বরিশাল সদর-৫,অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও জোট রাজনীতিতে চাপে হেভিওয়েট প্রার্থীরা
>>শেষ মুহূর্তে বদলাচ্ছে সমীকরণ<<
এইচ আর হীরা, বরিশাল : শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। এখন প্রতীক্ষা ভোটগ্রহণের দিনকে ঘিরে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই পাল্টাচ্ছে মাঠের সমীকরণ। বরিশাল জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বরিশাল-৫ সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘিরে বাড়তি আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যেই বরিশাল-৫ (সদর ও মহানগর) আসনে পেশিশক্তি ব্যবহারের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন একাধিক প্রার্থী। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সমর্থিত প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তীসহ মোট ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নির্বাচনী সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসে ১১ দলীয় জোট থেকে ইসলামী আন্দোলনের বের হয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণার পর। শুরুতে এতে বিএনপি প্রার্থী স্বস্তিতে থাকলেও পরে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পায়।
যদিও হাতপাখা প্রতীকের পক্ষে জামায়াতের দৃশ্যমান প্রচার কার্যক্রম এখনো সীমিত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত অধিকাংশ নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে সরোয়ারের পক্ষে মাঠে নামলেও তৃণমূল পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ পুরোপুরি কাটেনি।
দলের স্বার্থে একযোগে প্রচারে অংশ নেওয়া হলেও কয়েকজন মনোনয়নপ্রত্যাশীর সমর্থকদের মাঠে সক্রিয়ভাবে দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ অভ্যন্তরীণ বিভাজন বিএনপি প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং এর সুযোগ নিতে তৎপর প্রতিদ্বন্দ্বীরা। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের আগে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন।
এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চরমোনাই ইউনিয়নসহ সদর উপজেলার আরও ১০টি ইউনিয়ন যুক্ত হওয়ায় ভোটের অঙ্কে পরিবর্তন এসেছে। এসব এলাকায় বিএনপি, আওয়ামী লীগ, ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াত সব দলেরই উল্লেখযোগ্য ভোটার রয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
ইসলামী আন্দোলনের নেতারা আশা করছেন, জামায়াতের ভোটব্যাংকের পাশাপাশি অন্য দলের একটি অংশের ভোটও তারা টানতে সক্ষম হবেন। এ আসনে একমাত্র নারী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাসদ নেত্রী মনীষা চক্রবর্তী। ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও তিন চাকার যানবাহনের বৈধতার দাবিতে আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি বরিশালে পরিচিতি পান। নগরের প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের বিভিন্ন দাবিতে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে সক্রিয় তিনি।
২০১৮ সালে রিকশা উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন। স্থানীয়ভাবে তার একটি নিজস্ব ভোটভিত্তি রয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। নগরী ও সদর উপজেলার গ্রামাঞ্চলে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বিএনপি ও ইসলামী আন্দোলনের দুই প্রার্থী।
অনেক ভোটারের ভাষ্য মতে, হাতপাখা ও ধানের শীষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। তবে আওয়ামী লীগঘেঁষা ভোটারদের অংশগ্রহণ শেষ পর্যন্ত ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। ইতিহাস বলছে, মজিবর রহমান সরোয়ার ১৯৯১ সালের উপনির্বাচনে প্রথম জয়লাভ করেন। পরে ১৯৯৮ সালের উপনির্বাচন এবং ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন।
তবে এবার তাকে তুলনামূলক কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ভোটের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ ফয়জুল করীমের মিডিয়া কমিটির আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন নাইস বলেন, অতীতের মতো কেন্দ্র দখল ও পেশিশক্তি প্রয়োগের আশঙ্কা রয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ করেন বাসদ প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী।
তিনি বলেন, বিভিন্ন স্থানে তার নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার বলেন, বিএনপি পেশিশক্তিতে বিশ্বাসী নয়, তারা নির্বাচনমুখী দল এবং শান্তিপূর্ণ ভোট প্রত্যাশা করে। এদিকে চলতি সপ্তাহে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বরিশাল ক্যাম্প কমান্ডার মেজর সৈকত বলেন, সেনাবাহিনী কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়।
সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য যাতে সবাই নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল-৫ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১৩ হাজার ৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫০ হাজার ৬৭৫ জন এবং মহিলা ভোটার ২ লাখ ৫০ হাজার ৬১৯ জন, যা প্রায় সমান।
জেলার সাতটি সংসদীয় আসনে মোট ৩৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, এর মধ্যে বরিশাল-৫ আসনেই রয়েছেন ৬ জন। সব মিলিয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই আসনে শেষ মুহূর্তের সমীকরণ, জোট পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ভোটের নিরাপত্তা ইস্যু। সবকিছু মিলিয়ে একটি টানটান প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আভাস মিলছে।
বিআলো/আমিনা



