গুমের সাথে জড়িতদের ভোটের আগেই বিচারের দাবি স্বজনদের
নিজস্ব প্রতিবেদক:প্রিয়জনদের ফিরে আসার অপেক্ষায় গুম হওয়া পরিবারের স্বজনরা। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর বুক ভরা আশা নিয়ে দিন গুনছেন তারা। কেউ বাবা হারিয়েছেন, কেউ ভাই বোন, কারো স্বামী, আবার কোন মা হারিয়েছে তার প্রিয় সন্তানকে। শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলেও গুম হয়ে যাওয়া এই মানুষগুলোর কেন খোঁজ মিলছে না। আদতে তারা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন তার সঠিক খবর কেউ জানে না। আন্তর্জাতিক গুম দিবসে গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচার ও হারিয়ে যাওয়াদের সন্ধানের দাবিতে মানববন্ধন করেছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। শনিবার সকালে রাজশাহী সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে এর আয়োজন করা হয়।
এ সময় বক্তারা গুমের সাথে জড়িতদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে ভোটের আগেই বিচার কার্য শেষ করার দাবি জানান। তারা বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় নিখোঁজ এদেরই কারও বাবা, কারও সন্তান, কারও স্বামী, কারও ভাই। বছরের পর বছর গুম হওয়া স্বজনের অপেক্ষায় পরিবারের সদস্যরা। এসময় তাদের আর্তনাদ-আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে সাহেব বাজার জিরোপয়েন্ট’র বাতাস। নিখোঁজদের ফেরত পাওয়ার আকুল আকুতি তাদের। মানববন্ধনে স্বজনদের ছবি নিয়ে উপস্থিত হন গুম হওয়া ৫টি পরিবারের সদস্যরা। এছাড়াও গুম থেকে ফিরে আসা ৭ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
গুমের ঘটনা থেকে কেউ কেউ বেঁচে ফিরছেন। তাদের মধ্যে আতিকুল ইসলাম মানববন্ধনে প্রশ্ন রেখে বলেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দেয়ার কথা প্রতিটি নাগরিককে, কিন্তু সরকারি বাহিনী কোন আইনি বলে তাদের গুম করেছিল? তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারের মতো অসংখ্য পরিবারের এই কষ্ট মাসের পর মাস বছরের পর বছর ভোগ করছে।গুমের ঘটনায় জড়িতদের অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’ গুম হওয়া ব্যক্তিদের ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি আয়নাঘর নামক নির্যাতন কারখানা বিলুপ্ত ঘোষণারও দাবি জানিয়েছেন তিনি। মানববন্ধনে গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা অন্তবর্তী সরকারের নিকট দাবি জানিয়ে বলেন, আমাদের পিতা বা স্বামী জীবিত না মৃত, আমরা পিতৃহারা, বিধবা না সধবা এর নিশ্চয়তা চাই। আমরা চাই গুমের সাথে জড়িতদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে ভোটের আগেই বিচারের কার্য শেষ করতে হবে। ‘অধিকার’র রাজশাহীর সমন্বয়ক ও দৈনিক আমার দেশ’র ব্যুরো প্রধান মঈন উদ্দিন’র পরিচালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্ট্রার মানবাধিকার কর্মী ড. ইফতেখারুল আলম মাসউদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহকারী মহাসচিব ও আরইউজে’র সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিকুল ইসলাম স্বপন, দীর্ঘ ছয় মাস গুম থেকে ফিরে আসা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক ছাত্রনেতা আতিকুল ইসলাম, গুম হওয়া আব্দুল কুদ্দসের স্ত্রী জামিল আক্তার, মুরশিদুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা বিবি। এছাড়াও গ্রীন ভয়েজ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আহসান হাবীবসহ সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা বক্তব্য রাখেন।
মানববন্ধন শেষে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’র উদ্যোগে মহানগরীর আলুপট্রি থেকে একটি র্যালি বের হয়। র্যালিটি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক প্রদিক্ষণ করে সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে মানববন্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’র রাজশাহীর সমন্বয়ক ও দৈনিক আমার দেশ’র ব্যুরো প্রধান মঈন উদ্দিন অধিকার’র পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ১০ টি দাবি তুলে ধরেন- ১। সব গুমের ঘটনায় স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনা করতে হবে; ২। গুম অবস্থা থেকে ফেরত না আসা ব্যক্তিদের অনুসন্ধানের জন্য নীতিমালা প্রণয়ণ করে একটি জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরী বিষয়; ৩। গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মিথ্যা বা সাজানো মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে; ৪। গুম অবস্থা থেকে ফেরত না আসা ব্যক্তিদের পরিবার যেন ভুক্তভোগীর ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও সম্পত্তি পরিচালনা করতে পারে এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণের বিধান রাখতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; ৫।
বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ণ করতে হবে; ৬। সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা সংশোধন করতে হবে; ৭। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় জড়িত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) কে বিলুপ্ত করতে হবে; ৮। গুমের প্রমান ধ্বংসের সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে; ৯। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তি বন্ধে ন্যায্য, স্বচ্ছ ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে; এবং ১০। আইসিপিপিইডি বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মান অনুযায়ী ফরেনসিক, আইনগত ও তদন্তে সক্ষমতা উন্নত করতে বাংলাদেশ সরকারের কারিগরি ব্যবস্থা উন্নত করা।
বিআলো/ইমরান