কিশোরগঞ্জের ৬টি আসন: বিএনপি ৩ জামায়াত ১ স্বতন্ত্র ২ প্রার্থী এগিয়ে
৩টি আসনে সহজ জয় পাচ্ছে বিএনপি
ভোটারদের আস্থায় ২ স্বতন্ত্র প্রার্থী
মেজর (অ.) আক্তারুজ্জামান রঞ্জনের ব্যক্তি ইমেজ ১টিতে জামায়াতের জয় নিশ্চিৎ করবে
আকাশ মাহমুদ: আসন্ন ত্রয়োদশ জতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাররা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল কিংবা মার্কা দেখে নয়, বরং প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ ও যোগ্যতা দেখে ভোট দিতে চান। ভোটারদের এই নতুন প্রবণতা প্রচলিত দলীয় রাজনীতির সমীকরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সম্প্রতি এক জরিপ প্রতিবেদনে নির্বাচনী পরিবেশ ও ভোটারদের মনস্তত্ত্বের এই পরিবর্তনের চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজের সভাপতিতে অনুষ্ঠিত সেমিনারে ভোটারদের এই নতুন প্রবণতা প্রচলিত দলীয় রাজনীতির সমীকরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে- এমনটিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ২ দিন বাকি। দেশের অন্যতম বৃহত্তর জেলা কিশোরগঞ্জের ৬টি আসনে ভোটের আগাম চিত্র এখন দৃশ্যমান। প্রচারণাও শেষ পর্যায়ে। নির্বাচন পর্যবেক্ষক মহলের দৃষ্টিতে কিশোরগঞ্জের ৬টি আসনের মধ্যে ৩টি আসনে বিএনপির বিজয় প্রায় নিশ্চিতই বলা যায়। অপর দিকে কিশোরগঞ্জ-২ আসনে জামায়াত, কিশোরগঞ্জ-১ এবং কিশোরগঞ্জ-৫ আসন দুটিতে বিএনপি’র বিদ্রোহী দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিজয় অনেকটাই সুনিশ্চিত।
কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনটিতে ৫ লক্ষ ৫৫ হাজার ১৩৬ ভোটার অধ্যুষিত। এখানে ১৭টি ইউনিয়ন এবং দুটি পৌরসভায় মোট ভোট কেন্দ্র ১৮১টি। এই আসনে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি ও বিভাগীয় স্পেশাল জজ এবং সেনা কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. রেজাউল করিম খান চুন্নু এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মোরগ মার্কা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। তিনি গত দুটি নির্বাচনে বিএনপি’র দলীয় প্রার্থী ছিলেন। বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের স্নেহ-সান্নিধ্য পাওয়া মো. রেজাউল করিম খান চুন্নু দল-মত নির্বিশেষে এই আসনে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। সদালাপি ও নিরহংকারী, মাটি এবং মানুষের সাথে নিবিড় সম্পর্ক আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁকে জয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে।
ভোটারদের একটি বড় অংশের মতে, রেজাউল করিম খান চুন্নু পেশা জীবনে দল-মত নির্বিশেষে এলাকার মানুষের কল্যাণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁর এসব কর্মকাণ্ড ভোটারদের মনে গেঁথে আছে। বিভাগীয় স্পেশাল জজ পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি আইন পেশায় সম্পৃক্ত হন। দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনের সময় নির্যাতিত ও নিপীড়িত বিএনপি’র নেতাকর্মীদের পক্ষে দাঁড়ান দৃঢ়ভাবে। শুধু কিশোরগঞ্জ নয়, সারাদেশে বিএনপি’র নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোতে আইনজীবী হিসেবে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। তাঁর এই অবদানগুলো বিএনপি’র মাঠ নেতাদের কাছে বিশেষভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। এই আসনে বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাযহারুল ইসলাম। তিনি জেলা বিএনপির টানা তিন মেয়াদের সাধারণ সম্পাদক হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. রেজাউল করিম খান চুন্নুকে তাঁর ব্যক্তি ইমেজের কারণে জয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে।
কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) সংসদীয় আসনটি ৫ লক্ষ ৩২ হাজার ৫১৬ ভোটার সমৃদ্ধ। এ আসনে রয়েছে ১৮টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা। মোট ভোট কেন্দ্র ১৭০টি। এখানে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী স্বজ্জন ও শিক্ষা ব্যক্তিত্ব শফিকুল ইসলাম মোড়ল বিএনপি প্রার্থী এ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিনের চেয়ে এগিয়ে আছেন। জামায়াতের প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মোড়ল কটিয়াদী উপজেলার বাসিন্দা আর বিএনপি’র এ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন পাকুন্দিয়া উপজেলার বাসিন্দা। কটিয়াদী উপজেলার চেয়ে পাকুন্দিয়া উপজেলায় ভোটের সংখ্যা তুলনামূলক কম। আঞ্চলিকতার হিসাব টেনে কটিয়াদী উপজেলাবাসী জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষেই অবস্থান নেবেন বলে জানা গেছে।