ক্লিনিক্যাল বর্জ্য: স্বাস্থ্য ও পরিবেশের নীরব হুমকি
হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার—মানুষের সুস্থতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত এসব প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ ক্লিনিক্যাল বা চিকিৎসা বর্জ্য। অথচ এই বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশ পড়ছে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে।
কী এই ক্লিনিক্যাল বর্জ্য
ক্লিনিক্যাল বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, স্যালাইন ব্যাগ, রক্তমাখা তুলা ও ব্যান্ডেজ, অস্ত্রোপচারের পরিত্যক্ত উপকরণ, পরীক্ষাগারের রাসায়নিক দ্রব্য, ভাঙ্গা কাচ ও সংক্রামক টিস্যু। এসব বর্জ্য সরাসরি সংক্রমণ, মারাত্মক রোগ বিস্তার এবং পরিবেশ দূষণের অন্যতম উৎস।
জীবাণুমুক্তকরণে অটোক্লেভের ভূমিকা
স্বাস্থ্যসেবায় সংক্রমণ প্রতিরোধে অটোক্লেভ (Autoclave) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র। উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপ প্রয়োগ করে এটি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করে।
হাসপাতালের সব সার্জিক্যাল যন্ত্র অটোক্লেভে জীবাণুমুক্ত করা হয়। একইভাবে ল্যাবরেটরির কাচের সামগ্রী ব্যবহার করার আগে অটোক্লেভ দ্বারা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। তবে বাস্তবে অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়মিত অটোক্লেভ ব্যবহার না হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
ফিউমিগেশন কোথায় ও কেন
হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জীবাণুমুক্ত পরিবেশ তৈরিতে Fumigation বা ধোঁয়া/বাষ্পের মাধ্যমে জীবাণুনাশ একটি কার্যকর পদ্ধতি।
অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ, ওয়ার্ড, ল্যাবরেটরি ও সংক্রমণ-ঝুঁকিপূর্ণ কক্ষে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ফিউমিগেশন করা না হলে বাতাসের মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ফিউমিগেশন না হলে অটোক্লেভ বা অন্যান্য যন্ত্র ব্যবহারের সুফলও অনেকাংশে কমে যায়।
মেডিক্যাল বর্জ্য দাহক চুল্লির অপরিহার্যতা
চিকিৎসা বর্জ্য চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয় Medical Waste Incinerator (চিকিৎসা বর্জ্য দাহক চুল্লি)।
এই পদ্ধতিতে সংক্রামক ও ক্ষতিকর বর্জ্য উচ্চ তাপে পুড়িয়ে ফেলা হয়, ফলে রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে না। কিন্তু পটুয়াখালীসহ দেশের অনেক উপজেলায় এখনো কেন্দ্রীয় ইনসিনারেটর ব্যবস্থা না থাকায় এসব বর্জ্য খোলা জায়গা, ডাস্টবিন কিংবা জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে—যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
অযথাযথভাবে ফেলা ক্লিনিক্যাল বর্জ্য থেকে হেপাটাইটিস বি ও সি, এইচআইভি, চর্মরোগসহ নানা সংক্রামক রোগ ছড়াতে পারে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে এসব বর্জ্য মিশে গিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হয়। এছাড়া খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলার ফলে শিশুরা ঝুঁকিতে পড়ে এবং বর্জ্য সংগ্রহকারীরা মারাত্মক সংক্রমণের শিকার হন।
করণীয় কী
বিশেষজ্ঞদের মতে—
প্রতিটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পৃথক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিট বাধ্যতামূলক করা
নিয়মিত অটোক্লেভ ও ফিউমিগেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা
উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে আধুনিক মেডিক্যাল বর্জ্য ইনসিনারেটর স্থাপন
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ও নজরদারি জোরদার
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত মনিটরিং
উপসংহার
মানুষের জীবন রক্ষার প্রতিষ্ঠান থেকে যদি সংক্রমণ ও দূষণ ছড়ায়, তবে তা সমাজের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। সময়োপযোগী পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি ও আইনের কঠোর প্রয়োগই পারে ক্লিনিক্যাল বর্জ্যের এই নীরব হুমকি থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে।
লেখক: মো. তারিকুল ইসলাম (মোস্তফা),সাংবাদিক
বিআলো/ইমরান



