ভয়ংকর হয়ে উঠেছে নৌপথ

ভয়ংকর হয়ে উঠেছে নৌপথ

***  ২০ বছরে ১২টি বড় নৌ-দুর্ঘটনা
*** দেড় হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু
***  তদন্ত হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়না
*** শীতলক্ষ্যা নদীতে জাহাজের অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং

সুমন সরদার: মুখোমুখি সংঘর্ষ, যান্ত্রিক ত্রæটি ও চালকের অসাবধানতাসহ বিভিন্ন কারণে দেশে বেড়েছে লঞ্চ দুর্ঘটনা। একের পর এক এসব নৌ-দুর্ঘটনায় দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। যাতায়াতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আরামদায়ক ও নিরাপদ মনে করা নৌপথ অনিরাপদ ও ভয়ংকর হয়ে উঠছে দিন দিন। অব্যবস্থাপনায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াই দিনের বেলায় ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এসব বড় দুর্ঘটনার পরও সতর্ক হন না লঞ্চ মালিক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফায়ার সার্ভিস কিংবা নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করা হলেও অভিযোগ রয়েছে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার।

বেসরকারি সংস্থা কোস্ট বিডির গবেষণা অনুযায়ী, গত ২০ বছরে বাংলাদেশের নৌপথে বড় ১২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, এতে দেড় হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। সংস্থাটির যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ মুজিবুল হক মুনির গণমাধ্যমকে জানান, লঞ্চডুবির বড় ঘটনার অনেকগুলোই ঘটেছে মেঘনা নদীতে।

এদিকে গত ৫ এপ্রিল দুপুর সোয়া ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে মালবাহী কার্গোর ধাক্কায় ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে প্রতিবেদনটি লিখার আগ পর্যন্ত ২৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের পরিচয় শনাক্তের পর পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। 

বিআইডবিøউটিএ-এর ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক বাবু লাল বৈদ্য বাংলাদেশের আলোকে জানান, ঘাতক বাল্কহ্যাডটিকে এখনো আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে শীতলক্ষ্যা নদীতে বিভিন্ন জাহাজের অনিয়ন্ত্রিত পার্কিয়ের কারণে এরকম দুর্ঘটনা ঘটছে বলে জানান তিনি।   

চলাচলের অযোগ্য, লক্কড়-ঝক্কড়, তালি দেওয়া ও ত্রæটিপূর্ণ নকশায় নির্মাণ করা এসব লঞ্চ নিয়ন্ত্রণ করেন অদক্ষ চালকরা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের ৮০ ভাগ লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটেছে ত্রæটিপূর্ণ নকশার নৌযান ও অদক্ষ চালকের কারণে। গত ২০ বছরে ১২টি বড় নৌ-দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি। ২০০০ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঈদুল আযহার রাতে চাঁদপুরের মতলব উপজেলার ষাটনল এলাকায় মেঘনা নদীতে এমভি জলকপোত ও এমভি রাজহংসী নামের দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চের সংঘর্ষ হয়। এতে প্রাণ হারায় রাজহংসীর ১৬২ যাত্রী। ২০০২ সালের ৩ মে চাঁদপুরের ষাটনল সংলগ্ন মেঘনায় ডুবে যায় সালাহউদ্দিন-২ নামের যাত্রীবাহী লঞ্চ। ওই দুর্ঘটনায় ভোলা ও পটুয়াখালী জেলার ৩৬৩ যাত্রী মারা যান। ২০০৩ সালের ৮জুলাই ঢাকা থেকে লালমোহনগামী এমভি নাসরিন-১ চাঁদপুরের ডাকাতিয়া এলাকায় অতিরিক্ত যাত্রী ও মাল বোঝাইয়ের কারণে পানির তোড়ে তলা ফেটে যায়। এতে প্রায় ২ হাজারের বেশি যাত্রীসহ এটি ডুবে যায়। এ দুর্ঘটনায় ১২৮ পরিবারের প্রধানসহ সরকারিভাবে ৬৪১ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে লাশ উদ্ধার করা হয় প্রায় ৮০০।

২০০৪ সালের ২২ মে আনন্দবাজারে এমভি লাইটিং সান লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৮১ জন এবং ও এমভি দিগন্ত ডুবির ঘটনায় শতাধিক যাত্রীর মৃত্যু ঘটে। এছাড়া ভৈরবের মেঘনা নদীতে এমএল মজলিসপুর ডুবে ৯০ জনের মৃত্যু হয়। ২০০৬ সালে মেঘনা সেতুর কাছে এমএল শাহ পরাণ লঞ্চ দুর্ঘটনায় ১৯ জন মারা যায়।
২০১১ সালের ২৮ মার্চ চাঁদপুরের বড় স্টেশন মোলহেড এলাকায় মেঘনা নদীতে দুটি লঞ্চের ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে যায় এমভি কোকো-৩ নামের একটি যাত্রীবাহী লঞ্চ। ২০১৪ সালের ১৫ মে মুন্সীগঞ্জের কাছে মেঘনা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি মিরাজ-৪ ডুবে যাওয়ার পর অন্তত ২২ জন যাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুইশ’র বেশি যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি ঢাকা থেকে শরীয়তপুরের সুরেশ্বরের দিকে যাচ্ছিল।

