গ্যাস ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট প্রত্যাহার: দাম কমেনি, গ্রাহক ভোগান্তি অব্যাহত
আগামী সপ্তাহে সরবরাহের সংকট স্বাভাবিক হবে— জালাল আহমেদ, চেয়ারম্যান, বিইআরসি
অনেক অঘটনের জন্ম দিয়ে ধর্মঘট প্রত্যাহার
১৩৭০ টাকার গ্যাস ২৫০০ টাকায় বিক্রি
এলপিজির সংকট কাটাতে ভ্যাট-ট্যাক্স পুনঃর্নিধারণ
রতন বালো।।
অবশেষে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবসায়ীদের ডাকা সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অংশ নেওয়ার পর সংগঠনের সভাপতি মো. সেলিম খান সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন। তবে দাম কমেনি। ১ হাজার ৩৭০ টাকার গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। তার পরেও কোন কোন স্থানে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে গ্রাহক ভোগান্তি চরম আকার ধারন করছে।
ধর্মঘট প্রত্যাহার বিষয়ক বৈঠকে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আশ্বস্ত করেছেন, চলমান অভিযানের বিষয়ে তারা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন এবং চার্জ বাড়াতে আইনগত পদক্ষেপ নেবেন।
তিনি আরও বলেন, এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন জানিয়েছে যে জাহাজ সংকটের মধ্যেও পণ্য আমদানির জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহের সংকট কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে। গত বুধবার এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের পক্ষ থেকে গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।
এদিকে এলপিজি ব্যবসায়ী ও বিইআরসির চেয়ারম্যানের বক্তব্যের সঙ্গে শুক্রবার বাজারে কোন মিল পাওয়া যায়নি। দেশের বাজারে কোন গ্যাস সিলিন্ডার নেই। রাতারাতি উধাও হয়ে গেছে সিলিন্ডার। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন ভোক্তারা। পরিচিত দেকানগুলোতে তালা ঝুলছে। যারা গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির পাশাপাশি অনান্য মলামাল বিক্রি করেন তারা দোকানের সামনে নোটিশ টাঙিয়ে দিয়েছেন, ‘গ্যাস নেই’।
এদিকে গত বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে হাজির হয়ে ব্যবসায়ীরা তাদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া পেশ করেন। এসময় তারা তাদের চাহিদা পূরণের জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন। তাদের বেঁধে দেওয়া সময় না পেরুতেই দোকান থেকে এলপিজির সিলিন্ডার গায়েব হয়ে যায়।
সঙ্কট শুরু হয় গত বুধবার এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির ঘোষণা থেকে। তারা ৭ জানুয়ারি থেকে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেয়। ঘোষণার সঙ্গে তা বাস্তবায়ন করে সমিতির সদস্যরা। তারা তাদের ঘোষণায় বলে এই বন্ধের নিদৃষ্ট কোন সময় সীমা নেই।
ঘোষণা অনুযায়ী- গত বৃহস্পতিবার থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রয়েছে। তাদের ঘোষিত দাবি বাস্তবয়ন না হওয়া পর্যন্ত সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রাখবেন তারা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা। রাজধানীর হাতিরপুল, লালবাগ, নিউমার্কেট, ইব্রাহিমপুর এলাকাসহ কোনো দোকানেই সিলিন্ডারের গ্যাস নেই। দু-একটি দোকানে কিছু সিলিন্ডার থাকলেও দাম বেশি।
এই এলাকার সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবসায়ী আরাফাত বলেন, ১২ কেজি এলপি গ্যাস ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এই এলাকার একটি দোকানেও গ্যাস নেই। চাহিদা অনুযায়ী আমরা সিলিন্ডার পাচ্ছি না। ডিস্ট্রিবিউটর ও কোম্পানি উভয়েই দাম বেশি রাখছে। ১ হাজার ৩৭০ টাকার গ্যাস কোম্পানির কাছ থেকেই ডিস্ট্রিবিউটররাও বেশি দামে আনে। ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছ থেকেই আমাদের দুই হাজার টাকায় আনতে হয়। তিনি আরও বলেন, আজ কোথাও সিলিন্ডার নেই। রাতে টঙ্গী থেকে এনেছি। ২ হাজার ১০০ টাকা দিয়েছি। বিক্রি করছি ২ হাজার ৩০০ টাকায়।
ভোগান্তিতে গ্রাহক :
অনির্দিষ্টকালের জন্য এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় পর থেকে সিলিন্ডার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। গত বুধবার এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি গ্যাস বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেয়। তারা সিলিন্ডারের দাম নতুন করে নির্ধারণ এবং ডিলারদের হয়রানি ও জরিমানা বন্ধের দাবিতে এ ঘোষণা দেন তারা।
ঘোষণা অনুযায়ী- গত বৃহস্পতিবার থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রয়েছে। দুই দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রাখবেন তারা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা।
এলপিজির সংকট কাটাতে ভ্যাট-ট্যাক্স পুনঃর্নিধারণ:
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এলপিজিকে ‘গ্রিনফুয়েল’ হিসেবে বিবেচনা করে কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। একইদিনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এলপিজি আমদানির জন্য ঋণ প্রাপ্তি ও এলসি খোলার আবেদনগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
এনবিআরকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, দেশে ব্যবহৃত মোট এলপি গ্যাসের প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আমদানি করা হয়, যা শিল্প খাত ও গৃহস্থালি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধারণত শীত মৌসুমে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় এলপি গ্যাসের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। চলতি শীত মৌসুমেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ফলে বাজারে তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
সাম্প্রতিক সময়ে এ সংকট নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ( লোয়াব) নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় এলপি গ্যাসের আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে বিদ্যমান ভ্যাট ও ট্যাক্স কাঠামো পুনঃর্নিধারণের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। সভায় বাজার স্থিতিশীল রাখা ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এর আগে, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ গত ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের এক আলোচনায় বলা হয়, এলপি গ্যাসের আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহার করে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে বিদ্যমান ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট, ব্যবসায়ী পর্যায়ের ভ্যাট ও আগাম কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব সময়োপযোগী।
তবে, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে ভোক্তা পর্যায়ে এলপি গ্যাসের দাম কতটা কমবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণের ওপরও জোর দেওয়া হয়। এ জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে সমন্বিতভাবে পর্যালোচনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। উপদেষ্টা পরিষদের ওই সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে লোয়াবের নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থাপন করা হলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এ বিষয়ে একমত পোষণ করে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বাজারে এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহার করে ১০ শতাংশের নিচে ভ্যাট আরোপ এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে আরোপিত ৭ দশনিক ৫ শতাংশ ভ্যাট, ব্যবসায়ী পর্যায়ের ভ্যাট ও আগাম কর অব্যাহতি দেওয়া এ বিষয়ে উপদেষ্টা পরিষদের আলোচনার সঙ্গে একমত পোষণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।
বিআলো/এফএইচএস



