শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে আজ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে আজ

***স্বাস্থ্যবিধি শতভাগ নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ

*** শ্রেণিকক্ষের আসন বিন্যাসে থাকছে ভিন্নতা 

*** ক্লাসে মাস্ক পববে সব শিক্ষক-শিক্ষার্থী 

*** কোনো ধরনের অ্যাসেমব্লি হবে না

*** বন্যা হলেও খুলছে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান 

*** সর্ব্বোচ্চ ক্লাস হবে ১২০ মিনিট

উৎপল দাশগুপ্ত: সময় সকাল সাড়ে দশটা। রাজধানীর নারিন্দা বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা কানিজ ফাতেমা স্কুল খোলার প্রস্তুতি নিয়ে ভার্চুয়াল সভা করছেন সূত্রাপুর থানা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে। একই সঙ্গে শেষমূহূর্তের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও তদারকি করছেন সমান গুরুত্বের সঙ্গে। ইতিমধ্যে স্কুলমাঠ ও তিনতলা ভবন পরিষ্কারের কাজ শেষ হয়েছে। এর আগে সকালে সিটি কর্পোরেশনের তরফ থেকে স্কুলে মশার ওষুধ ছিটানো হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে তখনো ছিল ওষুধের গন্ধ। শ্রেণিকক্ষের প্রতিটি বেঞ্চে যাতে একজন করে শিক্ষার্থী বসে তেমন নির্দেশনা দিয়ে সাজানো হচ্ছে বেঞ্চগুলোকে।  

অন্যদিকে বেলা বারোটায় রাজধানীর টিকাটুলি কামরুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, প্রধান শিক্ষক ওবায়েদা বানু শেষমূহূর্তের প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক করছেন শিক্ষকদের সঙ্গে। স্কুল খোলার প্রস্তুতি নিতে গত কয়েকদিন ধরেই টানা এমন সভা চলছে বলে জানান প্রধান শিক্ষক। 

স্কুল ঘুরে দেখা গেছে, গেট থেকে ভিতরে স্কুলের ভবন পর্যন্ত তিনফুট দূরত্ব নির্ধারণ করে গোল গোল চিহ্ন দেওয়া হয়েছে। যাতে শিক্ষার্থীরা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারে। স্কুলমাঠের কাছেই হাত ধোয়ার জন্য লাগানো হয়েছে একাধিক বেসিন। স্কুল গেট পার হয়ে শিক্ষকদের বসার কক্ষের সামনের বারান্দায় লাগানো হয়েছে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সচেতনতামূলক পোস্টার। এই স্কুলে শিক্ষার্থীরা বসবে ‘জেড’ আকৃতিতে। পুরো স্কুলপ্রাঙ্গণ ঝকঝকে তকতকে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ স্কুলের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ইতিমধ্যে গঠন করা হয়েছে একাধিক কমিটি। কমিটির সদস্যরা ব্যস্ত প্রস্তুতির শেষটুকু নিয়ে।

নারিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কিংবা কামরুন্নেসা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের মতো প্রায় একই দৃশ্য দেখা গেছে, রাজধানীর নিউমার্কেটের ঢাকা কলেজ, লক্ষ্মীবাজারের শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি মহাবিদ্যালয়, মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যাণ্ড কলেজ, সদরঘাটের কলেজিয়েট স্কুল, নারিন্দা এ. কে হামিদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ওয়ারী হাই স্কুল ও শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়। 

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে দীর্ঘ দেড় বছর বন্ধ থাকার পর আজ রবিবার থেকে খুলছে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আজ থেকে শিক্ষার্থীরা শারীরিকভাবে শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা শুরু করবে। এটা যেন নতুন শুরুর প্রস্তুতি। 

শিক্ষার্থীদের বরণ করতে উন্মুখ রাজধানীর এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গতকাল শনিবার শেষ মূহূর্তের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ততা ছিল লক্ষ্যণীয়। রাজধানীর মতো একই চিত্র দেখা গেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রস্তুতি নিয়ে আমাদের প্রতিনিধিদের খবরেও। 

