সিনেমার শক্তি গল্প ও চরিত্রে: নির্মাতা জাহেদী
শৈশবের প্রেরণা থেকে চলচ্চিত্রের পথে
হৃদয় খান: ছবির আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে তার গল্প আর চরিত্রে—এটাই বিশ্বাস করেন নির্মাতা আলী জুলফিকার জাহেদী। বড় সেট, ঝকঝকে প্রযুক্তি বা চমকপ্রদ দৃশ্যের চেয়ে দর্শকের মনে দাগ কাটে জীবন্ত চরিত্র আর হৃদয়স্পর্শী গল্প। তার জন্য সিনেমা মানেই কেবল বিনোদন নয়, বরং মানবিক সংযোগের এক মাধ্যম।
করপোরেট সেক্টরে কর্মজীবন শুরু হলেও আলী জুলফিকার জাহেদীর আগ্রহ সবসময়ই সৃজনশীলতার জগতে ছিল। কবিতা, গান ও গল্প লেখার মাধ্যমে তার সৃজনশীল যাত্রা ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রে পৌঁছায়। শৈশব থেকেই সিনেমার প্রতি আকর্ষণ এবং পারিবারিক লেখালেখির পরিবেশ তাকে এই পথে অনুপ্রাণিত করেছে।
গল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জাহেদী মূলত আবেগ, সামাজিক বার্তা এবং নির্মাতার শিল্পীসত্তার সমন্বয়কে গুরুত্ব দেন। তার নির্মাণে চরিত্রকেন্দ্রিক গল্প এবং মানবিক আবেগের উপস্থিতি স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, একটি সিনেমার আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে তার গল্প ও চরিত্রে। গল্প যদি হৃদয়ে পৌঁছায় এবং চরিত্র বাস্তব মানুষের মতো মনে হয়, তখনই একটি সিনেমা দর্শকের কাছে সত্যিকারের অর্থ পায়।
তার প্রথম ফিচার ফিল্ম ‘কাগজ’ নির্মাণের অভিজ্ঞতা তার পরিচালন ভাবনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করে। ছবিটিতে তিনি চরিত্রের দর্শন ও জীবনবোধকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, প্রচারণায় টেরাকোটা পোস্টার ব্যবহারের উদ্যোগটি পরে ফিল্ম আর্কাইভ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত হয়, যা তার জন্য উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে তিনি আশাবাদী চোখে দেখেন। নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা কনটেন্টনির্ভর ও পরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকছেন, যা ইতিবাচক প্রবণতা। তবে হলসংকট, আন্তর্জাতিক বিতরণের সীমাবদ্ধতা এবং অনুদান প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আছে।
জাহেদী সীমিত বাজেটেও নতুন প্রতিভা গড়ে তোলার কাজে বিশ্বাসী। বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নতুন দর্শক–ধারার সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যস্ত, তখন তিনি তৈরি করছেন ছোট অথচ আবেগময় চলচ্চিত্র, যা দর্শকের সঙ্গে গভীরভাবে সংযোগ তৈরি করে। তার কাজের মূল কৌশল হলো—প্রথমে গল্পের মূল সত্তাকে খুঁজে বের করা। গল্প শক্তিশালী হলে বাকি সবকিছু ধীরে ধীরে নিজের জায়গা খুঁজে নেয়।
নতুন প্রতিভা আবিষ্কার করতে হলে অভিনেতার ভেতরের সম্ভাবনাকে বুঝতে হবে এবং তার শক্তির জায়গাগুলো মাথায় রেখে চরিত্র নির্মাণ করতে হবে। সেটে সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা এবং এমনভাবে নির্দেশনা দেওয়া জরুরি, যাতে অভিনয় দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। সঠিক গল্প ও যত্নশীল উপস্থাপনা থাকলে নতুন মুখও প্রতিষ্ঠিত তারকার মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে।
আলী জুলফিকার জাহেদী বিশ্বাস করেন, অর্থ ও খ্যাতি পরে আসবে; প্রথমে নির্মাতার নিজের গল্পের প্রতি ভালোবাসা থাকা দরকার। যে আবেগ পর্দায় ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সেখান থেকেই জন্ম নেয় নতুন তারকা। তার বার্তা স্পষ্ট—মেগা স্টারের পেছনে না ছুটে নিজের কাজ দিয়ে প্রভাব তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী গল্প এবং সৃজনশীল উপস্থাপনা দিয়ে এমন চলচ্চিত্র বানানো সম্ভব, যা দর্শক দীর্ঘদিন মনে রাখে।
তিনি মনে করেন, এখনই সময় নতুন নির্মাতাদের সামনে আসার, কারণ সিনেমার ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছে নতুন চিন্তা ও নতুন গল্পের হাত ধরেই।
বিআলো/তুরাগ



