দিগন্ত জোড়ায় হলুদ রঙে মৌ মৌ গন্ধ!
গৌরীপুরে কৃষক শাহীন সবার অনুকরণীয়
আব্দুর রউফ দুদু, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ): চোখ যতদূর যায়—হলুদ আর হলুদাভ। প্রকৃতিও যেন আজ সেজেছে অপরূপ সাজে। দিগন্ত জোড়া সরিষার ফুলে ভেসে আসে মিষ্টি মৌ মৌ গন্ধ। বাতাসে দোল খায় হলুদ ফুলের ঢেউ। এই নয়নাভিরাম দৃশ্যের নেপথ্যে রয়েছেন কৃষক শাহীন মিয়া। স্বল্প সময়ে, অল্প খরচে অধিক ফলন এনে দিয়ে তিনি এখন এলাকার কৃষকদের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন।
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার হাটশিরা গ্রামের আক্কাছ আলীর পুত্র শাহীন মিয়া জানান, সরিষা চাষে প্রথমে বেশি বীজ ফেললে শাক হিসেবেও বিক্রি করা যায়। বিষমুক্ত ও কীটনাশকমুক্ত এই শাক বাজারে ভালো দামে বিক্রি হয়। ফুলেরও ব্যাপক চাহিদা থাকায় ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক ছাড়াই চাষ করে তিনি ভালো লাভ পাচ্ছেন।
কৃষি অফিসের তথ্য
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াসমিন জলি জানান, গত বছর সরিষা চাষ হয়েছিল ১ হাজার ২৯৫ হেক্টর জমিতে। এ বছর বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৩৪৫ হেক্টর। এ বছর ৯ হাজার ৮৯৭ জন কৃষক সরিষা আবাদ করেছেন। সম্ভাব্য উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৭৫০ টন।
তিনি বলেন, সরিষা চাষে জমির উর্বরতা বাড়ে এবং পরবর্তী ফসলের জন্য জমি আরও উপযোগী হয়। এতে কৃষক লাভবান হচ্ছেন।
লাভের হিসাব
কৃষক শাহীন মিয়া জানান, গত বছর তিনি ৮০ শতাংশ জমিতে সরিষা চাষ করে খরচ করেছিলেন ৯ হাজার ৫০০ টাকা। বিক্রি হয়েছিল ২৭ হাজার টাকা—লাভ প্রায় দ্বিগুণ। এ বছর ১০০ শতাংশ জমিতে চাষ করেছেন, খরচ হয়েছে ১২ হাজার টাকা।
তাকে দেখে আশপাশের অনেক কৃষক সরিষা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে সড়কের পাশে ক্ষেত হওয়ায় অনেকেই গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে গাছ ভেঙে ফেলছেন—এতে কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে, তবু কাউকে কিছু বলা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
এলাকায় ব্যাপক আবাদ
হাটশিরা ও দৌলতপুর গ্রামে বহু কৃষক সরিষা আবাদ করেছেন। হাটশিরায় মৃত জসিম উদ্দিনের পুত্র আব্দুস সাত্তার ২০ শতাংশ, সমশের আলীর পুত্র শহিদুল্লাহ ২০ শতাংশ। দৌলতপুরে আলতাফ উদ্দিন আকন্দের পুত্র আজিম উদ্দিন আকন্দ ৮০ শতাংশ, জামাল উদ্দিন আকন্দের পুত্র আব্দুর রাজ্জাক আকন্দ ৬০ শতাংশ, আবু কাউচার ৪০ শতাংশ, মানিক মিয়া ৩০ শতাংশ, অলি মিয়া ২০ শতাংশ এবং মৃত আবুল হাসেমের পুত্র মানিকুর রহমান ৪৫ শতাংশ জমিতে সরিষা চাষ করেছেন।
বহুমুখী উপকার
কৃষকরা জানান, সরিষা চাষের উপকার অনেক। এতে জমির উর্বরতা বাড়ে। সরিষার শাক ও ফুল বিক্রি করা যায়। গাছের আঁটি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়। সরিষা তেল সারা বছর রান্নায় ব্যবহার করা যায়, আর খৈল গরু ও মাছের খাদ্য হিসেবে কাজে লাগে।
হাটশিরা গ্রামের কৃষক আব্দুল আলী বলেন, একই জমিতে আগাম আমন ধান, তারপর সরিষা এবং শেষে বোরো ধান চাষ করা যাচ্ছে। এতে এক জমিতে তিন ফসল পাওয়া যাচ্ছে, আবার জমির উর্বরতাও রক্ষা হচ্ছে।
দৌলতপুর গ্রামের আজিম উদ্দিন জানান, সরিষা ক্ষেতের পাশে মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ মৌচাষিরা মৌ বাক্স বসান। ফুলে ফুলে মৌমাছির মধু আহরণে পরাগায়ন বাড়ে, ফলে ফলনও বেশি হয়। পাশাপাশি মধু বিক্রি করেও বাড়তি আয় আসে।
আজিম উদ্দিন আকন্দ বলেন, এক বিঘা জমিতে প্রায় ৬–৭ মণ সরিষা হয়। খরচ হয় ২–৩ হাজার টাকা। আর ফলন পাওয়া যায় ৭–৮ মণ পর্যন্ত। প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৩৫০ টাকা দরে।
সরিষা তেলের গুণ
মুড়ি মাখানো কিংবা আলুভর্তায় সরিষা তেলের জুড়ি নেই। রূপচর্চাতেও এ তেলের কদর রয়েছে। নিয়মিত সরিষার তেলে রান্না করা খাবার খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। এতে রয়েছে বিটা ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ ও ই, ওমেগা থ্রি ও সিক্স ফ্যাটি অ্যাসিড, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট। এসব উপাদান হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
সরিষা ফুলের গুণ
সরিষা ফুলে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট ও ফাইবার থাকে, যা হজমে সহায়তা করে। হালকা জ্বর, সর্দি-কাশিতে এটি প্রাকৃতিক উপকার দেয়। সরিষা ফুল ভাজি, বড়া কিংবা ভর্তা বানিয়ে খাওয়া যায়—স্বাদে যেমন ভালো, তেমনি পুষ্টিগুণেও ভরপুর।
উপসংহার
দিগন্ত জোড়া হলুদে মোড়া গৌরীপুরের মাঠ শুধু সৌন্দর্যের বার্তা দেয় না, দেয় সম্ভাবনার ডাক। কৃষক শাহীন মিয়ার মতো পরিশ্রমী মানুষের হাত ধরেই এই মাঠ হয়ে উঠছে লাভের খনি, আর গ্রামবাংলা এগিয়ে যাচ্ছে স্বনির্ভরতার পথে।



