মহামারীতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা খুবই জরুরি 

মহামারীতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা খুবই জরুরি 
লে.কর্ণেল ডা.নাসির উদ্দিন আহমেদ,(ক্লাসিফাইড মেডিসিন বিশেষজ্ঞ)

লে.কর্ণেল ডা.নাসির উদ্দিন আহমেদ,(ক্লাসিফাইড মেডিসিন বিশেষজ্ঞ) :আবারো মহামারীর তান্ডব বেড়ে গেছে। রাস্তাঘাটে বেরুলে অবশ্য ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়ার জো নেই যে আমরা মহামারীর কাছে ধরাশায়ী হয়ে যাচ্ছি। সেখানে মানুষ নির্বিকার। স্বাস্হ্যবিধি অনুসরণের কোন লক্ষণই নেই কার্যত। তবে প্রতিদিনের পরিসংখান বার বার করে আমাদেরকে বলে যাচ্ছে—হও হুশিয়ার। হাসপাতালের কোভিড ওয়ার্ডের বিছানা কিন্ত পরিপূর্ণ,স্বাস্থ্য বিভাগ তাই বলছে;যদিও নূতন করে ওয়ার্ড খোলা হচ্ছে। আইসিইউ গুলো ভরপুর। ঢাকার পাচ হাসপাতাল ঘুরে এ্যামুলেন্সেই মৃ্ত্যু এক রুগীর।মৃত্যু'র দরোজা খুলে যাচ্ছে হুটহাট করে। সরকার বাদ্য হয়েই আগামীকাল সোমবার থেকে ৭ দিনের লকডাউন দিয়েছে।গতকালের মৃত্যু সংখাও ৫৮ যা গত বছরের সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে।মোট কথা ভয়াবহ! 

আমরা ইতিমধ্যে জেনে গেছি কোভিড-১৯ এর উপসর্গ। জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, শ্বাস কষ্ট হচ্ছে মূল উপসর্গ। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য হলো—শারীরিক দূর্বলতা, নাকে ঘ্রাণ শক্তি উবে যাওয়া, সর্দি, অরুচী, শরীর ব্যথা, মাথা ব্যথা, পাতলা পায়খানা, বমি ইত্যাদি। জ্বরের সাথে অন্য যে কোন উপসর্গ থাকলেই এ সময়ে সর্বপ্রথম কোভিড-১৯ চিন্তা করতে হবে। অন্য রোগে যে উপরের উপসর্গ দেখা দিবে না তা কিন্ত নয়। তবে অন্য কোন রোগ প্রমাণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ধরে নিতে হবে এটি কোভিড-১৯। যেহেতু এই রোগের কোন নির্ধারিত কোন ওষুধ আবিষ্কার হয়নি সেজন্য উপসর্গের চিকিৎসা ঘরে বসেই শুরু করতে হবে। অতি দ্রুত করোনার পরীক্ষা করে নিতে হবে। অনেক হাসপাতালের আউটডোর কার্যক্রম সীমিত হয়ে যেতে পারে অচিরেই। বাইরে বেরুনোও কিন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকের চেম্বারও ক্ষেত্রবিশেষে সীমিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। সেজন্য ঘরে বসেই মৃদু রোগীরা চিকিৎসা নিতে পারেন। এক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত টেলি-মেডিসিনের সহায়তা নেয়ার পাশাপাশি পরিচিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।
ভ্যাক্সিন নেওয়ার পর অনেকে মনে করছেন তারা বুঝি আর এই ভাইরাসে আক্রান্ত হবেন না। এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। দুই ডোজ ভ্যাকসিন নেয়ার দু-সপ্তাহ পর হতে রোগ প্রতিরোধক এন্টিবডি তৈরী হবে। আর পৃথিবীর কোন ভ্যাক্সিন কিন্ত একশত ভাগ কার্যকরী নয়। সেজন্য এটা প্রয়োগের পরও স্বাস্হ্য বিধি অনুসরণের বিকল্প নেই। করোনা আক্রান্ত অনেকেই কিন্ত ভ্যাক্সিন নিয়েছেন। আমার নীরিক্ষায় এখন হাসপাতালে ভর্তি চল্লিশোর্ধ শতকরা ৬০ ভাগ রোগীই ভ্যাকসিন গ্রহণের পর কোভিডে আক্রান্ত। সুতরাং সাবধান থাকতেই হবে। 