এদিকে বন্যার জন্য দেশের বিভিন্ন  অঞ্চলে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণি কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে অনিশ্চিয়তা দেখা দেয়। ইতিমধ্যে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শেণি কার্যক্রম চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখার পরিচালক প্রফেসর মো. বেলাল হোসাইন।

এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-অভিভাবকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ-উদ্দীপনা দেখা গেলেও স্বাস্থ্যবিধি শতভাগ নিশ্চিত করা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে সবার মাঝেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনা অনুযায়ী শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে মাউশির মাধ্যমিক শাখার পরিচালক বেলাল হোসাইন বলেন, এই ঝুঁকি আছেই। তবে সবাই যদি সচেতনভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন তাহলে খুব একটা সমস্যা হবে না।

সূত্রাপুর থানার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মঈনুল হোসেন বলেন, এই ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া কোনো উপায়ও নেই। এর একমাত্র সমাধান হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি শতভাগ মেনে চলা।

নরসিংদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোশতাক আহমেদ ভুঁইয়া বলেন, ঝুঁকি থাকলেও সবাই সচেতনভাবে মেনে চললে কোনো সমস্যা হবে না। 

টিকাটুলি কামরুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওবায়েদা বানু বলেন, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে শতভাগ প্রস্তুতি রয়েছে আমাদের। সবাই সচেতন থাকলে কোনো সমস্যা হবে না। 

ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যাণ্ড কলেজের চেয়ারম্যান লায়ন এম. কে বাশার বলেন, ঝুঁকি থাকলেও করোনা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে তাতে খুব একটা সমস্যা হবে না।

রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শেণির শিক্ষার্থী মাশরুবা মশিহুর জাহিমের বাবা অ্যাডভোকেট মশিহুর রহমান জুয়েল বলেন, ঝুঁকি থাকলেও সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এছাড়া অনেকেই টিকা নিয়ে নিয়েছেন। তাই ভয়ের কিছু নেই।

এদিকে শিক্ষপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রস্তুতি নিয়ে আমাদের নরসিংদী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে কলেজ খুলতে ব্যাপক ব্যবস্থা নিয়েছে নরসিংদী সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষ। কলেজ খোলার প্রথম দিন আজ রবিবার ৭০ জন স্বেচ্ছাসেবী ও ৪২ জন শিক্ষকের ভিজিল্যান্স টিম স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করবে। ইতিমধ্যে কলেজের ৪টি ভবন ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ধোয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।  

আমাদের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের স্কুলের প্রবেশমুখে টাঙানো হয়েছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনাসংবলিত ব্যানার। শ্রেণিকক্ষের সামনে রাখা হয়েছে মাস্ক ও সতর্কতামূলক নির্দেশনা। হাত ধোয়ার জন্য পানির ট্যাংক ও কল স্থাপনের কাজ চলছে। 

দিনাজপুর প্রতিনিধি মনসুর রহমান জানিয়েছেন, দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের অধীনে ৮ জেলায় ৩ হাজার স্কুল ও প্রায় সাড়ে ৬০০ কলেজ ইতিমধ্যে খোলার জন্য প্রস্তুত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলায় ভীষণ খুশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

কালিয়াকৈরের (গাজীপুর) প্রতিনিধি স্বপন সরকার জানিযেছেন, এই জেলায় অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলে বন্যার পানি থাকায় ১৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা অনিশ্চিত। 

পটুয়াখালী প্রতিনিধি এম নিয়াজ মোর্শেদ জানিয়েছেন, এই জেলার মোট ৬১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠান সার্বক্ষণিক পরিদর্শনের আওতায় থাকবে বলে জানা গেছে। 

রংপুর প্রতিনিধি হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন, এই জেলার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে খোলার জন্য প্রস্তুত হলেও বন্যাজনিত কারণে ১৯১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। দীর্ঘদিন পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।

বিআলো/ইলিয়াস