উপকূলের প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষায় নির্বাচনী ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারের দাবি
বিশেষ প্রতিনিধি: নির্বাচনী ইশতেহারে উপকূলের প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষায় সুস্পষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মীরা। তারা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ মানবিক ও পরিবেশ সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে জীবিকা সংকট, লবণাক্ততা ও সুপেয় পানির অভাবে জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা জরুরি।
রোববার (১১ জানুয়ারি) রাজধানীর ডাব্লিউভিএ মিলনায়তনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র সাধারণ সভা থেকে এসব দাবি জানানো হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাপা সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার। উপকূল ও সুন্দরবন সুরক্ষাবিষয়ক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র।
সভায় বক্তব্য রাখেন বাপার সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন)-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. নজরুল ইসলাম, বেন-এর বৈশ্বিক সমন্বয়কারী ড. মো. খালেকুজ্জামান, বাপার সহ-সভাপতি মহিদুল হক খান ও অধ্যাপক এম. শহীদুল ইসলাম, বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির, যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদারসহ অন্যান্য পরিবেশবিদ ও গবেষকরা।
নির্বাচনী ইশতেহারে ১১ দফা দাবি
সভায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তির জন্য ১১ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
উপকূলীয় অঞ্চলকে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বিশেষ এলাকা ঘোষণা
উপকূলের প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষায় জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ
লোনা পানি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা
দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রতিটি বাড়িকে শেল্টার হোম হিসেবে গড়ে তোলা
উপকূল সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুক্তভোগী জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত
বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন সুরক্ষায় কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ
নদ-নদী ও জলাশয় দখল ও দূষণমুক্ত করে স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে উপকূলে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা
টেকসই ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং পুরোনো বাঁধ সংস্কার
কৃষি উন্নয়ন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি
উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠন
জলবায়ু পরিবর্তনে ভয়াবহ সংকট সভায় জানানো হয়, বৈশ্বিক উষ্ণতায় বাংলাদেশের দায় মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ হলেও দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। এর মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে। গত ২০ বছরে উপকূলে দুর্যোগের মাত্রা প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে।
এসব দুর্যোগে মানুষের জীবন-জীবিকা, সম্পদ, খাদ্য নিরাপত্তা, সুপেয় পানি ও বাসস্থানের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। সমগ্র উপকূলজুড়ে সুপেয় পানির তীব্র সংকট বিরাজ করছে।
অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ ও লবণাক্ততার আগ্রাসনে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বক্তারা জানান, সুন্দরবন উপকূলে প্রায় ৭৩ শতাংশ পরিবার নিরাপদ সুপেয় পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
লবণাক্ততা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
প্রস্তাবে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে গত ৩৫ বছরে লবণাক্ততা ২৬ শতাংশ বেড়েছে। একসময় যেখানে লবণাক্ততার মাত্রা ছিল ২ পিপিটি, বর্তমানে তা বেড়ে ৭ পিপিটিতে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। শুধু সাতক্ষীরা জেলাতেই কৃষি উৎপাদন প্রতিবছর গড়ে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ হারে কমছে, যা উপকূলীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।
এছাড়া লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় জনগোষ্ঠী গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। চিকিৎসকদের বরাতে জানানো হয়, এসব এলাকায় উচ্চ রক্তচাপ, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের প্রি-একলেম্পশিয়া এবং নারীদের জরায়ু সংক্রমণের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বক্তারা বলেন, উপকূলের এই বহুমাত্রিক সংকট মোকাবেলায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য ও সময়োপযোগী রাজনৈতিক অঙ্গীকারই পারে উপকূল ও দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে।
বিআলো/তুরাগ



