তরমুজ আবাদে ব্যস্ত চরফ্যাশনের চরাঞ্চলের কৃষকরা, সচল হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি
জুলফিকার মাহমুদ নিয়াজচরফ্যাশন (ভোলা): আগাম জমি প্রস্তুত ও তরমুজ গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার চরাঞ্চলের কৃষকরা। ব্যাপক তরমুজ চাষের মাধ্যমে তারা শুধু নিজেদের জীবিকা নিশ্চিত করছেন না, বরং স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
চরফ্যাশন উপজেলার আওতাধীন তেতুলিয়া নদীবেষ্টিত ‘চর মুজিব’ এলাকায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার ৪৩৭ একর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। চরটির কিছু অংশে মানুষের বসতি থাকলেও প্রায় এক-চতুর্থাংশ জমি আবাদযোগ্য। নদীপথে খেয়া পারাপারই এখানকার মানুষের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম।
শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো চর ঘুরে দেখা গেছে, তরমুজ ক্ষেতজুড়ে শ্রমিকদের ব্যস্ততা। মূলত প্রতি বছর অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই চার মাস তরমুজ চাষের কাজে শ্রম বিনিময় করেন তারা। ফসল তোলার পর শ্রমিকরা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যান। ক্ষেতের পাশে ছনের দোচালা ঘর তুলে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন শ্রমিকরা। এমন অস্থায়ী বসতির সংখ্যা প্রায় শতাধিক। পাশাপাশি অস্থায়ী শৌচাগারও স্থাপন করা হয়েছে।
গত তিন বছর টানা ভালো ফলন হওয়ায় তরমুজ চাষিদের মধ্যে ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেছে। তেতুলিয়া নদী ও সংযুক্ত খালগুলোতে মিঠা পানির উৎস থাকায় প্রতি বছরই এ চরে তরমুজ আবাদ বাড়ছে বলে জানান শ্রমিক মো. হোসেন। তিনি বলেন, “জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে তরমুজ বিক্রি পর্যন্ত সব কাজে মাসিক চুক্তিতে শ্রমিকরা কাজ করি। আমি তিন মাসের জন্য মাসে ২২ হাজার টাকা চুক্তিতে কাজ করছি। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা চাষির, জমির পাশের টং ঘরেই থাকি।”
মুজিব নগর ইউনিয়নের তরমুজ চাষি মো. ইসমাইল জানান, তিনি ১৩ একর জমিতে থাই সুপার, থাই কিং ও আরলি ওয়ান জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। তিনি বলেন, “গত বছর ১৫ গন্ডা জমির তরমুজ ৮ লাখ টাকায় বিক্রি করেছি। আল্লাহ সহায় হলে এ বছর ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারবো। খরচ হবে প্রায় ২০ লাখ টাকা। আগাম চাষ হওয়ায় তরমুজ কেজি দরে বিক্রি করবো। আমার জমির তরমুজের ওজন ৬ থেকে ১০ কেজি।”
একই এলাকার কৃষক রাকিব হোসেন জানান, তিনি ৩ কানি (৪৮০ শতাংশ) জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। কানিপ্রতি ৩০ হাজার টাকা করে লগ্নি দিয়ে তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা। ১১ থেকে ১২ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রির আশা করছেন তিনি। পাশের ৬ কানি জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন কৃষক আবুল হাসেম। ব্যাংক ঋণ নিয়ে কানিপ্রতি ৩২ হাজার টাকা লগ্নি দিয়ে তার খরচ হয়েছে প্রায় ১১ লাখ টাকা।
চরের জমির মালিকরা জানান, এ বছর প্রতি কানি জমিতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা করে লগ্নি দেওয়া হয়েছে, যা গত বছর ছিল ২২ থেকে ২৬ হাজার টাকার মধ্যে। অনেক কৃষক আগেভাগেই লগ্নির টাকা পরিশোধ করেছেন।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চরফ্যাশনে ১০ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে এই আবাদ গত অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাজমুল হুদা বলেন, “চরফ্যাশনের চরাঞ্চলগুলো তরমুজ চাষের আতুড়ঘর। এখানকার মাটি অত্যন্ত উর্বর। উপজেলায় প্রায় ৬ হাজার তরমুজ চাষি রয়েছেন এবং প্রায় ৫০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতে জড়িত। বিশেষ করে মুজিব নগর ইউনিয়নে প্রায় ৫ হাজার একর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। তেতুলিয়া নদীতে মিঠা পানির প্রবাহ থাকায় কৃষকরা এ চাষে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন।”
বিআলো/ইমরান



