নতুন সরকার অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে
আশীষ কুমার সেন: সরকারি ব্যয়ে লাগাম টেনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ব্যয়সাশ্রয়ী নানা পদক্ষেপের ঘোষণাও দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কাগুজে উদ্যোগের বাইরে গিয়ে পরিচালন খাতে একের পর এক ব্যয় বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফল হিসেবে নিকট-অতীতে প্রথমবারের মতো গত অর্থবছরে সরকারের পরিচালন ব্যয় মোট রাজস্ব আয়ের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে মোটামুটি স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে, অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। সামনের নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ আরো বড়। এ বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ গতকাল সতর্ক করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পর যে সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসবে, অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে তাদেরকে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে মোটামুটি স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে, অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। সামনের চ্যালেঞ্জ আরো বড়। সোমবার রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
লেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সংস্কার আমরা যা করেছি, তা এনাফ না, তবে সামনের সরকারের জন্য তা সহায়ক হবে। আরো ট্যাক্টফুলি হ্যান্ডেল করতে হবে চ্যালেঞ্জগুলো। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার নির্বাচিত সরকারের হাতে যাবে। ওই সরকারের সময়ে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা যাতে পেশাদার ভূমিকা পালন করেন, সেই আহ্বান জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, রাজনৈতিক সরকারের সময়ে চাপ আসবে; তাদের সরাসরি ‘না’ বলা যাবে না। নেগোশিয়েট করার ক্ষমতায় যেতে হবে; তাদের অর্থনীতির নীতি বোঝাতে হবে, ব্যাংকিং আইন, অডিটের নর্মস দেখাতে হবে। রাজনৈতিক সরকারের সময়ে এভাবে আলোচনা ও সমঝোতা করে ঋণ বিতরণের পরামর্শ দেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। ঋণ বিতরণে বড় ব্যবসায়ীদের চেয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কর্মসংস্থান তৈরিতে তারা ভুমিকা রাখে। এজন্য তাদের ঋণ দিতে হবে হবে বেশি।
এদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো দ্বিগুণেরও বেশি করার প্রস্তাব করেছে পে কমিশন। অন্যদিকে আগামী সরকারের মন্ত্রীদের জন্য বিলাসবহুল ফ্ল্যাট প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এসব সিদ্ধান্ত নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য শুরুতেই অর্থ খরচ অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক বিশ্লেষণ ও সংস্থান পরিকল্পনা থাকে। সরকার জানে কীভাবে অর্থের জোগান দিতে হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে ১৫ বছরে মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম না থাকায় চলতি অর্থবছরের বাজেটে সারাদেশে এক হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে, বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন। এর ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বাবদ পরিচালন ব্যয় আরো বাড়বে। সর্বশেষ ২১ জানুয়ারি জাতীয় পে কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এমনকি তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলেও প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত জোগান দিতে হবে, যা দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় সাড়ে তিন মাসের সমান।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে তিন দফায় সরকারি যানবাহন কেনার মূল্যসীমা বাড়ানো হয়েছে। এসি মিনিবাস, বাস, প্রাইভেট কার, জিপ, পিকআপ, ট্রাক ও মোটরসাইকেলের মূল্যসীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে ঢাকার মন্ত্রীপাড়ায় ৭২টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণে ৭৬৬ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এর আগে মন্ত্রীদের জন্য ৬০টি গাড়ি কেনার প্রস্তাব তীব্র সমালোচনার মুখে বাতিল হলেও নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জন্য ২২০টি গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে। তবে সংশোধিত বাজেটে পরিচালন বায়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। উন্নয়ন ব্যয় থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাবদই বাড়তি ২২ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে পরিচালন ব্যয়ের চিত্র আরো স্পষ্ট হয়েছে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৯০ হাজার ৫৯৭ ক্যোট টাকা, যা মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ১০ দশমিক ২৩ শতাংশ, তার আগের বছর আরো কম।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে ব্যয় হয় ৬ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ছিল ৪ লাখ ৭৪ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা। অথচ অনুদানসহ মোট রাজস্ব আদায় হয় ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের চেয়ে পরিচালন ব্যয় বেশি সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ মনে করেন, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাধারণত রাজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি কিছু উন্নয়ন যায় ব্যবহার হয়। কিন্তু পরিচালন ব্যয়ের সমান রাজস্ব সংগ্রহ না হওয়া আশঙ্কার। নব্বই দশকের পর এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়নি। তা ছাড়া চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে পরিচালন ব্যয় বাড়ানো হয়েছে, যা যৌক্তিক নয়। বরং সরকারের উচিত পরিচালন ব্যয় কমিয়ে এনে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো। কারণ উন্নয়ন ব্যয় না বাড়লে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ বলেন, রাজস্ব না বাড়ার পরও অযৌক্তিকভাবে পরিচালন ব্যয় বাড়ানো যথাযথ নয়। আগেও সরকারের এই ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ছিল। এখন আরো প্রকট হয়েছে। এখন হয়তো সরকার বেতন-ভাতা বাড়িয়ে কর্মকর্তাদের খুশি করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এ ধরনের বাড়তি পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরো চিন্তাভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। অর্থের সংস্থান না করে এত বেশি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ কার্যকর হলে মহাসংকট হিসেবে দেখা দেবে।
বিআলো/তুরাগ



