পাবজি ধ্বংস করছে নতুন প্রজন্ম

পাবজি ধ্বংস করছে নতুন প্রজন্ম

* কিশোর অন্ধত্ব বাড়ছে
* মাদকাসক্ত হচ্ছে কিশোররা
* তৈরি হচ্ছে কিশোর গ্যাং 
* মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে কিশোররা

সুমন সরদার: দীর্ঘদিন ধরে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ফ্রি ফায়ার ও পাবজি আসক্তিতে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। দিন দিন ইন্টারনেট ফাইটিং ফ্রি ফায়ার গেমসে ঝুঁকছে কোমলমতি শিক্ষার্থী ও শিশু- কিশোররা। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সারাদেশের  যুব সমাজ ফ্রি ফায়ার এবং পাবজি নামক গেমের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে।  তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ইন্টারনেটভিত্তিক খেলাগুলোকে তারা নেশায় পরিণত করছে তারা । সূত্র বলছে, ১০ বছর থেকে ২৫ বছরের উঠতি বয়সের যুবকদের গেইমিং আসক্তি দিন দিন বেড়েই চলছে। এসব বিদেশি গেম থেকে শিক্ষার্থী বা তরুণ প্রজন্মকে  ফিরিয়ে আনতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ প্রজন্মের শিশু-কিশোররা আগের মতো বাইরে খেলাধুলা করে না। গল্পের বই পড়ে না। এমনকি কারো সঙ্গে মন খুলে কথাবার্তাও তেমন বলে না। এ দৃশ্য ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সারাদিন দরজা বন্ধ করে কম্পিউটার ও স্মার্টফোন নিয়ে পড়ে থাকে। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই নিজের একটা জগত তৈরি করে নেয়। ফলে মা- বাবা আত্মীয়-স্বজন থেকে তাদের দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে এবং ভীষণ একাকীত্বের শিকার হয়ে পড়ছে তারা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঠানো সচিত্র রিপোর্টগুলো বলছে, প্রতিটি পাড়া মহল্লায় চায়ের দোকান,  পুকুরের পাড়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বারান্দা, খেলার মাঠের নির্জন জায়গায় সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ৮-১০ জন, কোথাও আবার ১৫- ২০ জন জড়ো হয়ে এসব গেম খেলছে।  এদিকে ফ্রি ফায়ার নামক গেমসকে মাদকদ্রব্যর নেশার চেয়ে ভয়ংকর বলে উল্লেখ করেছেন  শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা। উঠতি বয়সের কিশোর এমনকি শিশু সন্তানটিকে নিয়েও বিপাকে আছে অভিভাবকরা। 

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজের সচেতন মহল, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং প্রশাসনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন অভিভাবকরা। আমাদের শিশু-কিশোরদের প্রকৃত শৈশব-কৈশোর কেড়ে নিচ্ছে ভিডিও গেমস । বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, অল্পবয়সী অর্থাৎ ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যেই ইন্টারনেটে ডুবে থাকার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যুক্তরাজ্যে এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৩-১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশু সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করে ভিডিও গেমস, কম্পিউটার, ই-রিডার্স, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য স্ক্রিনভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পিছনে।

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, আট বছরের শিশুরাও ব্যবহার করছে ফেসবুক।  মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ভিত্তিক বিনোদনের ভয়াবহ পরিণতির চিত্র পাওয়া গেছে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর এক জরিপে। এতে দেখা যায়, ঢাকায় স্কুলগামী শিশুদের প্রায় ৭৭ ভাগ পর্নোগ্রাফি দেখে। প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি সমন্বয়ক আবদুল্লাহ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন ৮ম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ঢাকার ৫০০ (পাঁচশ’) স্কুলগামী শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, ছেলে শিশুরা সবসময় যৌন মনোভাবসম্পন্ন থাকে, যা শিশুর মানসিক বিকৃতির পাশাপাশি বাড়িয়ে দিচ্ছে মারাত্মক যৌন সহিংসতার ঝুঁকি। শিশু-কিশোরদের এ অবস্থা এখন বিশ্বব্যাপী মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

বর্তমানে জনপ্রিয় গেমসগুলো থেকে জানা যায়, প্রচণ্ড গতিসম্পন্ন গাড়ি নিয়ে রাস্তা, মাঠ-ঘাট পেরিয়ে ছুটে চলতে হয়। বিপজ্জনক ব্যাপার হলো, এই ছুটে চলার পথে অন্য প্রতিযোগীকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া, গাড়ির নিচে মানুষ পিষে ফেলা, পথচারীর কাছ থেকে মোটর সাইকেল বা গাড়ি কেড়ে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে ফুটপাতে উঠে পড়া, রাস্তার স্থাপনা ও বাড়িঘর ভাঙচুর করা, পুলিশ ধাওয়া করলে পুলিশের সঙ্গে যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা- এসব নাকি গেমের সবচে আকর্ষণীয় বিষয়। এ অনৈতিক কাজগুলো করে যে যত পয়েন্ট অর্জন করতে পারে সেই বিজয়ী হয় আর এক ধরনের গেম আছে, যার পুরোটা জুড়েই থাকে হিংস্রতা, মারামারি, যুদ্ধ, দখল এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। যত বেশি সহিংসতা তত বেশি পয়েন্ট। হিংসার উদ্দাম আনন্দ নিয়ে দুর্গম গিরিপর্বত, নদীনালা, জঙ্গল ও সমুদ্রের উপর দিয়ে শত্রু খুঁজে বেড়ানো। বাংকার খনন করে ওঁৎ পেতে থাকা। প্রতি মুহূর্তে শত্রুর আক্রমণের টেনশন। আরো দ্রুত চলতে হবে, যত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে সম্ভব প্রতিপক্ষকে শেষ করতে হবে কোমলমতি শিশু-কিশোররা নিজেরাও জানে না, কেন তারা এ মারণখেলা খেলছে। একের পর এক মানুষ খতম করছে। কখনো হাতুড়িপেটা করে মাথা থেঁতলে দিচ্ছে। মুহূর্তে রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে। কখনো গ্রেনেড ছুঁড়ে প্রতিপক্ষের পা জখম করছে। এরপর খোঁড়াতে খোঁড়াতে পলায়নপর মানুষটির উপর মারছে দ্বিতীয় গ্রেনেড। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে তার হাত-পা। তারপর রক্তমাখা দেহটা লুটিয়ে পড়ছে খেলোয়াড়ের পায়ের উপর। 