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মোড়লের গণসংযোগ ও নির্বাচনি জনসভাগুলোতে বিপুল ভোটারদের উপস্থিতিই ফলাফলের আগাম চিত্র ফুটে উঠে। এর সাথে যোগ হয়েছে বিএনপি’র দুই বারের জনপ্রিয় সাবেক সাংসদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অ.) আক্তারুজ্জামান রঞ্জনের জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান। মেজর (অ.) আক্তারুজ্জামান রঞ্জনের ব্যক্তি ইমেজ ও বর্নাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে গড়ে তোলা নিজস্ব ভোট ব্যাংক ও গ্রামগঞ্জের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সমর্থন এবারের ভোটের মাঠে জামায়তের প্রার্থীর বিজয় সুনিশ্চিত করবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন।
কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) সংসদীয় আসনটি ৩ লক্ষ ৫৩ হাজার ৫৬৬ ভোটার সমৃদ্ধ। এ আসনটিতে রয়েছে ১৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা। মোট ভোট কেন্দ্র ১১৯টি। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোট যুদ্ধে এই আসনে হাঁস মার্কা প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল অনেকটাই এগিয়ে আছেন। বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘ ২৫ বছরের এক সমৃদ্ধ ক্যারিয়ার রয়েছে তাঁর। বন্যা, নদীভাঙ্গন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বাজিতপুর ও নিকলীর নিত্যদিনের সমস্যা-সংকটে গণমানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তিনি। করোনা মহামারির মতো কঠিন সংকটময় সময়গুলোতেও তিনি নিকলী-বাজিতপুরবাসীর পাশে দাঁড়িয়ে সকল সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছিলেন।
ভোটারদের মতে সর্বসাধারণের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা তাঁর চরিত্রেরই অংশ। দল ও মতের ঊর্ধ্বে থাকা ব্যক্তি ইমেজেই নিকলী-বাজিতপুর নির্বাচনী এলাকার সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো তাঁকে নিয়ে গেছে গণমানুষের পছন্দের শীর্ষে। এছাড়া ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের সময়টাতে কারারূদ্ধ বিএনপি নেতা-কর্মীদের জামিনের ব্যবস্থা এবং তাঁদের পরিবারগুলোকে নানান ভাবে সহায়তা করার অবদানগুলো বিএনপি’র মাঠ নেতাদের কাছেও বিশেষভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।
একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও কিশোরগঞ্জ ৫ আসনে বিএনপি’র দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি।
এর আগে তিনি ২০০১ সালে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন। শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল ধানের শীষের প্রতীক পেয়েও সেদিন সিনিয়রটি বিবেচনায় জনপ্রত্যাশার প্রতি সম্মান এবং বিএনপির দলীয় স্বার্থ বিবেচনা করে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করে বিএনপির প্রার্থী মজিবুর রহমান মঞ্জুর পক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলেন এই শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। তিনি এবারও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রথম দফায় বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। অদৃশ্য কারণে রাতারাতি তাঁর মনোনয়ন পরিবর্তিত হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাজিতপুর-নিকলীর সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের প্রত্যাশার প্রতি সাড়া দিয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়ন পত্র দাখিল করার পর এই আসনে ভোটের দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়।
এমতাবস্থায়, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান ইকবালকে দলীয় সব পদ থেকে অব্যাহতির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের প্রায় ৬২ জন বিভিন্ন পদের নেতাকর্মী স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় দল থেকে বহিষ্কারাদেশ দেয়া হয়। কেন্দ্রের এমন হঠকারি ও প্রশ্নবিদ্ধ সিন্ধান্তে উল্টো দিন দিন দুর্বল হচ্ছে এই আসনে বিএনপির ভোটব্যাংক। সরেজমিনে দেখা যায়, এই এলাকার নীরব ভোটার, ইসলামী মূল্যবোধ ও জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারীরা দলীয় প্রার্থী এবং মার্কার চেয়ে ব্যক্তি ইমেজ এবং যোগ্যপ্রার্থীর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছেন পুরো মাত্রায়।
