বাবা–মায়ের বিচ্ছেদ, সামাজিকভাবে কাঠগড়ায় সন্তান!
একটি সন্তানের জন্ম তার ইচ্ছায় হয় না। বাবা–মায়ের বিচ্ছেদও তার সিদ্ধান্ত নয়। তবুও আমাদের সমাজে সবচেয়ে বড় মূল্যটা দিতে হয় সেই সন্তানকেই।
সম্প্রতি পুরনো ঢাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আবারও নির্মমভাবে মনে করিয়ে দিল, বাবা–মায়ের ভাঙা সংসারের দায় কীভাবে সমাজ আজও সন্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়।
বিয়ের তারিখ চূড়ান্ত, দাওয়াতপত্র বিলি, কমিউনিটি সেন্টার বুকিং সহও সব সম্পন্ন। ঠিক বিয়ের তিন দিন আগে হঠাৎ সিদ্ধান্ত: এই বিয়ে হবে না। কারণ হিসেবে যা বলা হলো, তা শুধু অমানবিক নয়, বরং ভয়ংকর সামাজিক মানসিকতার নগ্নতা।
মেয়েটির অপরাধ একটাই, যিনি তাকে মানুষ করেছেন, তিনি তার জন্মদাতা পিতা নন।
বাবা–মায়ের বিচ্ছেদ যদি অপরাধ হয়, তবে সেই অপরাধের শাস্তি সন্তান কেন পাবে? যে শিশুটি জন্মের কয়েক মাস পরই বাবাকে হারিয়েছে, যে মেয়েটি কোনোদিনই জন্মদাতা পিতার সান্নিধ্য পায়নি, সে কেন বড় হয়ে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এসে সামাজিকভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়াবে?
আমরা মুখে আধুনিকতার কথা বলি, বাস্তবে এখনো সন্তানকে বংশ, পরিচয় আর তথাকথিত রক্তের বিশুদ্ধতা দিয়ে বিচার করি। অথচ সেই রক্তের সম্পর্কই একদিন শিশুটিকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, এ প্রশ্ন আমরা কেউ করি না।
বাবা–মায়ের বিচ্ছেদ মানেই শুধু একটি সংসার ভাঙা নয়। এটি সন্তানের পরিচয়ের ভিত নড়িয়ে দেয়, আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরায়, সমাজের সামনে তাকে চিরদিনের জন্য সন্দেহভাজন করে তোলে। আজ সেই শিশুটি বড় হয়ে চাকরি, বিয়ে, সামাজিক স্বীকৃতির প্রতিটি ধাপে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়, তোমার আসল বাবা কে? এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে নিষ্ঠুর।
এ ঘটনায় মেয়েটির পরিবার নীরব। মান-সম্মানের ভয়ে তারা কথা বলছে না। কিন্তু এই নীরবতা আসলে সমাজেরই পরাজয়। কারণ আজ যদি এই মেয়েটির পাশে দাঁড়ানো না হয়, কাল একই কারণে আরেকটি মেয়ের জীবন ধ্বংস হবে।
বিয়ের নামে প্রতারণা এখানে শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসভঙ্গ নয়। এটি একটি সামাজিক অপরাধ, যেখানে একটি নারীর ভবিষ্যৎ, মানসিক নিরাপত্তা ও সম্মানকে তুচ্ছ করা হয়। আর সেই অপরাধের বৈধতা খোঁজা হয় বাবা–মায়ের বিচ্ছেদের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে। যারা আজ এমন অজুহাতে বিয়ে ভাঙে, তারা কি কখনো ভেবেছে, এই মেয়েটি যদি তাদের নিজের সন্তান হতো? যদি তার জীবনও বাবা–মায়ের সিদ্ধান্তের কারণে এমনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতো?
সমাজ হিসেবে আমাদের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাবা–মায়ের বিচ্ছেদ কোনো সন্তানের পরিচয়ের দোষ নয়। আর এই দোষ দেখিয়ে কারও জীবন নিয়ে খেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
নীরব থাকলে অন্যায় থামে না, বরং বৈধতা পায়। এখনই সময় কথা বলার, প্রতিবাদ করার এবং সন্তানকে তার বাবা–মায়ের সিদ্ধান্তের শাস্তি থেকে মুক্ত করার। কারণ একটি ভাঙা সংসার থেকেই যদি আরেকটি জীবন ভেঙে দেওয়ার অধিকার জন্ম নেয়, তবে আমরা সভ্য সমাজ দাবি করার নৈতিক অধিকার হারাই।
-এফ এইচ সবুজ



