নারী নির্যাতন: পরিসংখ্যান নয়, রাষ্ট্রের আয়না
২০২৫ সালে বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতনের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল কয়েক হাজার ঘটনার পরিসংখ্যান নয়-এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও বিচারব্যবস্থার একটি নির্মম আয়না। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এক বছরে ২ হাজার ৮০৮ জন নারী ও কন্যা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে কন্যাশিশুর সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি হওয়া সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা। যৌন সহিংসতার তথ্য পরিস্থিতির গভীরতা আরো স্পষ্ট করে। বছরে ৭৮৬টি ধর্ষণের ঘটনা, যার বড় অংশের শিকার কন্যাশিশু-এই বাস্তবতা প্রশ্ন তোলে আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা, পারিবারিক পরিবেশ ও আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে। দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা কিংবা আত্মহত্যার মতো ঘটনা দেখায়, সহিংসতা কেবল অপরাধে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ভুক্তভোগীদের জীবন ও মানসিক অস্তিত্ব ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই পরিসংখ্যান আরো বলছে, সহিংসতা একমাত্র যৌন অপরাধে সীমাবদ্ধ নয়। হত্যাকাণ্ড, রহস্যজনক মৃত্যু, আত্মহত্যা, যৌতুক ও পারিবারিক সহিংসতা, অপহরণ, পাচার, সাইবার সহিংসতা-সব মিলিয়ে নারী ও কন্যাদের জীবনে নিরাপত্তাহীনতা একটি বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বিশেষভাবে রহস্যজনক মৃত্যু ও আত্মহত্যার সংখ্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বহু ঘটনা হয়তো এখনও ‘নির্যাতন’ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে না। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এই তথ্যগুলো এসেছে কেবল সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনার বিশ্লেষণ থেকে। অর্থাৎ বাস্তব সংখ্যা আরো বেশি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। সামাজিক চাপ, ভয়, লজ্জা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে বহু ভুক্তভোগী এখনো নীরব থেকে যান। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে-আইন কি যথেষ্ট? বাংলাদেশে নারী ও শিশু সুরক্ষায় আইন ও নীতিমালার অভাব নেই। কিন্তু প্রয়োগের ঘাটতি, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া এবং অপরাধীদের দায়মুক্তি এই আইনগুলোকে কার্যত দুর্বল করে দিচ্ছে। নারী নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে অপরাধের প্রবণতা কমবে না। একই সঙ্গে সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বকে নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নয়, বরং একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা। নারী নির্যাতনের এই ভয়াবহ চিত্র রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দেয়-উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক সূচকে সীমাবদ্ধ নয়। নারী ও কন্যাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে সেই উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে পড়ে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং সামাজিক প্রতিরোধ-একসঙ্গে, দৃঢ়ভাবে।
বিআলো/তুরাগ



