বারভিডাকে বাঁচাতে সরকারের প্রণোদনা ও অনুদান জরুরি : আব্দুল হক

বারভিডাকে বাঁচাতে সরকারের প্রণোদনা ও অনুদান জরুরি : আব্দুল হক

*রিকন্ডিশন্ড ও নতুন গাড়ির শুল্ক কর যৌক্তিকীকরণের দাবি বারভিডার

মো. ইব্রাহীম হোসেন: দেশে একটি বাস্তবভিত্তিক, সম্মুখমুখী ও বাস্তবায়নযোগ্য অটোমোবাইল শিল্প নীতিমালার প্রয়োজন যাতে সত্যিকারের গাড়ি নির্মাণ শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি খাত স্থিতিশীল থাকে। এছাড়াও চাহিদা অনুযায়ী গাড়ির বাজার সম্প্রসারণের জন্য নতুন ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির শুল্ক কর বৈষম্য যৌক্তিকীকরণ করা জরুরি প্রয়োজন।

বুধবার (২৮ এপ্রিল) এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স এসোসিয়েশন (বারভিডা) নেতৃবৃন্দ এসব কথা তুলে ধরেছে। উন্নয়নশীল দেশে গ্রাজুয়েশনের এ তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে দেশের বিপুল মধ্যবিত্ত শ্রেণির চাহিদা অনুযায়ী বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে সরকারও কাক্সিক্ষত রাজস্ব পেতে পারে বলে বারভিডা জানিয়েছে। রাজধানীর বিজয়নগরে বারভিডা কার্যালয় থেকে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট আবদুল হক এসব বক্তব্য তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে বারভিডা প্রেসিডেন্ট বলেন যে, বারভিডা সরকারের ‘অটোমোবাইল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০২০’ প্রণয়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। বারভিডা সবসময়ই দেশে খাতভিত্তিক নতুন শিল্প স্থাপনের পক্ষে এবং ‘ মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের মোটরকার বা বাংলাদেশের ‘ন্যাশনাল কার’ বারভিডার জন্যও অনেক গর্বের বিষয় হবে বলে বারভিডা প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন।

তবে যে কোনো শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট খাতের বিদ্যমান শিল্পগুলোর অবস্থান, বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা এবং দেশের বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি বলে বারভিডা নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন। এক্ষেত্রে দীর্ঘ চার দশকের প্রতিষ্ঠিত রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি খাত যাতে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখার আহ্বান জানিয়েছে বারভিডা। এলক্ষ্যে বারভিডা একটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে দিয়ে নীতিমালাটির সম্ভাব্যতা ও কার্যকারিতা পরীক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।  বারভিডা নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন যে, কয়েক হাজার কোটি টাকা স্থানীয় বিনিয়োগ, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থান এবং বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব প্রদানের মাধ্যমে বারভিডা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বারভিডা আমদানিকৃত জাপানের পরিবেশবান্ধব এবং রি-সেল ভ্যালু সম্পন্ন গাড়িগুলো এদেশের ক্রেতাদেরও প্রথম পছন্দ। ক্রেতার পছন্দ উপেক্ষা করে দেশীয় গাড়ি নির্মাণের নামে দেশে যাতে কোনো স্ক্রু ড্রাইভিং শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ না নেওয়া হয় সে বিষয়ে বারভিডা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

বারভিডা প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, জাইকার মতো অনুযায়ী গাড়ির অভ্যন্তরীণ বাজার ১ লাখ ইউনিট হলে নতুন গাড়ির শিল্প প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। অথচ বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার ইউনিট গাড়ি বিক্রি হয়। সুতরাং স্থানীয় উৎপাদন এবং রপ্তানির পূর্বে দেশের গাড়ির বাজার সম্প্রসারণে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে নতুন এবং পুরোনো গাড়ির শুল্ক কর যৌক্তিকীকরণ অত্যন্ত জরুরি।

