বেড়েছে পারিবারিক হত্যাযজ্ঞ

বেড়েছে পারিবারিক হত্যাযজ্ঞ

মেহেদী হাসান: পারিবারিক কলহ যেন সমাজে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাংসারিক অশান্তিতে বাড়ছে পরকীয়া, ভাঙছে সংসার, ঘটছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সমাজ ব্যবস্থায় বিভিন্ন কারণে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে পরিবারের ওপর। স্বামী-স্ত্রীর কলহের জেরে প্রাণ যাচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদেরও, স্ত্রীর পরকীয়ার বলি হচ্ছে স্বামী, প্রেমিক নিয়েও চলে হত্যার যৌথ পরিকল্পনা। করোনাকালে পারিবারিক কলহে বেড়েই চলেছে হত্যাযজ্ঞ।

সাংসারিক অনটন, পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসহীনতা, অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক অস্থিরতা, বহিরাগত রাষ্ট্রের সংস্কৃতির আগ্রাসন, ভোগ বিলাসিতার আকাক্সক্ষা, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও মাদকাসক্তিসহ অনেক কারণেই পারিবারিক অশান্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এই অশান্তিই এক সময় রূপ নেয় হত্যাযজ্ঞের মহাপরিকল্পনা। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, দেশে অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডই ঘটছে পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে।

এছাড়াও দাম্পত্য জীবনে কলহের আরেক কারণ যৌনতাকে ঘিরে। পরকীয়া থেকে বিবাহ বিচ্ছেদের সবচেয়ে আদিম কারণ শারীরিক চাহিদা অপূর্ণ থাকা। বেশির ভাগ নারীরাই এই চাহিদায় তুষ্ট না হয়ে পর পুরুষে আসক্ত হয়ে জড়িয়ে পড়ে অপরাধে। আর এ সময় অনেকে আবার ঝুঁকে পড়েন মাদকে। চলতি বছরে পৃথক স্থানে স্ত্রীর পরিকল্পনায় ৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আতকে ওঠার মতো। কিলিং মিশন শেষে স্বাভাবিক জীবন যাপনও করতে থাকে এ সকল ললনারা।

রাজধানীর মহাখালীতে স্ত্রীর পরিকল্পনায় স্বামীকে হত্যা করে মাথাসহ শরীর টুকরা করার ঘটনা শিউরে ওঠার মতো। 
মহাখালীর আমতলীর মসজিদ গলি থেকে বস্তাবন্দি  হাত-পা-মস্তকবিহীন অবস্থায় অটোরিকশা চালকের মরদেহের উদ্ধার করে পুলিশ। গোয়েন্দা সংস্থা উদ্ধারকৃত মরদেহের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করে। নিহত ময়না মিয়া থাকতেন বনানীর কড়াইল এলাকায়।

অভাব অনটনের মধ্য দিয়েই প্রথম স্ত্রী ফাতেমা বেগম শিল্পী থাকাকালীন বিয়ে করেন দ্বিতীয় স্ত্রী নাসরিনকে। তিনি থাকেন কিশোরগঞ্জে। বানানীর টিঅ্যান্ডটি কলোনিতে একটি টিনশেড ঘর ভাড়া নিয়ে প্রথম স্ত্রী ফাতেমা থাকতেন। বনানীতে একটি বেসরকারি অফিসে রান্নার কাজ করতেন ফাতেমা। ময়না দ্বিতীয় বিয়ে করার পর থেকেই সংসারে অভাব অনটন লেগেই ছিল। ফাতেমার সংসারে ১০ ও ৬ বছর বয়সি দুটি সন্তানও রয়েছে।

দ্বিতীয় বিয়ের পর থেকেই বেশীর ভাগ সময় ময়না থাকতেন কিশোরগঞ্জে। সেখানে অটোরিকশা চালাতেন তিনি। ফাতেমাকে রেখে দ্বিতীয় স্ত্রী নাসরিনকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন ফাতেমা।  গত ২৩ মে থেকে ময়না মিয়া ঢাকায় ফাতেমার সঙ্গে ছিলেন। কয়েকদিন যাবৎ তাদের মধ্যে লাগাতার ঝগড়া বিবাদ চলছিল। হত্যার পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৮ মে ফাতেমা দুই পাতা ঘুমের ট্যাবলেট কিনে জুসের সঙ্গে মিশিয়ে রাতে ময়নাকে খাইয়ে অচেতন করে। এতে পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত ময়না মিয়া ঘুমে অচেতন থাকেন। ঘুম ভাঙলে ময়না ক্লান্ত শরীরে ফাতেমাকে মারতে এসে পড়ে যায় এবং পানির জন্য ছটফট করে। এতে ফাতেমা রেগে গিয়ে পুনরায় ময়নাকে সেই জুস পান করায়। ঘুমের ওষুধে ময়না অচেতন হলে  হাত বেঁধে ও মুখে কস্টেপ লাগিয়ে বুকের ওপর বসে চাকু দিয়ে গলাকাটে। ময়নার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ায় পর সারারাত লাশের পাশেই বসে থাকেন ফাতেমা। সকালে লাশ গুম করতে ফাতেমা দা দিয়ে ময়নার লাশ ছয় টুকরা করে এবং খণ্ডিত অংশ তিন ভাগ করে আলাদা আলাদা স্থানে ফেলে দিয়ে বাসায় এসে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে থাকেন। 
দক্ষিণখানে ১৯ মে স্ত্রীর পরিকল্পনায় স্বামীকে ছয় টুকরা করে হত্যা করা হয়।

