দেশের অন্যতম শিক্ষিত জনপদ বাউফল
শিক্ষা-সংস্কৃতির সমন্বয়ে দক্ষিণাঞ্চলের রোল মডেল
মো. তরিকুল ইসলাম (মোস্তফা),বাউফল (পটুয়াখালী): ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ নদীবিধৌত জনপদ বাউফল। একসময় কৃষিনির্ভর এলাকা হিসেবে পরিচিত থাকলেও আজ এই জনপদ দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষার শক্ত ভিত, সামাজিক সচেতনতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা শিক্ষা-সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় বাউফল আজ দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে “শিক্ষিত জনপদ” হিসেবে।
শ্রেণিভেদ নেই, শিক্ষায় সবাই এগিয়ে
বাউফলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সহাবস্থান থাকলেও শিক্ষা ক্ষেত্রে নেই কোনো বৈষম্য। দিনমজুর বাবা ও গৃহকর্মী মায়ের সন্তানও আজ দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। এই সামাজিক বাস্তবতা বাউফলকে অন্য অনেক জনপদ থেকে আলাদা করে তুলেছে।
উচ্চশিক্ষায় ধারাবাহিক সাফল্য
প্রতিবছরই বাউফল উপজেলা থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। প্রশাসন ক্যাডারসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাউফলের শিক্ষার্থীদের নিয়োগের হারও তুলনামূলক বেশি। এ সাফল্য নতুন প্রজন্মকে শিক্ষার প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলছে।
ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের অবদান
বাউফলের শিক্ষা বিকাশে শতবর্ষী ও ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অনস্বীকার্য—
- ধানদী কামিল মাদ্রাসা: ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
- বাউফল সরকারি কলেজ (১৯৬৬): কয়েক দশক ধরে উচ্চশিক্ষায় দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলছে।
- বাউফল মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বিলবিলাশ ও কেশবপুর এন.এস. মাধ্যমিক বিদ্যালয়: মাধ্যমিক শিক্ষার মূল ভিত্তি।
কলেজ ও ডিগ্রি পর্যায়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাউফল
বর্তমানে উপজেলায় সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১০টিরও বেশি কলেজ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য—
নওমালা আব্দুর রশিদ খান ডিগ্রি কলেজ, কালিশুরী ডিগ্রি কলেজ, নুরাইনপুর কলেজ, কালাইয়া ইদ্রিস মোল্লা ডিগ্রি কলেজ।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ইঞ্জিনিয়ার ফারুক তালুকদার মহিলা ডিগ্রি কলেজ, যা নারী শিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়
বাউফল ধর্মীয় শিক্ষায়ও সমৃদ্ধ। একটি পরিবারেই রয়েছে ৫০ জন হাফেজ। উপজেলায় রয়েছে ৭০টিরও বেশি আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসা, যেখানে আধুনিক পাঠ্যক্রমের সমন্বয়ে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য— ধানদী কামিল, নুরাইনপুর ও বাউফল ছালেহিয়া ফাজিল, বিলবিলাশ নেছারিয়া ফাজিল, গুলবাগ সিনিয়র, কেশবপুর ফজলুল হক ও ইন্দ্রকুল আকবরিয়া আলিম মাদ্রাসা।
শিক্ষা অবকাঠামো: এক নজরে
- প্রাথমিক বিদ্যালয়: ১০০+
- মাধ্যমিক বিদ্যালয়: ৬০+
- আলিম/ফাজিল/কামিল মাদ্রাসা: ৭০+
- কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ: ১২+
- কারিগরি ও ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান: ৭+
জাতীয় পর্যায়ে বাউফলের কৃতী সন্তান
বাউফল দিয়েছে বহু গুণী মানুষ—
মমিন খান (সাবেক অর্থমন্ত্রী), সুখ রঞ্জন শিকদার (সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী), সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার, বিচারপতি, শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হকের পূর্বপুরুষের নিবাস, এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহম্মেদ—যিনি বাউফল সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।
এছাড়া স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, নির্বাচন কমিশনার, ডিসি, এসপি ও বিদেশে কর্মরত অসংখ্য পেশাজীবী বাউফলের মর্যাদা বাড়াচ্ছেন।
উপসংহার
শক্তিশালী শিক্ষা অবকাঠামো, সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষার ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় এবং জাতীয় পর্যায়ে কৃতী মানবসম্পদের অবদান—এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে বাউফল আজ একটি আদর্শ শিক্ষিত জনপদ। যেখানে দারিদ্র্য শিক্ষার পথে বাধা নয়—বাউফল তার জীবন্ত প্রমাণ।
বিআলো/ইমরান