বছরের পর বছর যারা জনগণের পাশে ছিলেন, সাথে আছেন, তারাই এবার জয়ের পতাকা হাতে পাবেন- এমনটিই মনে করেন বাজিতপুর ও নিকলীর সচেতন ভোটাররা।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয়তাবাদী আদর্শের রাজনীতির ভীত তৈরি করেছেন সাবেক সাংসদ মরহুম মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল। দীর্ঘ ২৫ বছর বাজিতপুর-নিকলী এলাকার জাতীয়তাবাদী আদর্শের গ্রহণযোগ্য ও আস্থাভাজন হিসেবে পরীক্ষিত নেতা শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। বিএনপি’র সাবেক এমপি মজিবুর রহমান মঞ্জুর মৃত্যুর পর এলাকাবাসী শেখ মজিবুর রহমান ইকবালকেই পাশে পেয়েছে সব সময়। তিনি সারা বছর ধরেই এলাকাবাসীর সাথে আছেন। একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি এলাকাবাসীর কাছে অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তিত্ব। পারিবারিকভাবে শক্ত আর্থিক অবস্থার কারণে তারুণ্যের শুরু থেকেই তাঁকে জনকল্যাণমুখী করেছে। জনপ্রতিনিধি হয়ে এখান থেকে তাঁর নেয়ার কিছুই নেই- এ বিষয়টিও স্থানীয় জনগণ বিবেচনায় নিয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বাণিজ্য এবং হঠকারী সিদ্ধান্ত মাঠের জনসাধারণ এবং ভোটাররা কখনোই মেনে নিতে পারেনি।
শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল শুধু একজন জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই নন, তিনি একাধারে একজন সফল ব্যবসায়ী ও বর্ণাঢ্য পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। তাঁর পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুর রহমান ছিলেন পদস্থ একজন সরকারি কর্মকর্তা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আলোচিত ব্যক্তিত্ব জর্জিয়া স্টেটে টানা ৪ বারের নির্বাচিত সিনেটর শেখ রহমান ( শেখ মুজাহিদুর রহমান চন্দন ) শেখ মজিবুর রহমান ইকবালেরই বড় ভাই। বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শহীদ মতিউর রহমানের আপন ভাগ্নে শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বিগত দুই যুগ ধরেই নিকলী-বাজিতপুর তথা পুরো কিশোরগঞ্জ জেলায় জনকল্যাণকামী মানুষ হিসেবে দল-মতের ঊর্ধ্বে থাকা এক প্রিয় মানুষ। কিন্তু প্রদীপের আলোর নিচে অন্ধকার থাকার মতোই একটি স্বার্থান্বেষী মহল অদৃশ্য দেয়াল নির্মাণ করে রেখেছে শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের চারপাশে।
এতে করে অনেক জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য এবং ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সদস্যদের দূরে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এই দুষ্টচক্রের বিরুদ্ধে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রক্ষার আড়ালে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়াসহ নানারকম দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বাজিতপুর ও নিকলীর ছাতিরচর ইউনিয়নসহ কয়েকটি এলাকায় ফিসারি ও ভূমিদখল এবং চাঁদাবাজির মতো অনুচিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছে নিন্দিত হয়ে আছে ঐসকল মাঠ নেতা। স্থানীয় ভুক্তভোগী জনসাধারণের মন্তব্য- শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বিজয়ের দ্বার প্রান্তে থাকলেও তাঁকে এই অদৃশ্য দেয়াল মুক্ত হতে হবে ভোটের আগেই।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, কিশোরগঞ্জ -৫ আসনে ভোট যুদ্ধে এগিয়ে থাকা শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের বিজয় নিশ্চিত করতে হলে প্রচারণার শেষ সময়টিতে ভোটারদের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য ও ক্লিন ইমেজধারী ব্যক্তিত্বসম্পন্নদের সঙ্গে নিয়ে ইসলামী মূল্যবোধ ও জাতীয়তাবাদী আদর্শের ভোটার-সমর্থকদের পাশাপাশি ধর্ম-বর্ণ জাতি-গোষ্ঠীসহ তৃণমূলের সকল শ্রেণী-পেশার জনসাধারণের সাথে নিবিড় যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। সম্প্রতি স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নেমেছেন তাঁরই সহোদর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেটের টানা ৪ বারের সিনেটর মুজাহিদুর রহমান চন্দন, যিনি শেখ রহমান নামেই সমধিক পরিচিত এবং বাংলাদেশ ও বাঙালির গর্ব।