২৫ মে একটি মসজিদের সেপটিক ট্যাংক থেকে স্বামী আজহারুলের ছয় টুকরা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্ত্রী আসমার পরিকল্পনায় ছুরি দিয়ে আজহারুলের শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পরকীয় প্রেমিক ইমাম আব্দুর রহমান। আব্দুর রহমানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরকীয় সম্পর্কে জড়ায় আসমা। আজাহারুলের শিশু সন্তানকে বাসায় এসে পড়াতেন আব্দুর রহমান। সেখান থেকেই গড়ে ওঠে আসমা-আব্দুর রহমান অনৈতিক সম্পর্ক। বিষয়টি আজাহার জেনে ফেলার পরই তাকে মেরে ফেলার ছক আঁকে আসমা। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে রাখে ওই ইমাম। এ বিষয়ে আজাহারুল ইমামের সঙ্গে দেখা করতে গেলেই তাকে নৃশংসভাবে ছয় টুকরা করে হত্যা করে ইমাম আব্দুর রহমান।
গাজীপুরে পরকীয় প্রেমিককে নিয়ে স্বামী সুমন মোল্লাকে হত্যার পর লাশ ছয় টুকরা করে পাষণ্ড স্ত্রী আরিফা বেগম। গত ২১ এপ্রিল গাজীপুরের কাশিমপুর থানার সারদাগঞ্জ হাজী মার্কেট এলাকার একটি সেপটিক ট্যাংকে হাত-পা ও মাথাবিহীন এক অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সিসিটিভির সাত দিনের ফুটেজে শনাক্ত হয় খুনি। আরিফার সঙ্গে দীর্ঘদিন যাবৎ তনয়ের পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি জানতে পেরে আরিফার স্বামী সুমন আরিফাকে মারধর করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আরিফা সুমনকে হত্যার পরিকল্পনা করে। সুমনের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হওয়ার পূর্বেই তনয় সরকারের সঙ্গে প্রেমের সক্ষতা ছিল আরিফার।

১৯ এপ্রিল রাতে দুধের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে সুমনকে অচেতন করে আরিফা। পরে তনয়কে ডেকে এনে মধ্যরাতে ১২টায় বালিশচাপা দিয়ে সুমনকে হত্যা করে ঘরে রেখে দেয় তারা। পরদিন করাত দিয়ে সুমনের মাথা, হাত ও পা বিচ্ছিন্ন করে এবং পেট কেটে ফেলে আলাদা স্থানে ফেলে দেয় তারা।

১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর টিকাটুলিতে সজীব নামে এক যুবকের পাঁচ টুকরা হত্যা করা হয়। জানা গেছে, স্বামী বয়স্ক হওয়াতে স্ত্রী শাহনাজ যুবক বয়সি এক প্রেমিকের পরকীয়ায় আসক্ত হন। দীর্ঘদিন ধরে ওই প্রেমিকের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক চালিয়ে আসছিলেন তারা। বিষয়টি ওই নারীর স্বামীকে জানিয়ে দেওয়ার কথা টাকা নিত সজীব। সজীবের টাকার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডাও হয়। এই বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি ওই নারী। এক পর্যায়ে ওই নারী সজীবকে নিজ বাসায় ডেকে এনে শারীরিক সম্পর্ক শেষে ছুরি দিয়ে সজীবের বুকে আঘাত করে হত্যা করা হয়। পরে সজিবের লাশ বাথরুমে নিয়ে হাত পা কেটে পাঁচ খণ্ড করে সেখানেই ফেলে রাখেন ওই নারী।

সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরেই হটাৎ করেই বেড়েছে পারিবারিক হত্যাযজ্ঞ। নানা কারণেই নৃশংসভাবে হত্যাযজ্ঞে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে নব্যখুনিরা। সাংসারিক অশান্তিতে অনেকেই ঝুঁকছেন মাদকে। এছাড়াও বিদেশি চ্যানেলে প্রচারিত চাকচিক্যময় অনুষ্ঠান দেখে যেন হিংসাত্মক হচ্ছে পরিবারের নারীরা। সুখি পরিবার গ্রাস করার ত্রাস সৃষ্টিতে এসব বিদেশি সিরিয়াল যেন সিরিয়াল কিলারের চেয়েও বেশি ভয়ংকর। এ সকল চ্যানেলে প্রচারিত অনুষ্ঠান যেন ধ্বংস করছে ঘরসংসার-সামাজিকতা এবং দেশের পারিবারিক ঐতিহ্য। টেলিভিশনগুলোতে বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ দেশীয় সংস্কৃতিকে নিয়ে যাচ্ছে তলানিতে।

বিআলো/ইলিয়াস