বিএফডিসি গেট থেকে রূপালি পর্দা: কমল পাটেকরের অভিনয় যাত্রা
হৃদয় খান: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে খল-অভিনেতার তালিকায় কমল পাটেকরের নাম যেন আলাদা উজ্জ্বল নক্ষত্র। শক্ত চেহারা, রুক্ষ অভিব্যক্তি আর কণ্ঠের জোরালো উপস্থিতি—এই বৈশিষ্ট্যগুলো তাকে শুধু পরিচিতই নয়, দর্শকের মনে এক অনন্য ছাপ রেখেছে। কিন্তু কি জানেন, তার পথচলা শুরু হয়েছিল একেবারেই সাধারণ অবস্থান থেকে, বিএফডিসি (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন) গেটের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে নায়ক-নায়িকাদের এক ঝলক দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকেই?
শুরুটা ছিল ‘এক্সট্রা’ থেকে
কমল পাটেকরের নিজস্ব ভাষায়, একসময় তিনি প্রতি দিন বিএফডিসি গেটের সামনে ভোর ছয়টায় হাজির হতেন। তার লক্ষ্য ছিল একটাই—চলচ্চিত্রের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলা। প্রথম সুযোগ আসে পরিচালক দারাশিকোর ‘ফকির মজনু শাহ’ চলচ্চিত্রে এক্সট্রা আর্টিস্ট হিসেবে। বস্তিবাসীর চরিত্রে কাজ করার সময় তিনি শুধু অভিনয়ই করেননি, সেই সঙ্গে নাস্তা, দুপুরের খাবার ও শুটিং শেষে ২০ টাকার পারিশ্রমিকও পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান। এই ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতাই তাকে পরদিন আবার ভোরে গেটের সামনে হাজির করে।
প্রতিভার পরিচয়: শাহীন সুমনের হাত ধরে
কিছু দিন পর মনতাজুর রহমান আকবর, শাহাদাৎ হোসেন লিটনসহ একাধিক পরিচালকের ছবিতে কাজের সুযোগ আসে। কিন্তু কমল পাটেকরের ক্যারিয়ারে মোড় আসে পরিচালক শাহীন সুমনের হাত ধরে। গল্পনির্ভর ছবিতে মূল চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে তিনি সংলাপ ও অভিনয়ের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ পান। এই সময়ই দর্শকরা তার শক্তিশালী চরিত্র-চিত্রায়ণ এবং কণ্ঠের ভারপ্রাপ্ত উপস্থাপনায় আকৃষ্ট হতে শুরু করেন।
অভিনয় জীবনের পরিসংখ্যান
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কমল পাটেকর ১২শ’র বেশি সিনেমায় কাজ করেছেন। অ্যাকশনধর্মী ও বাণিজ্যিক ছবিতে ভিলেন, গ্যাং লিডার বা প্রভাবশালী প্রতিপক্ষ চরিত্রে তার উপস্থিতি দর্শকরা ভালোভাবেই চিনে ফেলেছেন। এই প্রাপ্তি তাকে দেশের অন্যতম পরিচিত ও ব্যস্ত খল-অভিনেতার তালিকায় স্থায়ীভাবে জায়গা করে দিয়েছে।
বর্তমান চলচ্চিত্র ও নতুন প্রজন্ম
বর্তমান বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে তিনি কিছুটা আক্ষেপও প্রকাশ করেন। সিনিয়র খল-অভিনেতাদের মধ্যে এখন মিশা সওদাগর ছাড়া তেমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না, নতুন অনেকেই আসছেন, কিন্তু দর্শকের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। কমল পাটেকরের মতে, একজন অভিনেতা তৈরি করার মূল কারিগর পরিচালক। যদি পরিচালকের যত্ন ও নতুনদের অভিনয়ে মনোযোগ থাকে, চরিত্র বোঝার চেষ্টা থাকে, তবে বর্তমান সংকট কাটানো সম্ভব।
ভালোবাসা কমেনি, দর্শকের প্রতি আহ্বান
যদিও বয়স বেড়েছে এবং সম্প্রতি হজও পালন করেছেন, তবুও সিনেমার প্রতি ভালোবাসা কমেনি। তিনি দৃঢ়ভাবে মনে করেন, যতদিন বেঁচে আছি, সিনেমার সঙ্গে থাকতে চাই। দর্শকদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা স্পষ্ট: হলে গিয়ে সিনেমা দেখুন, নতুনদের গ্রহণ করুন, গুজবে কান দেবেন না। ভালো সিনেমা হলে প্রযোজক-পরিচালক ও শিল্পীরা নতুন কাজের অনুপ্রেরণা পাবেন। শেষ পর্যন্ত, দর্শক চাইলে বাংলার চলচ্চিত্র আবারও সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারে।
কমল পাটেকরের এই যাত্রা প্রমাণ করে, কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য ও সঠিক সময়ে সুযোগ গ্রহণই রূপালি পর্দার স্বপ্ন বাস্তব করে। বিএফডিসি গেটের ভোর থেকে রূপালি পর্দার আলো—এই পথচলা যেন অনুপ্রেরণা দেয় নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের।
বিআলো/তুরাগ



