প্রতিষ্ঠানের নীরব শক্তি : পাবলিক রিলেসন বা জনসংযোগ বিভাগ
সংকটে ভরসা, সাফল্যে সহচর: জনসংযোগ বিভাগ
রবিউল আলম মুন্না: বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ও তথ্যনির্ভর সমাজব্যবস্থায় একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কেবল তার পণ্য বা সেবার মানের ওপর নির্ভর করে না; বরং প্রতিষ্ঠানটি জনসাধারণ, গণমাধ্যম ও অংশীজনদের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক বজায় রাখছে, তার ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল। আধুনিক সমাজব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও টেকসই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে তার জনসংযোগ কৌশল। এই কৌশলের বাস্তব রূপায়ণ ঘটে জনসংযোগ বিভাগের মাধ্যমে। তাই জনসংযোগ বিভাগ আজ আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি অপরিহার্য প্রয়োজন। এই সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় জনসংযোগ (পাবলিক রিলেশনস-পিআর) বিভাগ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ।
বর্তমান সময়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব অভূতপূর্ব। একটি ছোট ঘটনা মুহূর্তের মধ্যেই বড় আলোচনায় পরিণত হতে পারে। এমন বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠান ও জনগণের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত না হলে ভুল বোঝাবুঝি, গুজব ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়া অবশ্যম্ভাবী। জনসংযোগ বিভাগ সেই ঝুঁকি মোকাবিলা করে প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য সঠিক ভাষায় ও সঠিক সময়ে জনসমক্ষে তুলে ধরে।
জনসংযোগ বিভাগের গুরুত্ব :
জনসংযোগ বিভাগ একটি প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে। প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি, আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা গঠনে এই বিভাগ প্রধান ভূমিকা পালন করে। একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন ও সাফল্য নিশ্চিত করে।
যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে—যেমন অভিযোগ, ভুল তথ্য বা নেতিবাচক প্রচারণা—জনসংযোগ বিভাগ দ্রুত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে। সঠিক তথ্য প্রচার ও কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যমে তারা গুজব রোধ করে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা বজায় রাখতে সহায়তা করে। এছাড়া সরকার, বিনিয়োগকারী, গ্রাহক, কর্মচারী ও সাধারণ জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও জনসংযোগ বিভাগের গুরুত্ব অপরিসীম।
জনমত গঠনে জনসংযোগের ভূমিকা :
জনমত আজ একটি শক্তিশালী বাস্তবতা। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনসাধারণের আস্থা তৈরি হলে তার ব্যবসা, কার্যক্রম ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। জনসংযোগ বিভাগ গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও অংশীজনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এই আস্থার ভিত গড়ে তোলে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভুল তথ্য বা নেতিবাচক প্রচারণার বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর ও দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণ করে।
সংকট ব্যবস্থাপনায় জনসংযোগের দক্ষতা :
যেকোনো প্রতিষ্ঠান সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। দুর্ঘটনা, অভিযোগ, শ্রমিক অসন্তোষ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক—এই সব পরিস্থিতিতে জনসংযোগ বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংকটকালে নীরবতা বা দায় এড়িয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানকে আরও বড় সমস্যায় ফেলতে পারে। জনসংযোগ বিভাগ স্বচ্ছতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং জনআস্থা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
শুধু প্রচারণা নয়, দায়িত্বশীল যোগাযোগ :
অনেক সময় জনসংযোগকে শুধুই প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে আধুনিক জনসংযোগ বিভাগ বাস্তব কাজের প্রতিফলন জনসমক্ষে তুলে ধরে। সামাজিক দায়বদ্ধতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নৈতিক ব্যবসা ও মানবিক উদ্যোগ—এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের অবস্থান স্পষ্ট করা এখন জনসংযোগ বিভাগের অন্যতম দায়িত্ব।
অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের গুরুত্ব :
জনসংযোগ বিভাগের কাজ কেবল বাহ্যিক যোগাযোগে সীমাবদ্ধ নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই তার প্রকৃত প্রতিনিধি। তাদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ, স্বচ্ছতা ও মূল্যায়ন নিশ্চিত না হলে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি টেকসই হয় না। এই অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক দৃঢ় করাও জনসংযোগ বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ডিজিটাল যুগের নতুন বাস্তবতা :
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম জনসংযোগ কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইউটিউব ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে এখন সার্বক্ষণিক সচেতন থাকতে হয়। ভুল তথ্য বা অসতর্ক মন্তব্য মুহূর্তেই বড় সংকটে রূপ নিতে পারে। ফলে আধুনিক জনসংযোগ বিভাগকে আরও তথ্যনির্ভর, কৌশলী ও প্রযুক্তি-সচেতন হতে হচ্ছে।
জনসংযোগ বিভাগের কার্যাবলি :
জনসংযোগ বিভাগের কাজ বহুমুখী ও বিস্তৃত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কার্যাবলি হলো—
গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা :
সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইন গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা। প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, সংবাদ সম্মেলন ও সাক্ষাৎকারের আয়োজন করা।
প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি গঠন :
প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, অর্জন ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ড জনসমক্ষে উপস্থাপন করে একটি ইতিবাচক ইমেজ তৈরি করা।
সংকট ব্যবস্থাপনা :
যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সঠিক তথ্য প্রদান করে প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষা করা।
অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ :
প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন, নীতিমালা ও লক্ষ্য সম্পর্কে অবহিত করা এবং তাদের মধ্যে ঐক্য ও অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করা।
সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রম (সিএসআর) :
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের মানবিক দায়িত্ব তুলে ধরা।
ইভেন্ট ও জনসংযোগ কার্যক্রম :
সেমিনার, কর্মশালা, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা।
জনসংযোগ বিভাগ একটি প্রতিষ্ঠানের নীরব কিন্তু শক্তিশালী ভিত্তি। প্রতিষ্ঠান ও জনগণের মধ্যে বিশ্বাস, স্বচ্ছতা ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে এই বিভাগের বিকল্প নেই। যারা জনসংযোগকে গুরুত্ব দেয়, তারা শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের জন্যও নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে। তাই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে জনসংযোগ বিভাগকে কেবল একটি বিভাগ হিসেবে নয়, বরং একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করাই সময়ের দাবি। জনসংযোগ বিভাগ কোনো প্রতিষ্ঠানের কেবল একটি সহায়ক বিভাগ নয়; বরং এটি একটি কৌশলগত শক্তি। প্রতিষ্ঠান ও জনসাধারণের মধ্যে আস্থা, বিশ্বাস ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে জনসংযোগ বিভাগের ভূমিকা অপরিসীম। আধুনিক ও সফল প্রতিষ্ঠান গঠনে জনসংযোগ বিভাগের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
বিআলো/তুরাগ