চোখের সামনে ভাসছে জীবন্ত যুদ্ধক্ষেত্র। কানে আসছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহারের বাস্তব আওয়াজ। এমনকি আহত শত্রুসেনার রক্তমুখের গরগর শব্দটাও শুনতে পাচ্ছে তারা। আর এতে বৃদ্ধিই পাচ্ছে তার আনন্দ, উৎসাহ এবং উত্তেজনা। কোনো কোনো খেলায় রাস্তায় পড়ে থাকা লাশের পকেট এবং ব্যাগ থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করতে পারলে পাওয়া যাচ্ছে বাড়তি পয়েন্ট। এমনকি রাস্তায় ড্রাগ বিক্রেতার কাছ থেকে ড্রাগও কেনা যাচ্ছে। এই গেমগুলোই এখন সবচে জনপ্রিয়। এসব ধ্বংসাত্মক গেমসের মধ্যে এ যাবতকালের পৃথিবীর সবচে জনপ্রিয় গেমটির নাম ‘পাবজি’। দক্ষিণ কোরিয়ার ভিডিও গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পিইউবিজি কর্পোরেশন ২০১৭-এর মার্চে এ অনলাইন মাল্টিপ্লেয়ার গেমটি বাজারে আনে। এর নির্মাতা ব্লু হোয়েল কোম্পানি আর পরিচালক আইরিশ ওয়েব ডিজাইনার ব্রান্ডন গ্রিন। রিলিজের মাত্র তিন দিনের মাথায় ‘ প্লেয়ার আননউনস ব্যাটেলগ্রাউন্ডস’ সংক্ষেপে ‘পাবজি’ নামক এ গেম প্রায় ১১ মিলিয়ন ডলার আয় করে। পাবজি গেম নির্মাণকারী সংস্থা প্রতিদিন ৬,৮৯০০০ ডলার আয় করে থাকে গেমারদের থেকে। প্রথম ৬ মাসেই তারা লাভ করেছে ৩৯০ মিলিয়ন ডলার।

রিপোর্ট অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে এখন প্রতি মাসে প্রায় ২২৭ মিলিয়ন মানুষ এ গেম খেলে। আর প্রতিদিন খেলে প্রায় ৮৭ মিলিয়ন লোক। বাংলাদেশেও প্রতিদিন এ গেম খেলছেন ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। সব মিলিয়ে মোবাইল কিংবা কম্পিউটারের পর্দায় কিশোর-তরুণেরা ‘পাবজি’তে এতটাই মগ্ন থাকছে যে, বাস্তব পৃথিবী ভুলে তারা এক বিপজ্জনক নেশায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। ভিডিও গেমসের এ নিধনযজ্ঞ অনেক বাস্তব অনুভব হচ্ছে তাদের কাছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এ গেম যারা খেলে, তারা চরম নেশায় আক্রান্ত হয়। হিংস্র মনোভাবাপন্ন একটা প্রবণতা পেয়ে বসে তাদের। মনোরোগ চিকিৎসকরা বলেন, মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ধ্বংসাত্মক মনোভাবকে টেনে বের করে আনে এ গেম। খেলার ছলে প্রশ্রয় দেয় রক্ত, মৃত্যু, খুন এবং জয়। ধ্বংসাত্মক এ গেমসগুলোর নিষিদ্ধ করার দাবি বিশেষজ্ঞদের। ইতোপূর্বে ভারতের গুজরাটসহ কয়েকটি রাজ্যে পাবজি গেম নিষিদ্ধ করা হয়। চীন দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে নেওয়া হয় নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিজ্ঞমহল। 

এদিকে ঢাকার ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের শিশু বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ৮-১৪ বছরের শিশুদের চোখের সমস্যা বাড়ছে। ডাক্তারের পরীক্ষা, রোগী ও অভিভাবকদের কথায় জানা গেছে, মোবাইল-কম্পিউটারে অতিরিক্ত গেমস খেলা এবং টিভি দেখার কারণে শিশুর চোখের সমস্যার সৃষ্টি হয়।

বেশ কয়েকজন অভিভাবক ও শিশুদের দেয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, তারা গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল ডিভাইসের পেছনে ব্যয় করে, যার বড় অংশই একাডেমিক বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনের বাইরে। বাংলাদেশ আই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের মধ্যে ৮০ শতাংশ শিশু মায়োপিয়া সমস্যায় ভুগছে। তাদের এখনই রোধ করা না গেলে ৫ বছরের নিচে শিশুদের দূরদৃষ্টিজনিত সমস্যা বেড়ে যাবে এবং তা ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে উন্নীত হবে। যা গোটা জাতির জন্য এক ভয়াবহ বার্তা বহন করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনেরা। 

বিআলো/ইসরাত