এখন মহামারী কালীন কিছু ঔষুধ ঘরে বসেই শুরু করে দিতে তেমন সমস্যা নেই।

* তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইটের বেশী হলে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ সেবন করুন। ৫০০ মি. গ্রা. ট্যাবলেট দিনে ৩-৪ বার সেবন করা যেতে পারে। মাথা-ব্যথা, গা-ব্যথা হলেও ট্যাবলেটটি গ্রহন করুন।

* সর্দি-কাশির জন্য এন্টি-হিসটামিন জাতীয় ওষুধ সেবন করুন। এক্ষেত্রে ফেক্সোফেনাডিন, ডেস-লরাটাডিন, সিট্রিজিন ইত্যাদি যে কোন একটি ঔষুধ খেতে পারেন। দিনে একবার।

* ভিটামিন সি, জিঙ্ক এগুলো ভাইরাস নির্মূলের কোন ওষুধ নয়। তবে খেলে কোন ক্ষতিও নেই। বরং এন্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে রোগ প্রতিরোধে এ সবের কিয়ৎ ভূমিকা রয়েছে। দিনে দুবার করে খেতে পারেন।

* আইভারমেকটিন কোভিড-১৯ এ কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে। ওষুধটি সস্তা, সহজলভ্য। খুব বেশী পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া নেই। যাদের ওজোন ৬০ কেজির বেশী তারা ৬ মি গ্রা. এর তিনটি ট্যাবলেট একবার এক সাথে খেতে পারেন।

* ডক্সিসাইক্লিন ১০০ মি. গ্রাম তেমনি আরেকটি ওষুধ। এটিও আইভারমেকটিনের পাশাপাশি দিনে দুবার করে শুরু করতে পারেন। এ ওষুধের খুব মারাত্মক কোন পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া নেই। সাত দিনের জন্য ওষুধটি খাওয়া যেতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাসপাতালে এবং বাসায় বসে চিকিৎসকের পরামর্শে শেষের দুটো ওষুধ সেবনে কোভিড-১৯ এ ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। 

তবে যাদের বয়স ষাটোর্ধ্ব, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনী সংক্রান্ত জটিল রোগ সহ অন্যান্য দীর্ঘদিনের অসুখে ভুগছেন তারা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করবেন। ওষুধ সেবনের পরও উপসর্গ বেড়ে গেলে কিংবা শ্বাসকষ্ট সহ নূতন উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।

আক্রান্ত ব্যক্তি ঘরে বসে অনেক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহন করবেন—সেগুলোও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় করনীয়:
*সরকারি নির্দেশ মোতাবেক ৭ দিনের লকডাউন মেনে চলা।
* আইসোলেশনে থাকা।
* রোগীর জন্য আলাদা বাসন-কোসন গ্লাসের ব্যবস্থা করা।
* ওয়াশ রুম পারলে পৃথক রাখা
* বাসার অন্যান্য রা ক্ষেত্র বিশেষে মাস্ক ব্যবহার করবেন
* বার বার সাবান দিয়ে বিশ সেকেন্ড হাত ধোয়া
* গরম পানি পান করা
* ঠান্ডা পানি, পানীয়, আইসক্রিম পরিহার করা
* গরম পানির সাথে লবণ মিশিয়ে গড়গড়া করা
* আদা-লেবু-মধু চা পান করা
* বাষ্প নি:শ্বাস নেয়া
* পর্যাপ্ত পানি পান করা
* টাটকা টক জাতীয় ফল গ্রহণ করা
* পর্যাপ্ত ক্যালোরি ও আমিষ গ্রহণ করা
* বাসায় থার্মোমিটার দিয়ে নিয়মিত তাপমাত্রা মেপে দেখা
* পালস অক্সি-মিটার এ সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি যন্ত্র। বাসায় এ সময়ে এটি থাকলে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। কেউ কোভিড আক্রান্ত হলে মাঝে মাঝে অক্সিজেনের মাত্রা জানা জরুরী। মাত্রা ৯৩ এর নীচে নেমে গেলে চিকিৎসকের জরুরী পরামর্শ নেয়া দরকার।
* সতর্কতার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তের কিছু মৌলিক পরীক্ষা করে নেয়া। এগুলোর মাঝে CBC এবং D-dimer খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আসুন আমরা আরো সতর্ক হই—আতঙ্ক দূরে ছুঁড়ে ফেলি,মনবল না হারাই।
আসুন আমরা সবাই মহান স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদেরকে এই দূর্যোগ থেকে মুক্তি দান করেন। নিজ ধর্ম পালন করি। স্রষ্টা আমাদের সহায় হোন।

বি আলো / মুন্নী