বাংলাদেশের গণতন্ত্র, বৈধতা ও অর্থনৈতিক গতিপথের সন্ধিক্ষণ
শামসুদ্দিন আহমেদ হীরা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন কখনোই কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং নির্বাচন এই রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক বৈধতা, সামাজিক আস্থা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি মৌলিক সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই অর্থে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ; যেখানে অতীতের অভিজ্ঞতা, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের রাষ্ট্রকল্প একত্রে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এই নির্বাচনকে ঘিরে যে রাজনৈতিক উত্তাপ, সামাজিক উৎকণ্ঠা ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি সরকারের ভাগ্য নির্ধারণের প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পথচলার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্মূল্যায়নের একটি মুহূর্ত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কীভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো, নাগরিক অধিকার ও অর্থনৈতিক গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে এবং কেন এটি সাম্প্রতিক দশকগুলোর প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক বৈধতা :
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রতত্ত্বের আলোকে (উবসড়পৎধঃরপ খবমরঃরসধপু ঞযবড়ৎু) নির্বাচনই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধান বৈধতার উৎস। জনগণের অবাধ অংশগ্রহণ ও সম্মতির মাধ্যমেই শাসনব্যবস্থা নৈতিক ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি অর্জন করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একাধিক ভাঙন ও ধারাবাহিকতার প্রশ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়কালকে অনেক বিশ্লেষক তুলনামূলকভাবে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের যুগ হিসেবে চিহ্নিত করেন। সে সময় বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একটি বড় অংশ নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিয়েছিল। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচন ঘিরে ভিন্ন ধরনের বিতর্ক রয়েছে। যদিও সেটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল, তবুও সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক ভারসাম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল এমন
বিশ্লেষণ অগ্রাহ্য করা যায় না।
এর পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে এমন একটি ধারণা সমাজে দৃঢ় হয়েছে যে, ২০০১ সালের পর থেকে জনগণের একটি বড় অংশ তাদের পছন্দের প্রতিনিধিকে অবাধ, সমান ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নির্বাচিত করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই বিশ্বাস বা অবিশ্বাসই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক বৈধতা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ক্ষমতার কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য (ঝবঢ়ধৎধঃরড়হ ড়ভ চড়বিৎং ধহফ ওহংঃরঃঁঃরড়হধষ ইধষধহপব), একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সংসদ, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। শক্তিশালী ও প্রতিনিধিত্বশীল সংসদ নীতি-নির্ধারণে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এবং নির্বাহী ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রোধ করে। এর বিপরীতে, প্রশ্নবিদ্ধ বা অংশগ্রহণহীন নির্বাচন প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যকে দুর্বল করে দেয়। সংসদ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে, বিরোধী কণ্ঠস্বর সংকুচিত হয় এবং রাষ্ট্রযন্ত্রে একমুখী সিদ্ধান্তের প্রবণতা বাড়ে। এর দীর্ঘমেয়াদি ফল হিসেবে শাসনব্যবস্থায় সংকট, প্রতিষ্ঠানগত অবক্ষয় এবং নাগরিক আস্থাহীনতা তৈরি হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক হয়, তবে তা কেবল একটি সরকার গঠনের পথই প্রশস্ত করবে না; বরং দীর্ঘদিন ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনরুজ্জীবনের সুযোগ তৈরি করবে।
নাগরিক মানসিকতা, অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
নির্বাচনকে ঘিরে নাগরিকদের মানসিক প্রস্তুতি এবং সামাজিক বাস্তবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। ঈরারপ ঈড়সঢ়বঃবহপব ঞযবড়ৎু অনুযায়ী, ভোটার যদি নীতি, কর্মসূচি ও প্রতিনিধিত্বের অর্থ অনুধাবন করতে সক্ষম হন, তবেই নির্বাচন প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক রূপ পায়। অন্যথায় ভোট আবেগ, ভয় কিংবা দলীয় আনুগত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, শান্তিপূর্ণ প্রচার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাগরিক অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত। সহিংসতার আশঙ্কা বা ভয়ের সংস্কৃতি ভোটারদের নিরুৎসাহিত করে এবং নির্বাচনের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর দিনদুপুরে ইনকিলাব মঞ্চের স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমান হাদীকে হত্যার ঘটনা জনমনে গভীর আস্থার সংকট সৃষ্টি করেছে। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং নির্বাচনী নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সহনশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
নির্বাচন ও অর্থনীতি
একটি পারস্পরিক নির্ভরশীল সম্পর্ক। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক আস্থার একটি মৌলিক পূর্বশর্ত। একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়, বাজারে স্থিতিশীলতা আনে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুযোগ তৈরি করে। বিপরীতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পুঁজির প্রবাহ কমায়, মুদ্রাবাজার ও পণ্যবাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। নির্বাচনী সময়ে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, ভর্তুকি ও সামাজিক কর্মসূচির সম্প্রসারণ অর্থনীতিতে স্বল্পমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকলে বাজেট ঘাটতি ও মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতি একটি পারস্পরিক নির্ভরশীল চক্রে আবদ্ধ। সামাজিক আস্থা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ত্বরান্বিত করে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। এই চক্র সচল থাকলে রাষ্ট্র অগ্রগতির পথে এগোয়; আর তা ভেঙে পড়লে সংকট
বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। নির্বাচন এই চক্রের কেন্দ্রবিন্দু।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি নির্বাচন নয়; এটি দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট, প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে একটি কঠিন পরীক্ষার মুহূর্ত। ২০০১ সালের পর থেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে যে বিতর্ক, সংশয় ও হতাশা জমেছে, এই নির্বাচন তা কাটিয়ে ওঠার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি করেছে। একটি অংশগ্রহণমূলক, প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে, অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে এবং সমাজকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিতে পারে। এই কারণেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের কাছে নিছক একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।
লেখক: কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, জ্যেষ্ঠ বার্তা প্রযোজক, জিটিভি।
বিআলো/ইমরান



