নারী বিদ্বেষী প্রচারণা গণতন্ত্র ও নারীর অগ্রগতির জন্য হুমকি : ডা. ফওজিয়া মোসলেম
নিজস্ব প্রতিবেদক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে নারী বিদ্বেষী ও ধর্মের অপব্যবহারমূলক প্রচারণা চলছে, তা গণতন্ত্র, নারীর অগ্রগতি এবং নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য গুরুতর হুমকি—এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম।
তিনি বলেন, এই নারীবিদ্বেষ নতুন কিছু নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন, যা নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে পরিকল্পিতভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী-পুরুষ, ধর্ম, গোষ্ঠী নির্বিশেষে সকল নাগরিক যেন নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে—এই দাবিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীনের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ৭১টি সংগঠনের জোট সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি এ উদ্যোগ গ্রহণ করে।
ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, “নির্বাচনী প্রচারণায় যেভাবে নারীদের অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নারীর অগ্রগতির পথে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে। নারী আন্দোলন অতীতেও এই হুমকি মোকাবিলা করেছে, ভবিষ্যতেও করবে।” তিনি অভিযোগ করেন, আইন অনুযায়ী নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে সেটির ব্যত্যয় ঘটছে।
রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অর্থ ও ক্ষমতার রাজনীতির ফলেই এবার নারী প্রার্থী কম দেখা যাচ্ছে। “আমরা দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত নারী আসনের পরিবর্তে সরাসরি নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু এবারও সে বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রার্থী মনোনয়ন থেকে শুরু করে প্রচারণা ও ভোটগ্রহণের পরিবেশ—সবখানেই মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়,” বলেন তিনি।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো এখনো নারীকে কেবল ভোটার হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত, রাজনৈতিক নেতৃত্বে দেখতে তারা প্রস্তুত নয়।” গণভোট প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নারী সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব উপেক্ষিত হওয়ায় কোনো গণভোট নারীর অধিকার রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন না।
নির্বাচনী প্রচারণায় নির্দিষ্ট দলকে ভোট দিলে ‘বেহেশতে যাওয়ার’ মতো বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ধর্ম কি আদৌ এমন কথা বলতে অনুমতি দেয়? কে স্বর্গে যাবে আর কে যাবে না—তা নির্বাচনের মাঠে নির্ধারিত হয় না। এ ধরনের বক্তব্য ধর্মেরও অপব্যবহার।”
তিনি আরও বলেন, নারী বিরোধী প্রচারণা ও মাইকে নারীর বিরুদ্ধে বক্তব্য বন্ধে নির্বাচন কমিশনকে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ধর্মকে কীভাবে নারীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও সোচ্চার থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে একশনএইডের প্রতিনিধি মরিয়ম নেসা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তত পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলা হলেও অনেক দল তা মানেনি। “নির্বাচন কমিশন নির্দেশনা দিলেও তা না মানলে কী শাস্তি হবে—সে বিষয়ে কোনো জবাবদিহিতা নেই। নারী ভোটার ও নারী প্রার্থীর জন্য বন্ধুসুলভ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি,” বলেন তিনি।
আরেকজন প্রতিনিধি বলেন, “এবার মনে হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর নারীদের খুশি করার কোনো আগ্রহ নেই। তারা না নারী প্রার্থী দিয়েছে, না নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মালেকা বানু, গণস্বাক্ষরতা অভিযানের মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস প্রিন্স, স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের চন্দন লাহিড়ী, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের প্রতিনিধি সাহিদা পারভীন শিখা, অ্যাডাবের প্রতিনিধি সমাপিকা হালদার, একশনএইডের মরিয়ম নেসা, তিথি ঘোষ, লুনা জহুরসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
স্মারকলিপিতে উত্থাপিত প্রধান দাবিসমূহ
স্মারকলিপিতে উল্লেখযোগ্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
সকল নাগরিকের নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা
নির্বাচন পূর্ব, চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা জোরদার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীবিদ্বেষ ও হয়রানি প্রতিরোধে কঠোর আইন ও মনিটরিং
নির্বাচনী ব্যয় ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা
ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা
বিআলো/তুরাগ



