• যোগাযোগ
  • অভিযোগ
  • সংবাদ দিন
  • ই-পেপার
    • ঢাকা, বাংলাদেশ

    বিষযুক্ত খাবার বনাম নিরাপদ কৃষি : কোন পথে আমরা? 

     dailybangla 
    21st Jan 2026 4:44 pm  |  অনলাইন সংস্করণ

    তাসকিনা ইয়াসমিন

    এটি বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত এবং নির্মম বাস্তব সত্যি যে, আমরা এখন যেসব খাবার খাচ্ছি তার বেশিরভাগই খুবই বিষাক্ত। এ নিয়ে এখন আর তর্ক করার কোন অবকাশ নেই। এখন এই বিপদ থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে ভাবা দরকার। যা, শুরু করতে হবে এখনই। বিভিন্ন ফ্যাক্টরি থেকে পণ্য উৎপাদনের পর সেই পণ্যের বর্জ্য নদীতে ফেলা, প্লাষ্টিক বর্জ্য দূষণ, অতি উৎপাদনের আশায় জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করে আমরা আমাদের দেশের মাটি, পানি, বায়ুকে বিষাক্ত করে ফেলেছি। এর ফলশ্রুতিতে এখন আমরা খাবারের নামে যে শস্যদানা ও শাকসব্জি-ফলমূল খাচ্ছি তার বেশিরভাগই বিষাক্ত। এই অবস্থার পরিবর্তনে আমাদের জরুরিভিত্তিতে ফসলী জমি থেকে কীটনাশক সার পরিহার করা এবং অন্যান্য দূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়ােজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর সেটি করতে বিলম্ব করা চলবে না।

    দেলোয়ার জাহান আমার এক সময়ের সাংবাদিক সতীর্থ। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে লেখাপড়া করেন। পরে তিনি কিছুদিন রাজধানী ঢাকায় রিপোর্টিং করেন। এই সময় আমরা একসঙ্গে প্রায়ই জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, সেগুনবাগিচা শিশুকল্যাণ পরিষদ, বিএমএ মিলনায়তন এই সব স্থানে এসাইনমেন্টে যেতাম। এই এসাইনমেন্টগুলো করতে করতেই দেলোয়ার জাহান কৃষি সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহী হন। সেই থেকে তার কৃষিপ্রেম, কৃষক প্রেম শুরু। যা এখন বাংলাদেশকে বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদনের তীর্থকেন্দ্র তৈরির ব্রততে পরিণত হয়েছে। এক সময়ের পুরো দস্তুর পেশাদার সাংবাদিক দেলোয়ার এখন মানিকগঞ্জের নিভৃতপল্লীর কৃষকদের নিয়ে বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদনে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এইভাবে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামে থিতু হওয়াটা মোটেই সহজ ছিলনা। এখনও এ লড়াই বড্ড কঠিন। তার এই লড়াইয়ে সঙ্গী হয়েছেন ডলি ভাবী, স্থানীয় শতাধিক কৃষক এবং ঢাকায় বসবাসকারি এবং সারাদেশের খুব কম সংখ্যক সচেতন নাগরিক। যার কারণে দেলোয়ার খুব কমসংখ্যক মানুষের পাতে নিরাপদ খাদ্য তুলে দিতে পারছেন। আর অন্যদেরও এই আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার জন্য অনবরত আহ্বান জানাচ্ছেন। সঙ্গে চাইছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষি সংশ্লিষ্ট সকলের ঐকান্তিক সহযোগিতা।

    দেলোয়ার জাহান বলেন, আমরা সবাই খাবার খাই। কৃষিটা ঠিক কি হবে সেটা নির্ধারণ করবে আপনার সামনে যে খাবার প্লেট আছে সেটা কি আছে? খাবার প্লেটকে যদি আমরা ঠিক না করি তাহলে কৃষির বাকি জায়গাগুলো ঠিক হবে না। খাবারটা আকাশ থেকে পড়ে না। এটা মাটি থেকে আসে। অতএব, মাটিটা ঠিক করতে হবে। বাংলাদেশে এই মুহুর্তে ৭২ শতাংশ মাটিতে গাছের জন্য প্রয়োজনীয় যে পুষ্টি তা নেই (মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট – ঝজউও)। আমরা ভাবতেই পারি যে গাছের জন্য নেই তো আমার কি? আপনার খাবার টেবিলের মধ্যে যে প্লেট সেই টেবিলের মধ্যেও নেই। বাংলাদেশের মাটিতে জিংকের ঘাটতি আছে প্রায় ৬০ শতাংশের ওপরে। এর মানে হচ্ছে, দেশের ৬০ শতাংশ মানুষের শরীরেও জিংকের ঘাটতি রয়েছে (জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সার্ভে অনুযায়ী)। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে।

