খালেদা জিয়া: নীরব জীবন থেকে জাতীয় মঞ্চে, গৃহবধূ থেকে গণতন্ত্রের প্রতীক
এফ এইচ সবুজ: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক অনন্য নাম। যাঁর রাজনীতিতে প্রবেশ ছিল না কোনো পূর্বপরিকল্পিত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল, বরং সময়, বাস্তবতা ও দায়িত্ববোধের অনিবার্য ডাকে সাড়া দেওয়ার ইতিহাস। দেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু একটি পদ নয় একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা এই নারীর জীবন শুরু হয়েছিল গৃহকেন্দ্রিক, নিরালম্ব ও প্রচারের বাইরে। সহজ-সরল জীবনযাপন, পরিমিত আচরণ এবং দৃশ্যমান রাজনৈতিক উচ্চাশার অনুপস্থিতিই ছিল তাঁর পরিচয়।
১৯৬০ সালে সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন খালেদা জিয়া। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান হয়ে ওঠেন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র—জেড ফোর্সের প্রধান, পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রনায়ক।
কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে স্বামী হারিয়ে, দুই সন্তান ও নেতৃত্বশূন্য বিএনপিকে সামনে নিয়ে দাঁড়ান খালেদা জিয়া। ব্যক্তিগত শোক তখন জাতীয় রাজনীতির এক কঠিন বাস্তবতায় রূপ নেয়।
শুরুর দিকে রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী ছিলেন না তিনি। কিন্তু দলীয় নেতাকর্মীদের প্রবল চাপ ও সময়ের দাবি তাঁকে রাজনীতির পথে টেনে আনে। ১৯৮২ সালে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হন এবং মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
রাজনীতির মঞ্চে তাঁর এই উত্থান ছিল ধীর, কিন্তু দৃঢ়। বক্তৃতায় আক্রমণাত্মক না হয়েও তিনি হয়ে ওঠেন একটি আন্দোলনের মুখ।
সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়েই জাতীয় পর্যায়ে খালেদা জিয়ার অবস্থান সুদৃঢ় হয়। বারবার গ্রেপ্তার, হয়রানি ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মুখেও তিনি রাজপথ ছাড়েননি।
এই সময়েই তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন গণতন্ত্রপন্থী রাজনীতির এক প্রতীক হিসেবে—যেখানে আপস নয়, সংগ্রামই প্রধান ভাষা।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই সময়টি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
পরবর্তীতে ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে তিনি আবারও সরকার গঠন করেন। এই দুই মেয়াদে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি নারী নেতৃত্বের ধারণাকেও নতুন মাত্রা দেন।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় কারাবরণ, নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা এবং দীর্ঘ সময় কার্যত গৃহবন্দিত্ব সবই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কঠোর অধ্যায়।
২০২০ সালে নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেলেও বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি পাননি তিনি। গুলশানের বাসভবনে সীমাবদ্ধ জীবনযাপন করতে হয় তাঁকে দীর্ঘ সময়।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন আসে। সেই ধারায় বেগম খালেদা জিয়া পূর্ণ মুক্তি লাভ করেন এবং আইনি প্রক্রিয়ায় মামলাগুলো থেকেও অব্যাহতি পান।
এরপর তিনি প্রতিশোধ নয়, জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের আহ্বান জানাতে থাকেন—যা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন।
বেগম খালেদা জিয়া কখনো উচ্চকণ্ঠ রাজনীতির প্রতীক ছিলেন না। কিন্তু নীরব সহনশীলতা, দৃঢ়তা এবং দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক: এই পথচলা শুধু একজন নারীর উত্থানের গল্প নয়; এটি একটি দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের দলিল।
বিআলো/এফএইচএস