২০১৪ সালের ৪ আগস্ট পদ্মায় স্মরণকালের ভয়াবহ নৌ-দুর্ঘটনায় আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় পিনাক-৬ নামের একটি লঞ্চ। উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে ২১ জনকে শিবচর পৌর কবরস্থানে অজ্ঞাতনামা হিসেবে দাফন করা হয়। ২০১৭ সালের ২২ এপ্রিল বরিশাল সদর উপজেলার কীর্তনখোলা নদীর বেলতলা খেয়াঘাট এলাকায় বালুবাহী একটি কার্গোর ধাক্কায় এমভি গ্রীন লাইন-২ লঞ্চের তলা ফেটে যায়। লঞ্চটি তাৎক্ষণিকভাবে তীরের ধারে নেওয়ায় দুই শতাধিক যাত্রী প্রাণে বেঁচে যায়। ২০১৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মা নদীর ওয়াপদা চেয়ারম্যান ঘাটের টার্মিনালে তীব্র স্রোতে ডুবে যায় তিনটি লঞ্চ। এতে একই পরিবারের তিনজন এবং লঞ্চ স্টাফ ও যাত্রীসহ ২২ জন লোক ছিল। ২০১৯ সালের ২২ জুন মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটে এমভি রিয়াদ নামের একটি লঞ্চের তলা ফেটে অর্ধেক পানিতে ডুবে যায়। লঞ্চের তলা ফেটে পানি উঠতে শুরু করলে অন্য ট্রলার গিয়ে লঞ্চযাত্রীদের উদ্ধার করে নিরাপদে নিয়ে যায়। ২০২০ সালের ২৯ জুন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ফরাশগঞ্জ ঘাট সংলগ্ন কুমিল্লা ডক এরিয়ায় ময়ূর-২ লঞ্চ পেছনের দিকে ধাক্কা দিলে মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যায়। এ লঞ্চ থেকে নারী ও শিশুসহ ৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে লঞ্চ মালিকরা বিআইডব্লিউটিএ থেকে লঞ্চ নির্মাণের জন্য নকশা পাস করিয়ে নিলেও ডকইয়ার্ডে গিয়ে নিজেদের মতো করে লঞ্চ তৈরি করেন। দেড়তলার অনুমোদন নিয়ে তৈরি করেন তিন থেকে সাড়ে তিনতলা লঞ্চ। ত্রুটিপূর্ণ এসব লঞ্চ সামান্য দুর্যোগে একটু কাত হলেই ডুবে যায়। গত ১৫ বছরে ত্রæটিপূর্ণ নকশায় নির্মাণ করা আর অদক্ষ চালকের কারণে শতাধিক লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ২ সহস্রাধিক মানুষ। যাত্রীবাহী নৌযানের মধ্যে বছরে ফিটনেস পরীক্ষা বা সার্ভে করা হয় মাত্র ৮৫০ থেকে ৯০০টির। সার্ভে না করার কারণে ফিটনেসবিহীন নৌযান চলাচল করায় প্রতিবছরই ঘটে নৌ-দুর্ঘটনা, মৃত্যু হয় হাজার মানুষের। ফলে সারাবছরই নৌপথে চলাচলকারী যাত্রীরা থাকেন চরম ঝুঁকির মধ্যে। প্রতিবছর ঈদ মৌসুমে বিভিন্ন ডকইয়ার্ডে আনফিট লঞ্চগুলোকে জোড়াতালি দিয়ে রঙ করার মাধ্যমে চাকচিক্যের কাজ শেষ করে নামিয়ে দেওয়া হয় নদীতে।  বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, ঘাতক এসটি থ্রি জাহাজটি আটকের চেষ্টা চলছে। শীতলক্ষ্যা নদীতে অপরিকল্পিত পার্কিং নিয়ে বারবার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও বিআইডবিøউটিএ, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এছাড়া গত দশবছর ধরে নির্মাণাধীন শীতলক্ষ্যা ব্রিজের কাজের কারণে এখানে প্রায় সময় নৌ-যানের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে। ব্রিজটির নির্মাণ এলাকায় কোনো সতর্ক সংকেত, পতাকা বা বাতি না থাকায় ভয়াবহ সংকট নিয়ে লঞ্চ চলছে বলে জানান তিনি। 

বিআলো/ইসরাত