ আমি সবসময় সেই সুন্দরের অনুসন্ধানের চেষ্টাই করে চলেছি।”
বর্তমানে ডলি মণ্ডল একজন পূর্ণাঙ্গ সংগীতশিল্পী। এ পর্যন্ত তার নিজের মৌলিক গানের সংখ্যা প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি। তিনি মূলত সাঁইজির বাণী কণ্ঠে ধারণ করেন। পাশাপাশি সাঁইজির গানের বাইরেও বেশ কিছু মৌলিক গান প্রকাশ করেছেন।
এবারের ঈদে তার নতুন কিছু মৌলিক গান প্রকাশ পেয়েছে। আইকে মিউজিক স্টেশন থেকে একটি নতুন মৌলিক গানসহ আরও কয়েকটি গান প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি নিয়মিত টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন স্টেজ শোতেও গান পরিবেশন করছেন এই শিল্পী।
নিজের সংগীতচর্চাকে আরও সংগঠিতভাবে এগিয়ে নিতে ডলি মণ্ডলের রয়েছে একটি গানের টিম— “ভাবের শহর”। এছাড়া তার নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল “Doly Mondol Official”, যেখানে নিয়মিত তার গান ও সংগীতভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশিত হচ্ছে।
২০১৯ সালে সংগীত রিয়েলিটি শো ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’-তে অংশ নিয়ে ডলি মণ্ডল সেরা দশে উত্তীর্ণ হন। এই অভিজ্ঞতাকে তিনি তার সংগীতজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালে একই অনুষ্ঠানে তিনি অ্যাসিস্ট্যান্ট মেন্টর হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। সর্বশেষ ২০২৫ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে আয়োজিত ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’-তে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি, যা তার দীর্ঘ সংগীতচর্চার একটি উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও তিনি ছড়িয়ে দিচ্ছেন সাঁইজির বাণী। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টে বাউল সংগীত পরিবেশন করেন ডলি মণ্ডল— যা তার সংগীতজীবনের এক উল্লেখযোগ্য অর্জন।
লোকগানের বর্তমান অবস্থান নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, “আমি একদম শেকড়টা আঁকড়ে আছি। লোকগানে আমি আমার শেকড়ের গন্ধ পাই। আমরা যতই আধুনিক কৃষ্টি-কালচারের সঙ্গে যুক্ত হই না কেন, দিনশেষে আমাদের মাটির টানটা থেকেই যায়। মা-মাটি, মাছে-ভাতে বাঙালির পরিচয় আমাদের সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ডলি মণ্ডল জানান, তিনি তার বাবা ফকির নিকবার শাহের আখড়াতেই একটি লাইব্রেরি, একটি সংগীত একাডেমি এবং সাধুদের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলতে চান। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আখড়া সংস্কৃতি, বাউল দর্শন ও লোকসংগীতের ধারাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টিকিয়ে রাখাই তার মূল লক্ষ্য।
এদিকে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে স্টেজ শো ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ব্যস্ত সময় কাটবে তার। ডলি মণ্ডলের বিশ্বাস— শেকড়ের গান ও আত্মার সাধনাকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে গেলে বাউল সংগীত চিরকালই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেবে।
বিআলো/তুরাগ