নির্বাচনী প্রচারণার সর্বশেষ দুটি জনসভায় বাজিতপুর উপজেলা ডাকবাংলা মাঠে এবং নিকলী উপজেলা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠের জনসভায় শেখ রহমানের আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তৃতায় নিকলী-বাজিতপুরের মাটি এবং মানুষের প্রতি যে দরদ ও ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে, এমতাবস্থায় স্বতন্ত্রপ্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালের সমর্থনে জনস্রোতের নতুন মাত্রা তৈরি হয়। জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনী পর্যবেক্ষক মহলের অভিমত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
এই আসনে বিএনপি’র প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা পারিবারিক ঐতিহ্যের অধিকারী হলেও তিনি অতীতে কখনো জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন না। রাজধানী কেন্দ্রিক আইন পেশায় জড়িত থাকলেও বাজিতপুর-নিকলীর জনসাধারণের সাথে তাঁর সম্পর্ক এখনো সেভাবে তৈরি হয়নি। ধানের শীষ প্রতীকই তাঁর জনসমর্থন ও ভোটের একমাত্র সম্বল বলে মন্তব্য করেছেন এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।
৫ আগস্ট পরবর্তী নিকলী-বাজিতপুর বিএনপির কিছু বিতর্কিত মাঠ নেতা জনগণের প্রতি অনুচিত প্রভাব বিস্তার করেছেন, দিনরাত অহেতুক-অপ্রয়োজনীয় দাপট দেখিয়েছেন। তারাই এখন এহসানুল হুদার পক্ষে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে দাপিয়ে বেড়ানোর চেষ্টা করছেন। বিএনপি’র একনিষ্ঠ সমর্থক এবং ভোটাররা এসব কর্মকাণ্ড মেনে নিতে পারছেন না। মুখে কিছু বলছেন না কিন্তু ভোটকেন্দ্রে এর সমুচিত জবাব তাঁরা দেবেন এটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। ঐসব জনবিছিন্ন লোকজন ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিরুদ্ধে গুজব, পরনিন্দা ও মিথ্যাচার করছে। এ বিষয়টিও ভোটাররা নেতিবাচক হিসেবেই নিয়েছে।
অপরদিকে এহসানুল হুদার বদমেজাজ ও অতি অহংকারী মনোভাবের কারণে স্থানীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটারদের মধ্যে চরম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তিনি এমনিতেই বিএনপিতে সদ্য যোগদেয়া নেতা ও অনেকটা জনবিচ্ছিন্নই বলা যায়। তাঁর বিতর্কিত আচরণ দিন দিন তাঁকে আরও জনবিচ্ছিন্ন করে তুলছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিরুদ্ধে তাঁর অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানোর ঘটনায় ত্যাক্ত-বিরক্ত নিকলী-বাজিতপুরের জনগণ। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ঘুরেফিরে এই একটি প্রশ্নই বারবারই আসছে- রাতারাতি বিএনপি’র মনোনয়ন কি করে পেলেন এই প্রার্থী? সচেতন ভোটারদের একটি বড় অংশের মতে ধানের শীষের বর্তমান প্রার্থীর পারিবারিক পরিচিতি যায় থাকুক, তিনি নিজে কখনোই বিএনপি’র কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য ভাবে সক্রিয় ছিলেন না। এ বিষয়টি ভোটাররা কমবেশি জানেন। তাঁর পক্ষে জনবিচ্ছিন্ন ও সুবিধাবাদী মাঠ নেতাদের একটি অংশ যেভাবে ধানের শীষের পক্ষে প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছেন, এতে ধানের শীষের পক্ষে ভোটারদের সমর্থন আরও কমিয়ে দিচ্ছে।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. রমজান আলী। তিনি একজন শিক্ষক হলেও স্থানীয় জনসাধারণের কাছে তিনি কৃপন স্বভাবের লোক হিসেবে পরিচিত। নিকলী-বাজিতপুরের সাধারণ জনগোষ্ঠীর সাথে তাঁর সম্পর্কটা তেমন একটা তৈরি হয়নি। তিনি অতীতে তাঁর পরিবার, নিকটাত্মীয় ও দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক ও সহযোগিতার হাত সীমাবদ্ধ রেখেছেন। এ কারণে জনসাধারণের কাছে কখনোই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেননি। ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লব পরবর্তী ধর্মকে পুঁজি করে সাধারণ জনগোষ্ঠীকে এবার কাছে টানার চেষ্টা করছে- এমন অভিযোগ এখন ওপেন সিক্রেট। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোট যুদ্ধে তিনি দলের প্রত্যাশা পূরণে সফল নাও হতে পারেন।
এই আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন হরিণ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী এ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম, হাত পাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা মো. দেলোয়ার হোসেন, মোমবাতি প্রতীকে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোহাম্মদ অলি উল্লাহ, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির মাহবুবুল আলম এবং হারিকেন প্রতীকে বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. সাজ্জাদ হোসাইন।
বিআলো/এফএইচএস



