মুনিয়ার মৃত্যুরহস্য নিয়ে ধুম্রজাল: সন্দেহের তির শারুনের দিকে

মুনিয়ার মৃত্যুরহস্য নিয়ে ধুম্রজাল: সন্দেহের তির শারুনের দিকে

*প্রেমের সম্পর্ক ছিল একাধিক
* ছিল পারিবারিক কোন্দল
* পাপিয়ার ওয়েস্টিনে ছিল অবাধ যাতায়াত 
* ভিন্নমত ভাই-বোনের
* প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে তৎপর পুলিশ

মেহেদী হাসান: রাজধানীর গুলশানে মুনিয়া নামের তরুণীর মৃত্যুরহস্য নিয়ে চলছে ধুম্রজাল। লাশ উদ্ধারের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশব্যাপী যেন তুমুল আলোচনার ঝর ওঠে। ঘটনার ৭দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত টক অব দ্য কান্ট্রি মুনিয়ার মৃত্যুকে ঘিরে। গুলশান-২এর ১২০ নম্বর রোডের ১৯ নম্বর প্লটের, বি/৩ ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করে। মুনিয়া আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে তার বোন নুসরাত জাহান তানিয়া বসুন্ধরার এমডি আনভীরকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা করে। মামলা নং ২৭। ঘটনার দিনই মুনিয়ার সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয় বোন নুসরাত জাহান তানিয়ার।

তবে তানিয়ার সঙ্গেও মুনিয়ার সম্পর্কটা ভালো ছিল না বলেও জানা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালে মুনিয়ার মা মারা যায়। তার বাবার মৃত্যু হয় ২০১৫ সালে। তবে ২০১৭ সাল থেকেই কুমিল্লায় পরিবার ছেড়ে ঢাকায় একাকী ছিল মুনিয়া। মিরপুর, বনানী ও গুলশানের ভাড়া বাসাতেই একাকী জীবন যাপন করতেন তিনি। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও গণমাধ্যমে মুনিয়াকে ঢাকার এক কলেজছাত্রী আখ্যা দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ মেলেনি। কোথাও পাওয়া যায়নি তার সঙ্গে কলেজপড়ুয়া কোনো শিক্ষার্থীর। মুনিয়ার মৃত্যুর পর কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও আসেনি কোনো বিবৃতি।

এদিকে মুনিয়ার মৃত্যুর পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন অঙ্গনে নতুন নতুন তথ্য ঘুরপাক খাচ্ছে। নিত্যনতুন তথ্যে তদন্তে মোড় ঘুরছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালে নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে কুমিল্লার ৬নং ওয়ার্ডের শুভপুর এলাকার দুই সন্তানের জনক নিলয় নামে এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক করে পালিয়ে যান মুনিয়া।

এ বিষয়ে নিলয়কে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মুনিয়ার বড় বোন তানিয়া বাদী হয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর বোনের সম্মতিতেই নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় আসেন মুনিয়া। সিনেমার এক পরিচালকের সঙ্গে মুনিয়ার পরিচয় হয়, সেখান থেকেই চিত্রজগতে প্রবেশ করে মুনিয়া। সম্পর্ক হয় চিত্রনায়ক বাপ্পিসহ অনেকের সঙ্গেই। বেশিভাগ সময়েই মুনিয়া বিভিন্ন পার্টিতে অংশ নিত শহরের অভিজাত হোটেলে। ওয়েস্টিন হোটেলেও ছিল মুনিয়ার নিয়মিত যাতায়াত। সেখান থেকে মুনিয়ার পরিচয় হয় লেডি মাফিয়া পাপিয়ার সঙ্গে।

সূত্র বলছে, খুব অল্প বয়সেই মুনিয়া তার সৌন্দর্যকে পুঁজি করে আভিজাত্যের বিলাসিতায় গা ভাসাতে শুরু করে। নায়ক বাপ্পির সঙ্গেও ছিল প্রেমের সম্পর্ক। এদিকে মুনিয়ার মৃত্যু নিয়ে এশিয়ান টেলিভিশনের সাবেক পরিচালক ও প্রিভিউ কমিটির প্রধান ফারিয়া পিয়াসার নাম এসেছে। এনটিভির একটি রিয়েলিটি শো’র অন্যতম প্রতিযোগী ছিলেন পিয়াসা। টিভি উপস্থাপনা ও মডেলিংয়ের সঙ্গেও জড়িত তিনি। বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলে চলাফেরা রয়েছে পিয়াসার। নানা কারণে-অকারণে অনেক শিল্পপতির সঙ্গেও পিয়াসার রয়েছে সুসম্পর্ক।

পিয়াসার এক বক্তবে জানা যায়, মুনিয়াকে আগে থেকেই চিনতো পিয়াসা। তার মতে মুনিয়া ছিল সাইকো (অগভীর আবেগময়ী) এবং লোভী। পিয়াসার বাড়ি চট্টগ্রামের আজগর দিঘী লেনে। প্রায় একযুগ আগে ঢাকায় আসেন তিনি। মডেলিং, চাকরি বা ব্যবসা না করলেও স্বামী পরিত্যক্তা পিয়াসা থাকেন গুলশানের দামি ফ্ল্যাটে। চলেন দামি গাড়িতে। প্রায় সময়েই অনেকেই তাকে দেখেছেন মদের আড্ডায় বা সিসা বারে। অনেকেই বলছেন প্রভাবশালীদের মনোরঞ্জনের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পিয়াসার সম্পৃক্ততা যেন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এদিকে একটি আলোচিত কথোপকথনের রেকর্ডের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে পিয়াসার নাম।