    কোনো ভাইরাস আক্রমণ করলে দেশের এই ৬০ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হবে। সবগুলো উপাদানের ঘাটতি আছে। তাহলে এই যে দেহ যে খাবার খায়, সেই খাবার যে মাটি থেকে আসে সেই মাটিতে আমরা কি দিচ্ছি? যদি বিষ দিই শরীরে বিষ আসবে। এটার কোন বিকল্প নেই। এটার জন্য সাইন্স লাগে না, এটার জন্য ল্যাব লাগে না। এটা চোখেই বোঝা যায়। এই যে মাটি ঘেঁষা যে মানুষ তাদের কি অবস্থা? ধান কাটার আগে এক সপ্তাহের ব্যবহারে দেশের তিনটি জেলার কৃষক কীটনাশক স্প্রে করতে গিয়ে ধানক্ষেতেই মারা গেছেন। দেশের সমস্ত কৃষক এখন স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মধ্যে আছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা এখন কৃষি। কৃষিতে যে কেমিক্যালগুলো ব্যবহার করা হয় এগুলাে সবই ভয়ংকর কেমিক্যাল এবং এইগুলো আপনি ঢাকায় যেখানেই বসে খান না কেন আপনি আক্রান্ত হবেন। তাহলে আমাদের কি ঠিক করতে হবে? আমাদের মাটি ঠিক রাখতে হবে। মাটির মধ্যে অনেক প্রাণ আছে। সারা দুনিয়ায় যত প্রাণ আছে তার চার ভাগের এক ভাগ মাটির মধ্যে থাকে।

