বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে সৌন্দর্যের স্বর্গ
পর্যটকদের নতুন আকর্ষণ ভোলার তারুয়া সমুদ্র সৈকত
জুলফিকার মাহমুদ নিয়াজ: দ্বীপ জেলা ভোলার সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে নিভৃতে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্যের জনপদ—তারুয়া সমুদ্র সৈকত। প্রায় ৪ বর্গ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকতজুড়ে বিস্তৃত সিলিকন কালো বালি, সবুজ অরণ্যভূমি ও ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের মুগ্ধ করছে। পর্যটনের প্রচলিত গন্তব্য কক্সবাজার বা কুয়াকাটার বাইরে ভিন্ন স্বাদের ভ্রমণপিপাসুদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তারুয়া।
পৌষ শেষে মাঘের শীত শুরু হয়েছে। উপকূলে মূলত মাঘ ও ফাল্গুন মাসে পর্যটকদের আগমন বাড়তে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাসের ১৮ তারিখ থেকে রমজান শুরু হবে—এ কারণে অনেকেই আগেভাগে তারুয়ায় আসতে শুরু করেছেন।
সৈকতের পাশ ঘেঁষে বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বনে দেখা মেলে সাইবেরিয়া থেকে আগত বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির। সবুজ বন, খাল-বিল আর নোনা হাওয়ার সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে এক অনন্য প্রতিবেশব্যবস্থা। একবার চোখে পড়লেই এই দ্বীপের সৌন্দর্য বারবার টেনে নেয় দর্শনার্থীদের।
ভোরের আলো থেকে সূর্যাস্তের রঙিন মিলনমেলা
ভোরবেলা তারুয়া সৈকতে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের নরম আলো ধীরে ধীরে বালির ওপর নেমে আসে। সেই দৃশ্য যেন প্রকৃতির নিঃশব্দ কবিতা। আর বিকেলের সূর্যাস্তে সমুদ্রের ঢেউ, আকাশের লাল-কমলা রঙ আর দিগন্তজোড়া আলোছায়ার খেলা পর্যটকদের বিমোহিত করে তোলে।
ম্যানগ্রোভ বন—দ্বীপের প্রাণ
তারুয়া দ্বীপের প্রাণ হলো এর বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ বন। এখানে রয়েছে হরিণ, মহিষ, ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল, শিয়াল, লাল কাঁকড়াসহ নানা জলজ প্রাণী ও পাখি। সবুজ পাতার ছায়া, নদীর সংযোগ আর নিরব পরিবেশ পর্যটকদের এনে দেয় মানসিক প্রশান্তি। প্রকৃতিপ্রেমীরা এখানে শুধু জীববৈচিত্র্য দেখেন না, বরং প্রকৃতির নীরবতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলার আনন্দ উপভোগ করেন।
বাড়ছে পর্যটকের আনাগোনা
বর্তমানে তারুয়া সমুদ্র সৈকত পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শুক্রবার ও শনিবার সৈকতজুড়ে পর্যটকের ভিড় লক্ষ করা যায়। সীমিত প্রচার আর অবকাঠামোগত উন্নয়ন না থাকলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানেই ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
যাতায়াতের পথ
ঢাকা থেকে সরাসরি বেতুয়া ও ঘোষেরহাটগামী জাহাজ সার্ভিস রয়েছে। ভোলা সদর থেকে দক্ষিণ আইচা বাজার পর্যন্ত বাস চলাচল করে। সেখান থেকে সিএনজি বা মোটরসাইকেলে চরকচ্ছপিয়া লঞ্চঘাটে যাওয়া যায়।
- বাস ভাড়া: ৫০ টাকা
- মোটরসাইকেল: ২০০ টাকা
- দক্ষিণ আইচা থেকে চরকচ্ছপিয়া অটো ভাড়া: ২০ টাকা
- চরকচ্ছপিয়া থেকে ঢালচর লঞ্চ ভাড়া: ১২০ টাকা
- স্পিডবোটে যাতায়াত: জনপ্রতি ২৫০ টাকা
ঢালচরে পর্যটকদের চলাচলের জন্য ভাড়ায় চালিত ৫০টির বেশি মোটরসাইকেল রয়েছে।
থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা
তারুয়া সৈকতে পর্যটকদের জন্য রয়েছে ক্যাম্পিং তাঁবু, কয়েকটি স্থানীয় আবাসিক হোটেল ও খাবারের হোটেল। অর্ডার অনুযায়ী খাবার পরিবেশন করা হয়, যা পর্যটকদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করে।
পর্যটকদের অভিমত
ঢাকা থেকে আসা এক পর্যটক বলেন,
“এখানকার দৃশ্য কুয়াকাটা বা কক্সবাজারের মতো না। তারুয়ার সৌন্দর্য একেবারেই আলাদা অনুভূতি দেয়। সবুজের সমারোহ, পাখির কোলাহল আর ম্যানগ্রোভ বনের পরিবেশ এক স্বপ্নিল অনুভূতি দেয়।”
ভোলা থেকে আসা আরেক পর্যটক জানান,
“এখানে এসে মনে হয়েছে অন্য এক জগতে চলে এসেছি। সূর্যাস্তের রঙ, ঢেউয়ের সুর আর জীববৈচিত্র্য একসাথে উপভোগ করা যায়।”
লোকাল সেভেন স্টার হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের মালিক আবুল বশার বলেন,
“পর্যটকদের নিরাপত্তা, থাকার ব্যবস্থা ও খাবারের মান উন্নত করাই আমাদের লক্ষ্য, যাতে তারা সন্তুষ্ট হয়ে আবারও ঘুরতে আসেন।”
উন্নয়নের অপেক্ষায় তারুয়া
ঢালচরের স্থানীয় বাসিন্দা ইব্রাহিম জানান, পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও এখনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। সৈকতের কাছে নদীতে একটি লঞ্চ টার্মিনাল, পর্যাপ্ত লঞ্চ সার্ভিস ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে তারুয়া সমুদ্র সৈকত দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এখনো তারুয়া সমুদ্র সৈকতে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। সরকার বা বেসরকারি সংস্থা যথাযথ পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিলে এই সৌন্দর্যের দ্বীপ পর্যটন মানচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
বিআলো/ইমরান