সেখানে ৫০ লাখ টাকার একটি বিষয়ও স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। এ সকল বিভিন্ন বিষয়কে নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ। মুনিয়ার বোন তানিয়ার দায়ের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গুলশান থানার অফিসার ইনচার্জ আবুল হাসানের কাছে মামলা তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বাংলাদেশের আলোকে বলেন, মামলার তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে তিনি তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে কিছুই বলতে পারবেন না। পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী জানান, সবগুলো বিষয় সামনে রেখেই তদন্ত চলছে। হুটহাট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।

মুনিয়ার বড় ভাই আশিকুর রহমান সবুজ বলেন, মুনিয়া সুইসাইড করার মতো মেয়ে না। তার মতে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তিনি এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন। 

অপরদিকে মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় ৩০২ ধারায় জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনকে (শারুন চৌধুরী) দায়ী করে আদালতে একটি হত্যামামলা দায়ের করেন মুনিয়ার ভাই সবুজ। বিচারক মহানগর হাকিম মোর্শেদ আল মামুন ভুঁইয়া মামলাটি আমলে নিয়ে পূর্বে গুলশান থানায় দায়ের করা আত্মহত্যায় প্ররোচণার মামলার তদন্ত চলায় আপাতত এটির কার্যকারিতা স্থগিত থাকবে বলে জানিয়েছেন।

মুনিয়ার মৃত্যুর পর হুইপপুত্র শারুন চৌধুরীর বেশকয়েকটি বার্তা আদান প্রদানের ছবি ঘুরপাক খাচ্ছে নেট দুনিয়ায়। এরপর পরিবারের সন্দেহের তীর আনভিরকে ছেড়ে চলে যায় শারুন চৌধুরীর ওপর। শারুনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হত্যামামলা সূত্রে জানা গেছে, আনভীর এবং শারুনের মধ্যে ছিল ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব। শারুন চৌধুরী মুনিয়ার মাধ্যমে আনভীরের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত তথ্য কৌশলে মুনিয়াকে ব্যবহার করে জেনে নেয়। এক পর্যায়ে মুনিয়া শারুনের অসৎ উদ্দেশ্যে ও অনৈতিক কাজে সহযোগিতা করতে অসম্মতি জ্ঞাপন করায় মুনিয়ার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিশোধ নিতে মানসিকভাবে ভীষণ চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। পুরো বিষয়টি পরিবারের সবাইকে মুনিয়া অবগত করেন।

সবুজ আরো উল্লেখ করেন, শারুন সুকৌশলে মুনিয়ার ফ্ল্যাটে ঢুকে অজ্ঞাতনামা আসামিদের সহযোগিতায় নির্মমভাবে হত্যা করে মৃতদেহ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে এবং কৌশলে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি শারুনের নিকটও থাকত এবং মূল দরজার তালা উভয় দিক দিয়ে লাগানো যায়। এদিকে মুনিয়ার মুঠোনের বেশকিছু ম্যাসেজ থেকে বের হচ্ছে বিস্ফোরক তথ্য। মুনিয়ার পড়াশুনার খরচ না দিয়ে উল্টো বোন ভগ্নীপতির কাছে মুনিয়া ছিল যেন সোনার ডিম পাড়া হাঁস। বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, প্রায় সময়েই বোনের কাছে টাকা পাঠাতো মুনিয়া। বোন ভগ্নীপতির টাকার জোগান দিতে না পারলেই তাদের মাঝে হতো মনোমালিন্য। 

অনেকদিন তাদের সঙ্গে চলছিল ঝগড়াঝাটি। এসকল বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বেশ অশান্তিতে ছিল বেপরোয়া মুনিয়া। মুনিয়ার বেশকয়েকটি ম্যাসেজ বলছে তিনি অনেক টাকা ওয়ালাদের টাকার জন্য ব্ল্যাকমেইল করতেন। সেই বার্তাগুলোতেও রয়েছে শারুন চৌধুরীর নাম। শারুনও মুনিয়াকে টাকা দিত। বিভিন্ন উপায়ে টাকা জোগাড় করে বোনকে পাঠাতে বেসামাল অবস্থায় থাকতে হতো মুনিয়াকে। মৃত মুনিয়ার বড় পিতৃব্য (চাচা) শাহাদাত হোসেন সেলিম দাবি করেন, মুনিয়ার বোন তানিয়া ও ভগ্নীপতি মিজানুর রহমানের অতি লোভের বলি হয়েছে মুনিয়া। স্বার্থ উদ্ধারে তার সঙ্গেও মিশতে দিত না মুনিয়াকে। তানিয়াও পরিবারের অমতে মিজানুরকে বিয়ে করে। এরপর তারা ধন-সম্পদ অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে মুনিয়াকে ব্যবহার করে।

মুনিয়ার ভাই সবুজ বলেন, তাদের পৈতৃক সম্পত্তির সমান ভাগ নিয়ে তাদের চাচা, চাচীসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করা হয়। এরপর থেকেই তানিয়া ও মুনিয়ার সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়। মামলাটি এখনো চলমান রয়েছে। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকেই মুনিয়া সম্পূর্ণভাবে নুসরাত ও তার স্বামীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এইচআরএইচএফ (মানবাধিকার সংস্থা) এর মহাসচিব আলমগীর বাংলাদেশের আলোকে বলেন, একাধিক ছকের বলি হতে পারে মুনিয়ার মৃত্যু। এটা আত্মহত্যাও হতে পারে, আবার পরিকল্পিত হত্যাও হতে পারে। তবে  মেডিকেল প্রতিবেদন ব্যতীত এ ঘটনাকে হত্যা বা আত্মহত্যা বলা যায় না। 

বিআলো/ইলিয়াস