লালমনিরহাটে হঠাৎ বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

লালমনিরহাটে হঠাৎ বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
লালমনিরহাটে হঠাৎ বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

মোঃ সজিব আলম, লালমনিরহাট: ভারতের গজলডোবার জলকপাট খুলে দেয়ায় বুধবার তিস্তার পানি আকস্মিক ভাবে হঠাৎ বেড়ে যায়। এতে লালমনিরহাটে ঘর-বাড়ি, ফসলি জমি, মৎসপ্রকল্প, রাস্তাঘাট সহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত বুধবার লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজে নদীর পানি বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে।

এদিকে পানির তীব্র চাপে তিস্তা ব্যারাজের ফ্লাড বাইপাস সড়কটিও ভেঙে যায় । অন্যদিকে শেখ হাসিনা সেতুর লালমনিরহাটের কাকিনা-মহিপুর সংযোগ সড়কের প্রায় ১৫০ মিটার অংশ ধ্বসে যায়। ফলে রংপুরের সাথে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জসহ অন্যান্য উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর আগেই তিস্তা ব্যারাজের ফ্লাড বাইপাস ভেঙে যাওয়ায় পাশ্ববর্তী জেলা নীলফামারীর সাথে লালমনিরহাটের যোগযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও হঠাৎ বন্যার কবলে পড়ে নির্ঘুম রাত কাটায় জেলার প্রায় ২০ হাজার পরিবার।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাত থেকে তিস্তার পানি বেড়ে বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। বুধবার সকাল ৯টায় ওই পয়েন্টে ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরে দুপুর ১২টায় তা আরও বেড়ে গিয়ে বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। পানি নিয়ন্ত্রনে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দেয়া হলেও প্রচন্ড চাপের কারণে ব্যারজের ফ্লাড বাইপাসটি ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, পানির তীব্র চাপ ও বন্যায় জেলার ৫টি উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী এলাকাগুলোর বেশ কিছু কাঁচা-পাকা সড়ক ভেঙে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নটি। ওই ইউনিয়ন পরিষদের চারদিকে সড়ক ভেঙে যাওয়ায় উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উপায় না পেয়ে অনেকেই নৌকায় চলাচল করছে। এদিকে পাশ্ববর্তী ইউনিয়ন সিংঙ্গীমারীর ভেস্যি বাঁধটিও ভেঙে গেছে।

গড্ডিমারী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক শ্যামল জানিয়েছেন, তিস্তা নদীর পানি তোড়ে বড়খাতা-হাতীবান্ধা বাইপাস সড়কটির বিভিন্ন স্থানে ভেঙে গেছে। এতে তার ইউনিয়নের কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফসলি জমি, মৎস খামারেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি। এদিকে তিস্তা ব্যারাজের উজানে পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রামে পানির চাপে রাস্তার পাশাপাশি চলাচলের জন্য ব্রীজ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছেন , দহগ্রাম ইউনিয়নের প্রায় ১০ গ্রামের ১২৬৩ পরিবারের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে আবাদি জমিতে লাগানো রোপা আমনের কাচা , পাকা ধানসহ অন্যান্য রবি ফসল। পাটগ্রাম উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) উত্তম কুমার নন্দী বলেন, বন্যা কবলিত এলাকায় ইতিমধ্যে ২০ মেট্রিক টন চাউল ও শুকনা খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়াও পানিবন্দী পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য সহায়তা রয়েছে।

অন্যদিকে কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, তুষভান্ডার ও কাকিনা ইউনিয়নে প্রায় ২ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সেখানে কাকিনা-মহিপুরের সংযোগ সড়কের প্রায় ১৫০ মিটার ধ্বসে গেছে। কাকিনার রুদ্ধেসশ্বর স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুইটি ভবন ধ্বসে গেছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে উঠতি ফসলেরও। এদিকে আদিতমারী উপজেলার দুটি বাধ ক্ষতি গ্রস্থ হয়েছে। মহিষখোচা থেকে স্পার বাঁধ যাওয়ার সড়কের ৩টি স্থানে ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। পানির তোড়ে প্রায় ৫০টি বাড়ি বিদ্ধস্ত হয়েছে। ফসলি জমিতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামীম আশরাফ জানিয়েছেন বন্যার কারণে জেলায় মোট ৩হাজার ৩৮০ হেক্টর জমি পানিতে ডুবে গেছে। এরমধ্যে ২ হাজার ৯৫৫ হেক্টর আমন ধান রয়েছে। পাশাপাশি ভুট্টা - ১৯২ হেক্টর, বাদাম ৫২ হেক্টর , আলু ৬৪ হেক্টর, মাশকলাই ৫ হেক্টর, মরিচ- ৫ হেক্টর, পেঁয়াজ ১৬ হেক্টর , সবজি ৯১ হেক্টর জমি পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

জেলা মৎস কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফারুকুল ইসলাম জানান, হঠাৎ বন্যায় প্রায় ১১৭ হেক্টর জমির ক্ষতিগ্রস্থ পুকুরের সংখ্যা ৯৩৬ টি। এরমধ্যে মাছ ২২৪ মেট্রিক টন, ৩৫ লক্ষ মাছের পোনা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ফলে মাছ ও পোনা মিলে আনুমানিক প্রায় ২ কোটি ৯৮ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম নবী জানান, হঠাৎ বন্যায় পুরো জেলায় মোট ৪৬ টি স্কুলে পানি উঠেছে। এরমধ্যে হাতীবান্ধা উপজেলায় ২২টি স্কুলে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। নদীতে ভেসে যাওয়া বানভাসিরা গবাদি পশু ও ঘরের কিছু আসবাবপত্র নিয়ে নদীর তীরবর্তী কয়েকটি স্কুল ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষনিকভাবে তাদের শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মোঃ আবু জাফর জানিয়েছেন, জেলার প্রায় ১৬ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এসব পরিবারের মাঝে ত্রাণ সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসনের ত্রান তহবিল থেকে ১৭৪ মে. টন চাল ও নগদ ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

বিআলো/শিলি