সংবাদ সম্মেলনে বারভিডা প্রেসিডেন্ট জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে গত ২ মার্চ ২০২১ অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট সভায় তারা রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি ও বিপণন খাতের প্রস্তাবসমূহ উপস্থাপন করেছেন। প্রস্তাবনায় তারা গাড়ি আমদানিতে অবচয় সুবিধা বৃদ্ধি, হাইব্রিড ও ফসিল ফুয়েল চালিত গাড়ির সম্পূরক শুল্ক পুনর্বিন্যাস এবং মাইক্রোবাসের সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়েছেন। অবচয় সুবিধা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বারভিডা জানায় যে, বর্তমানে ইয়োলো বুকে (ঘচ) উল্লিখিত সকল কোড মডেলের গড় মূল্য থেকে কোনো ডিলার কমিশন এবং জাপানের স্থানীয় কর (এঝঞ) বিয়োজন ছাড়া বছরভিত্তিক অবচয় প্রদান করা হচ্ছে, যা কাস্টমস আইনের পরিপন্থি। আমদানি নীতি অনুযায়ী পুরো ৫ বছরের অবচয় সুবিধা প্রাপ্তি একটি মৌলিক অধিকার বলে বারভিডা উল্লেখ করে। এনবিআরের সঙ্গে  বৈঠকে বারভিডা আগামী দিনের প্রযুক্তির বিষয়টি লক্ষ্য রেখে ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশের উপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছে। 

সংবাদ সম্মেলনে বারভিডা নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন, নতুন ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির শুল্ক-কর বৈষম্যের কারণে গত কয়েক বছর ধরেই রিকন্ডিশন্ড গাড়ির আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ও হোঁচট খেয়েছে। বারভিডার প্রেসিডেন্ট আবদুল হক আরো বলেন, দীর্ঘ চার দশকের প্রতিষ্ঠিত রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি খাত বারভিডাকে বাঁচাতে সরকারের প্রণোদনা ও অনুদান প্রদান করা খুব জরুরি। ১ বছরেরও সময় ধরে চলমান করোনা মহামারিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সরকারের দেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজে একটি ট্রেডিং সংগঠন হিসেবে বারভিডা কোনো ঋণ সুবিধা পায়নি। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার পরিবহনে বন্দর ভাড়ায় ছাড় দেওয়া হলেও বারভিডা বারবার আবেদন করেও করোনার সাধারণ ছুটিকালীন সময়ের জন্য পোর্ট চার্জ মওকুফ পায়নি। বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে তাই ২০২১-২০২২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বারভিডা তাদের প্রস্তাবসমূহের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। চলমান করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত রাখতে সরকার যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে তাতে যথাযথ রাজস্ব প্রদানের মাধ্যমে বারভিডা সরকারের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।

আব্দুল হক বলেন, গত ১০ বছর ধরে কিছু নেতিবাচক নীতিমালার কারণে রিকন্ডিশন্ড মোটরযান খাতে বিপর্যয় নেমে এসেছে। এর ফলে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি ও বিক্রি কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পুরোনো গাড়ি বিক্রি কমে যাওয়ায় এবং নতুন গাড়ির শুল্ক কর কম হওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। পুরোনো গাড়ির দাম তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় ক্রেতারা নিম্নমানের নতুন গাড়ি কিনে ক্ষতিগ্রস্ত। বর্তমান এই অবস্থা থেকে উত্তরণ হওয়া প্রয়োজন। তাহলে সরকারও লাভবান হবে, এই শিল্পও টিকে থাকবে। তিনি বলেন, শুল্ক ও কর কমানো হলে দেশে দামি গাড়ি বিক্রি বাড়বে। মধ্যম আয়ের মানুষও গাড়ি কিনতে পারবেন। এতে দেশে গাড়ির বাজার বড় হবে, সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। এদিকে লকডাউনে গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের জন্য সিমিত আকারে বিআরটিএ খোলা রাখার দাবি জানান  নেতৃবৃন্দরা।

সংবাদ সম্মেলনে এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহা. সাইফুল ইসলাম (সম্রাট) বক্তব্য রাখেন। বারভিডার ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহা.সাইফুল ইসলাম সম্রাট ও  মো. জসিম উদ্দিন মিন্টু, জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান এবং কার্যনির্বাহী সদস্য আবু হোসেন ভূইয়া (রানু) ও  মো. ইউনূছ আলী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। 

বিআলো/ইলিয়াস