কুড়ের পালা গ্রামীণ অর্থনীতি ও টিকে থাকার নীরব ঐতিহ্য
মো. তরিকুল ইসলাম (মোস্তফা), বাউফল (পটুয়াখালী) : বর্ষার টানা বৃষ্টিতে যখন মাঠঘাট পানিতে তলিয়ে যায় এবং সবুজ ঘাসের তীব্র সংকট দেখা দেয় তখন গ্রামের কৃষকের ভরসার নাম হয়ে ওঠে ‘কুড়ের পালা’।
ধান কাটার পর জমিতে পড়ে থাকা নাড়া (খড়ের নিচের অংশ) সংগ্রহ করে দীর্ঘমেয়াদে পশুখাদ্য হিসেবে সংরক্ষণ করার এই পদ্ধতিই কুড়। গ্রামবাংলায় কুড় শুধু গবাদিপশুর খাদ্য নয়; এটি কৃষকের দূরদর্শী পরিকল্পনা ও টিকে থাকার এক নীরব কৌশল।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বিলবিলাস গ্রামের কৃষক ইউনুচ হাওলাদার জানান, শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর থেকে শুরু করে দুপুরের রোদ টানা প্রায় ১৫ দিন হাঁটু পানি নেমে তিনি নাড়া সংগ্রহ করেছেন। চারটি গরুর জন্য তৈরি করা এই কুড়ের বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার টাকা।
বর্ষা মৌসুমে অন্তত ছয় মাস তাঁর গবাদিপশুর খাদ্যের নিশ্চয়তা দেবে এই কুড়। তিনি বলেন, এই কুড় না থাকলে বর্ষায় গরু বাঁচানো খুবই কঠিন হয়ে যেত। স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বাউফল উপজেলায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কৃষক পরিবার নিয়মিত কুড় সংরক্ষণ করেন।
বাড়ির উঠান কিংবা খোলা জায়গায় খড় ও নাড়া দিয়ে তৈরি কুড়ের পালাগুলো দূর থেকে দেখলে যেমন গ্রামবাংলার সৌন্দর্য বাড়ায় তেমনি এগুলো কৃষকের নিরলস শ্রম, দায়িত্ববোধ ও আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইতিহাস বলছে, খড় ও খরকুটার ব্যবহার শুধু পশুখাদ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্রামীণ মৃৎশিল্পের সঙ্গেও এর রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। থালা-বাসন, কলস ও মাটির তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী পরিবহনের সময় ভাঙন রোধে খড়কুটাই ছিল প্রধান ভরসা। আজও কাঁচের গ্লাস, চিনামাটির বাসন কিংবা মেলামাইনের পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠাতে খড়কুটার ব্যবহার বহুলভাবে প্রচলিত।
আধুনিক প্যাকেজিং আসার আগেও এই প্রাকৃতিক উপাদানই ছিল পরিবহনের সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুড় সংরক্ষণ পদ্ধতি পরিবেশবান্ধব ও খরচ সাশ্রয়ী। এটি খড় পুড়িয়ে ফেলার প্রবণতা কমিয়ে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এটি এক প্রাচীন অথচ কার্যকর ব্যবস্থা। নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা কুড়ের পালাগুলোর ভেতরে লুকিয়ে আছে শত বছরের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম আর আশার গল্প। আধুনিক কৃষির ভিড়ে এই ঐতিহ্য হারিয়ে না যায় সে দায়িত্ব আজ আমাদের সবার।
বিআলো/আমিনা



