নিজেকে জয়ের গল্প: আন্তর্জাতিক মঞ্চে নীলিমা হাসান মোহনা
আত্মবিশ্বাসহীনতা থেকে আত্মজয়ের পথে
সাহস, শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্বের নতুন মুখ মোহনা
হৃদয় খান: এক সময় নিজের হাসি নিয়েই ছিলেন অনিশ্চিত। আজ সেই হাসিই হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের গর্ব। নীলিমা হাসান মোহনার পথচলা সাহস আর আত্মবিশ্বাসে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের গল্প।
ঝলমলে র্যাম্প, ঝিকমিক ক্যামেরার ফ্ল্যাশ কিংবা আন্তর্জাতিক মঞ্চের আলো—সব কিছুর আড়ালেও থাকে এক নিরব সংগ্রামের গল্প। সেই গল্পই আজ নীলিমা হাসান মোহনার পরিচয়। সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে আত্মবিশ্বাস, সাহস আর সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সামনে এনে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে।
নীলিমা হাসান মোহনা একজন বাংলাদেশি মডেল, সুন্দরী প্রতিযোগিতা বিজয়ী এবং সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমে সক্রিয় তরুণী। ২০২৩ সালে তিনি বাংলাদেশ ট্যুরিজম বিউটি কম্পিটিশনের মাধ্যমে মিস ওশান ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ টাইটেল অর্জন করেন। এই অর্জনই তার স্বপ্নযাত্রাকে এনে দেয় দৃশ্যমান রূপ। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিস পিস ইন্টারন্যাশনাল প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশের নাম তুলে ধরেন বিশ্বমঞ্চে। একই আসরে তিনি অর্জন করেন Best Talent ও Miss Photogenic Award, যা তার বহুমাত্রিক দক্ষতার স্বীকৃতি।
তবে এই সাফল্যের পথ সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই নিজের চেহারা নিয়ে নীলিমা ছিলেন কিছুটা ইনসিকিউর। বিশেষ করে তার হাসি নিয়ে মানুষের কটূক্তি তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। সেখান থেকেই জন্ম নেয় একটি দৃঢ় সিদ্ধান্ত—এমন একটি জায়গায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, যেখানে মানুষ শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, চিন্তা, কথা ও কাজকেই মূল্য দেবে। সেই ভাবনাই তাকে ধীরে ধীরে তৈরি করে আজকের মোহনাকে।
ক্যামেরার সামনে কাজ করতে গিয়েই নীলিমা উপলব্ধি করেন, নিজেকে গ্রহণ করাই সবচেয়ে বড় শক্তি। তার ভাষায়, ক্যামেরা কখনো মিথ্যা বলে না—ভেতরের আত্মবিশ্বাস না থাকলে তা ঠিকই ধরা পড়ে। এই অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে নিজের দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপ দিতে এবং নিজের গল্প সাহসের সঙ্গে তুলে ধরতে।
মডেলিং ও মিডিয়ায় সক্রিয় থাকার পাশাপাশি নীলিমা বর্তমানে নর্দান ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। পড়াশোনা, র্যাম্প, ক্যামেরা এবং সামাজিক কাজ—সবকিছুর সমন্বয়েই তার দিন চলে। বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ, ব্র্যান্ড ক্যাম্পেইন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত থেকে তিনি নিজের অবস্থানকে কাজে লাগাতে চান সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য।
নীলিমা বিশ্বাস করেন, জনপ্রিয়তা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের উপকারে আসে। অনেক তরুণী তাকে সামাজিক মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়ে বলে, “আপুকে দেখে আমরা নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শিখেছি।” এই একটি বাক্যই তার কাছে সব পুরস্কারের চেয়েও বড় প্রাপ্তি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি নিজেকে গড়ে তুলতে চান লিডারশিপ, পাবলিক স্পিকিং ও উদ্যোক্তা দক্ষতায়। তার লক্ষ্য শুধু একজন কুইন বা মিডিয়া ফিগার হয়ে থাকা নয়, বরং নারীর ক্ষমতায়ন, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক পরিবর্তনের বার্তা বহন করা একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। নিজেকে তিনি দেখতে চান একজন সফল ব্যবসায়ী ও রোল মডেল হিসেবে, যিনি সমাজের পাশে দাঁড়াতে পারেন।
এই পথচলায় পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন নীলিমা। তিনি বলেন, “পরিবারের বিশ্বাস ও সমর্থন ছাড়া আমি আজ এখানে পৌঁছাতে পারতাম না।” নতুন প্রজন্মের মেয়েদের উদ্দেশ্যে তার বার্তা—কখনো নিজেকে ছোট করে দেখো না, মানুষের মন্তব্যের চেয়ে নিজের শিক্ষা, মূল্যবোধ আর আত্মসম্মানকে বড় করে দেখো।
আগামী পাঁচ বছরে দর্শক নীলিমাকে শুধু একজন সুন্দরী প্রতিযোগিতার বিজয়ী হিসেবে নয়, একজন লিডার, উদ্যোক্তা ও সমাজ পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে দেখবে—এমনটাই বিশ্বাস তার। নীলিমা চান, তার নামের সঙ্গে যুক্ত হোক অনুপ্রেরণা, সাহস আর সম্ভাবনার গল্প।
বিআলো/তুরাগ



