বন্যাপীড়িত স্বাস্থ্য সমস্যা এবং আমাদের করণীয়

বন্যাপীড়িত স্বাস্থ্য সমস্যা এবং আমাদের করণীয়

 

ডা. প্রফেসর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) নাজমা বেগম নাজু

মহাপ্লাবনের  মত ধেয়ে আসা জলস্রোতে বিপর্যস্ত এখন দেশ। একই সাথে দক্ষিণ এবং উত্তরাঞ্চল প্লাবিত। চরম দুঃসময় এবং বিপর্যয়ের মুখোমুখি বিশাল জনগোষ্ঠী। ভয়াবহ এই বন্যার ক্ষতিকর প্রভাব মানুষ, প্রকৃতি এবং পশুপাখি সবার উপরেই পড়বে। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে বন্যা ও বন্যা পরবর্তী বিভিন্ন রকমের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়।

 

স্মরণকালের ভয়াবহ এই বন্যায় বন্যা পরবর্তী স্বাস্থ্য সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। আমাদের যথাযথ প্রস্তুতি এবং স্বাস্থ্যগত পরিকল্পনার মাধ্যমে এর প্রকোপ কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে পারি। এই রোগগুলো মূলত পানি এবং কীটপতঙ্গ বাহিত কারণেই হয়ে থাকে। এছাড়াও জমে থাকা বর্জ্য আবর্জনা, মলমূত্র, পয়:নিষ্কাশনজনিত সমস্যা, পশু পাখির মৃতদেহ, বিশুদ্ধ পানির অভাব ইত্যাদিও সমানভাবে দায়ী। বিভিন্ন প্রকার সংক্রামক রোগও অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এ সময়।

 

ডায়রিয়া, কলেরা, কৃমি সংক্রমণ, জ্বর, সর্দি, কাশি, হেপাটাইটিস, ত্বকের সংক্রমণ, চোখের অসুখ ইত্যাদি অতি দ্রæত ছড়িয়ে পড়বে পরবর্তী সময়ে। কখনো বা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। বন্যা পরবর্তী সময়ে কীট পতঙ্গ দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে। এর ফলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ে।

 

বন্যা পরবর্তী সময়ে অবশ্যই ফুটানো পানি পান করতে হবে। সম্ভব না হলে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বা ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে এক গ্যালন পানিতে এক কাপের চতুর্থাংশ ব্লিচিং পাউডার বা ফিটকিরি ভালভাবে মেশানোর পরে ত্রিশ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। এক লিটার পানিতে চার মিলিগ্রাম হ্যালোজেন ট্যাবলেট ত্রিশ মিনিট থেকে একঘন্টা রাখলেও পানি বিশুদ্ধ হয়ে যাবে। একমাত্র  ভাইরাস ব্যতীত অনেক জীবানুই ধ্বংস হয় এতে। নলকূপের পানিও দূষিত হয়ে যায় বন্যার সময়। একটানা এক ঘন্টা পানি চেপে বের করার পরে তা পান করার উপযোগী হয়। সম্ভব হলে পাঁচ লিটার পানিতে চারটি বিøচিং পাউডার মিশিয়ে ত্রিশ মিনিট পরে তা নলকূপের পানিতে ঢেলে দিতে হবে। তারপরে আধ ঘন্টা পানি চেপে বের করতে হবে।

 

বন্যার সময়  পশু পাখির মৃত দেহ পচে গলে তীব্র দুর্গন্ধ এবং রোগজীবানু ছড়াতে পারে।মৃতদেহ তিন মিটার পানির নিচে পুতে ফেলতে হবে। খালি হাতে মৃতদেহ ধরা যাবে না। পয়োনিষ্কাশনের জন্য পরিমিত ও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। অস্থায়ী টয়লেটের ব্যবস্থা করতে হবে।

 

বন্যার্তদের মাঝে স্বাস্থ্য সচেনতার বার্তা ছড়াতে হবে। তাদের মাঝে জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি জরুরি স্বাস্থ্য সেবাও নিশ্চিত করতে হবে। বন্যা দুর্গতদের মাঝে খাওয়ার স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, শুকনো খাবার, সাবান, ডেটল, শিশুখাদ্য, ব্যান্ডেজ, মশার কয়েল ইত্যাদি সরবরাহকল্পে সরকারি ও বেসরকারি উভয় সংস্থাগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে। বন্যাকালীন বিপর্যয়ে সাপ, ইঁদুর সহ বিভিন্ন প্রাণী তাদের আবাসস্থল হারিয়ে মানুষের শুকনো আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসে। এ সময় সাপে কাটার হারও বেড়ে যায়।

 

সবাইকে সচেতন করতে হবে এবং সাপে কাটার তাৎক্ষনিক করণীয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত শিক্ষা দিতে হবে। সাপে কাটা রোগিকে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে নিতে হবে এবং হাসপাতালগুলোতে এন্টিভেনম জরুরও ভিত্তিতে রাখতে হবে। কাটা ছেঁড়া এবং আঘাতপ্রাপ্ত রোগিদের টিটেনাসের ইনজেকশন দিতে হবে।। বন্যা পরবর্তী সময়ে মনুষ এবং গবাদি পশুদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে কৃমিনাশক ওষুধ সরবরাহ করতে হবে। গবাদি পশু আমাদের জাতীয় সম্পদ। তাদের যে কোন ক্ষয় ক্ষতির মাশুল দিতে হয় আমদেরই।

 

বন্যা ও বন্যা পরবর্তী সময়ে তাদের জন্য করণীয় যা কিছু সবই আমাদের করতে হবে। জরুরি আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে ভেটেরিনারি চিকিৎসকের সহায়তা নিতে হবে। তাদের পরামর্শে পশুপাখিদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। এতে  মানুয এবং পরিবেশ উভয়ই স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ থাকবে। বন্যা এবং দুর্যোগ, প্রাকৃতিক নিয়ম নীতির মতই যেন আমাদের ভাগ্যের সাথে মিশে আছে। এগুলোকে মাথায় রেখেই আমাদের সবধরনের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। তাই বন্যা ও বন্যা পরবর্তী সার্বিক  প্রস্ততি ও প্রতিরোধের বাস্তব রূপায়নের সূচনা হোক এখনই এ মুহূর্তেই।

লেখক : কথাশিল্পী, কলামিস্ট,  গবেষক,চিকিৎসক, গীতিকার ও গীটারিস্ট