    এখন দেশে যে অবস্থা চলছে মাটির কোন প্রাণ বিবেচনা করেনি। মাটির প্রাণ বিবেচনা করেনি বলে আজ আমাদের শরীরের এই অবস্থা। অন্যদিকে, কৃষক তার কৃষিজমি হারাচ্ছে। শিল্পকারখানা হচ্ছে। শিল্পকারখানার বর্জ্য কৃষকের ধান পচিয়ে দিচ্ছে। সে কোন ধান মাঠ থেকে আনতে পারছে না তখন সে বুঝতে পারছে যে ফাঁকটা কোথায়? আমাদের মাটি এবং জলের দূষণ এটা রোধ করতে হবে। দেশের কৃষক একদমই ভাল নেই। জাতীয়ভাবে, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, পরিবেশ, স্বাস্থ্য সবকিছু বজায় রেখে সরকারকে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে অবশ্যই কাজ করতে হবে।
    সম্প্রতি দেশের নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য আন্দোলনের ব্যানারে এক সংবাদ সম্মলনে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় ২০ দফা দাবি জানিয়েছে দেশের সমমনা কয়েকটি সংগঠন। তাদের দাবিগুলো হচ্ছে : ১. কৃষক পরিচয়কে মর্যাদাসহ স্বীকৃতি দিয়ে দেশের সব বর্গের কৃষক, জেলে ও জুমচাষীর নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
    ২. শ্রেণি ঠিক রেখে, সীমানা এবং মালিকানা সুস্পষ্ট করে এবং অকৃষি ব্যবহার বন্ধ করে কৃষিজমি সুরক্ষায় আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।
    ৩. কৃষিজমির মাটির গঠন এবং কেঁচোসহ অণুজীব ক্ষতিগ্রস্থ হয় এমন চাষাবাদ এবং উপকরণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
    ৪. স্থানীয় জাতের বীজবৈচিত্র্য প্রসার ও সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
    ৫. ভূগর্ভনির্ভর সেচ ও দূষণ বন্ধ করে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ সুরক্ষা করে নিরাপদ সেচ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
    ৬. জমি ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে জৈব সারের ব্যবহার বাড়িয়ে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বন্ধ করতে হবে।
    ৭. অতি বিপদজনক বিষ নিষিদ্ধ করে ধারাবাহিকভাবে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত সব ধরনের বিষের ব্যবহার, উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করতে হবে।
    ৮. অতি-প্রক্রিয়াজাতকৃত ও কৃত্রিম উপকরণযুক্ত খাবার বন্ধ করে দেশীয় স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাদ্যবৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বন্ধ করতে হবে।
    ৯. সব ফসলের উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণসহ এলাকাভিত্তিক কৃষকের হাট গড়ে তুলতে হবে।
    ১০. কৃষি শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও কৃষক পেনশন চালু করতে হবে।
    ১১. কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে স্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিমুক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
    ১২. দেশীয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ জাত সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ নির্ভর গ্রামীণ গৃহস্থালী খামারের প্রসার ঘটাতে হবে।
    ১৩. নগর কৃষি ও ছাদবাগানের ক্ষেত্রে স্থানীয় বীজনির্ভর নিরাপদ কৃষির প্রসার করতে হবে।
    ১৪. দেশের সব অঞ্চলের লোকায়ত কৃষিপ্রথা, ঐতিহ্য, উৎসব, মেলা ও প্রদর্শনী রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজন করতে হবে এবং অঞ্চলভিত্তিক কৃষি ও খাদ্য সংগ্রহশালা গড়ে তুলতে হবে।
    ১৫. শিক্ষার সব ক্ষেত্রে নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থাকে যুক্ত করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম হিসেবে নিরাপদ কৃষিকাজকে অর্ন্তভুক্ত করতে হবে।
    ১৬. জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দেশের অঞ্চলভিত্তিক স্থানীয় অভিযোজন এবং লোকায়ত কৌশলগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা করতে হবে এবং কৃষকের ক্ষয়ক্ষতি নিরসনের জন্য সহজে জলবায়ু তহবিল নিশ্চিত করতে হবে।
    ১৭. কৃষিকাজ ও খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং ক্ষয়ক্ষতি রোধে দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কৃষিখাত গড়ে তুলতে হবে।
    ১৮. কৃষি ফসলের বিমা ও কৃষকের ঝুঁকি ভাতা চালু করতে হবে।
    ১৯. কৃষকের মতামতের ভিত্তিতে কৃষিকার্ড তৈরি করে দেশের সকল কৃষককে কৃষিকার্ড দিতে হবে।
    ২০. নিরাপদ কৃষি উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন বিষয়ক দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সচেতনতা ও প্রচারণা বাড়াতে বাষ্ট্র ও গণমাধ্যমকে ভূমিকা নিতে হবে।

    সংগঠনের পক্ষে আন্দোলনের মুখপাত্র লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, আমরা হঠাৎ করে কিংবা এখনই এই ২০ দফা বাস্তবায়ন করতে বলছি না। নিরাপদ কৃষির স্বার্থে এটি ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করতে হবে। কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত নয়- বরং স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এতে কৃষকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
    দেশে এখন নিরাপদ আইন, ২০১৩ সহ নিরাপদ খাদ্য সংক্রান্ত প্রায় ১৬টি আইন রয়েছে। কিন্তু এই আইনগুলো দিয়েও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থার পরিবর্তনে আমাদের সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমরা কি সবকিছু জানার পরেও বিষযুক্ত খাবারের পেছনেই ছুটব নাকি বিষমুক্ত খাবারের ব্যাপারে উদ্যোগী হবো? এটা নিয়ে আমাদের এখনই ভাবতে হবে।

    লেখক : সাংবাদিক

    বিআলো/ইমরান

    এই বিভাগের আরও খবর
     
    Jugantor Logo
    ফজর ৫:০৫
    জোহর ১১:৪৬
    আসর ৪:০৮
    মাগরিব ৫:১১
    ইশা ৬:২৬
    সূর্যাস্ত: ৫:১১ সূর্যোদয় : ৬:২১

    আর্কাইভ

    January 2026
    M T W T F S S
     1234
    567891011
    12131415161718
    19202122232425
    262728293031