পাখি দেখতে এসে হতাশ পর্যটকরা জলবায়ু পরিবর্তনের ছায়া বাইক্কা বিলে
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : এক সময় শীত এলেই ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠত মৌলভীবাজারের সংরক্ষিত বাইক্কা বিল। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকত হাইল হাওরের এই বিল ঘিরে। কিন্তু সেই চিত্র এখন আর নেই। দিন দিন কমছে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা, হতাশ হয়ে ফিরছেন পাখি দেখতে আসা দর্শনার্থীরা। পরিবেশবাদীদের মতে, জলজ উদ্ভিদ কমে যাওয়া, আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন ও শিকারের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বাইক্কা বিলে পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি কমে গেছে। কচুরিপানা, শাপলা-শালুকসহ পাখিদের বসার ও খাবার সংগ্রহের উপযোগী পরিবেশ আর আগের মতো নেই।
মৌলভীবাজার সদর, শ্রীমঙ্গল উপজেলা ও হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত হাইল হাওর। এই হাওরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিল হলো বাইক্কা বিল। এক সময় নানা রঙের ও প্রজাতির পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল এই বিল। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ২০০৩ সালের ১ জুলাই ভূমি মন্ত্রণালয় বাইক্কা বিলের ১০০ হেক্টর জলাভূমিকে ‘বাইক্কা বিল অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করে। মাছ ধরা ও জলজ উদ্ভিদ আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে পাখি শিকার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং জলজ উদ্ভিদ ধ্বংসের কারণে পাখিরা ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। পাখি গবেষকদের মতে, মৎস্য শিকারের জন্য বিল থেকে জলজ উদ্ভিদ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত হাওর ভরাট, সেচ ও বিষ প্রয়োগে মাছ নিধন, নিষিদ্ধ জাল দিয়ে পাখি শিকার এবং হাওরের ভেতর দিয়ে যানবাহন চলাচল পাখির আবাসস্থলকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একসময় বাইক্কা বিলে বালিহাঁস, গিরিয়া হাঁস, ভুতিহাঁস, বাটান, পানকৌড়ি, বগা, শকুন, রাজহাঁস, পানমুরগিসহ অসংখ্য দেশি ও পরিযায়ী পাখির দেখা মিলত। বর্তমানে এসব পাখির অধিকাংশই আর দেখা যায় না।
তবে বিলের আশপাশে এখনো শালিক, দোয়েল, ঘুঘু, চড়ুই, বুলবুলিসহ কিছু দেশি পাখি টিকে আছে। পরিবেশকর্মী আহাদ মিয়া বলেন, গত কয়েক বছর ধরে জলজ ও স্থলজ পরিবেশের অবক্ষয়ের কারণে পরিযায়ী পাখি কমে যাচ্ছে। কিছু মানুষের কর্মকাণ্ড জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। বাইক্কা বিলের দায়িত্বে থাকা বড়গাঙ্গিনা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মিন্নত আলী জানান, আগে পাখি অনেক বেশি ছিল।
কচুরিপানা ও শাপলা-শালুক না থাকায় পাখি বসতে পারছে না। নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও সেচ মেশিন ব্যবহারের কারণেও পাখি কমছে। তবে এবছর পরিযায়ী পাখি আসার সময় এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, হাওরের গভীরতা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। আগে যেখানে সারা বছর পানি থাকত এখন সেখানে কয়েক মাসই পানি থাকে। পাশাপাশি মানুষের অবাধ চলাচলও পাখির জন্য বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, বাইক্কা বিলের জলজ উদ্ভিদ পুনরুদ্ধার, শিকার নিয়ন্ত্রণ ও অভয়াশ্রমের বিধিনিষেধ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না করা গেলে পরিযায়ী পাখির হারানো আবাসস্থল ফিরে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
বিআলো/আমিনা



